মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স রবিবার সুইজারল্যান্ডে পৌঁছেছেন ইরানের সঙ্গে শান্তি আলোচনায় অংশ নিতে। উভয় দেশ যুদ্ধের একটি স্থায়ী সমাপ্তি চাইলেও, ইরানের দাবি যে তারা গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দিয়েছে—এ বিষয়টি নিয়ে মতবিরোধ রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান ৬০ দিনের যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হলেও, তেহরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (IRGC) শনিবার ঘোষণা করে যে, লেবাননে ইসরায়েলি হামলার প্রতিক্রিয়ায় হরমুজ প্রণালী বন্ধ করা হয়েছে। তবে মার্কিন সামরিক বাহিনী জানিয়েছে যে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক রয়েছে।
এই পরিস্থিতি শান্তি আলোচনাকে জটিল করে তুলতে পারে। উভয় পক্ষই পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় সম্পাদিত একটি অন্তর্বর্তী চুক্তিকে এগিয়ে নিতে চায়, যা বুধবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান স্বাক্ষর করেন। এই চুক্তির লক্ষ্য প্রায় চার মাস ধরে চলা যুদ্ধের অবসান ঘটানো।
ভ্যান্স ও তাঁর স্ত্রী ঊষা ভ্যান্স সুইজারল্যান্ডের এমেন বিমানঘাঁটিতে স্থানীয় সময় সকাল ৫:৫৯ মিনিটে পৌঁছান বলে ভাইস প্রেসিডেন্টের দপ্তর জানায়।
পারমাণবিক ও লেবানন ইস্যুতে অগ্রগতির আশা
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ত্যাগের আগে ভ্যান্স সাংবাদিকদের বলেন, আমি আশা করি আমরা পারমাণবিক ইস্যুতে অগ্রগতি করতে পারব এবং লেবানন যুদ্ধবিরতির বিষয়েও অগ্রগতি হবে। সম্ভবত কয়েকদিনের আলোচনা চলবে।
ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ডস অভিযোগ করেছে যে লেবাননে ইসরায়েলের কর্মকাণ্ড যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধবিরতি প্রতিশ্রুতি লঙ্ঘন করেছে। তারা সতর্ক করে দিয়েছে যে হরমুজ প্রণালীর কাছে এলে জাহাজগুলো ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। যুদ্ধ শুরুর আগে এই প্রণালী দিয়ে বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় ২০% পরিবাহিত হতো।
যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পরও শনিবার ইসরায়েলি বাহিনী ও ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহ পরস্পরের ওপর হামলা চালায়।
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড জানিয়েছে, শনিবার ৫৫টি বাণিজ্যিক জাহাজ হরমুজ প্রণালী অতিক্রম করেছে, যা বিশ্ববাজারে ১ কোটি ৭০ লাখ ব্যারেলেরও বেশি তেল বহন করছিল। তারা বাণিজ্যিক নৌচলাচল অব্যাহত রাখার অঙ্গীকার করেছে।
ট্রাম্প বলেছেন, ৬০ দিনের যুদ্ধবিরতির সময় কিংবা পরবর্তীতেও হরমুজ প্রণালী ব্যবহারের জন্য কোনো টোল নেওয়া হবে না, যদি না শান্তি আলোচনা ব্যর্থ হয় এবং যুক্তরাষ্ট্র তা আরোপ করার সিদ্ধান্ত নেয়।
সামাজিক মাধ্যমে তিনি লিখেছেন, শান্তি চুক্তি না হলে যুক্তরাষ্ট্র ‘মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর অভিভাবক হিসেবে প্রদত্ত সেবার’ জন্য টোল আরোপ করতে পারে।
ইরানের অভিযোগ ও বিনিয়োগের প্রস্তাব
ইরানের সর্বোচ্চ নেতার উপদেষ্টা মোহাম্মদ মোকবের অভিযোগ করেন, চুক্তির ১৪ দফার প্রথমটিই—সব ফ্রন্টে যুদ্ধবিরতি, যার মধ্যে লেবাননও রয়েছে—যুক্তরাষ্ট্র বাস্তবায়ন করেনি।
তিনি বলেন, চুক্তি শুধু কাগজে-কলমে থাকলে মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক হবে না।
অন্যদিকে, ইরানের তেলমন্ত্রী মোহসেন পাকনেজাদ বলেন, যদি পশ্চিমা দেশগুলো চুক্তির চেতনা মেনে চলে, তবে শত শত বিনিয়োগ সুযোগ ও নতুন চুক্তির কাঠামো প্রস্তুত রয়েছে।
সুইস আলোচনায় কারা অংশ নিচ্ছেন
সুইজারল্যান্ডের পাহাড়ি রিসোর্ট বুর্গেনস্টকে অনুষ্ঠিত আলোচনায় ইরানের প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন প্রধান আলোচক মোহাম্মদ বাকের কালিবাফ। তাঁর সঙ্গে রয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি, পাশাপাশি নিরাপত্তা, কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও তেল খাতের শীর্ষ কর্মকর্তারা।
মার্কিন দলের সদস্যদের মধ্যে ভ্যান্স ছাড়াও রয়েছেন বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেছেন, অতীতে প্রতিশ্রুতি রক্ষায় ব্যর্থতার অভিজ্ঞতার কারণে ইরান এবার প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের বিষয়টি জোরালোভাবে উত্থাপন করবে।
পাকিস্তানও জানিয়েছে যে প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ এবং সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল সৈয়দ আসিম মুনির আলোচনায় অংশ নিতে সুইজারল্যান্ডে পৌঁছেছেন।
লেবানন পরিস্থিতি ও ইসরায়েলের অবস্থান
যুক্তরাষ্ট্র ছাড়ার আগে ফক্স নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ভ্যান্স বলেন, তিনি যুদ্ধবিরতি টিকে থাকবে বলে আত্মবিশ্বাসী এবং হরমুজ প্রণালী বন্ধ হওয়ার কোনো প্রমাণ তিনি দেখেননি।
লেবাননে যুদ্ধ বন্ধ হওয়া ছিল ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ও অন্যান্য বিষয় নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনার অন্যতম শর্ত। তবে লেবাননের সিভিল ডিফেন্স কর্মকর্তারা জানান, যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ইসরায়েলি হামলায় ২০ জন নিহত হয়েছে।
ইসরায়েল বলেছে, তারা হিজবুল্লাহর হামলার জবাব দিচ্ছে। অন্যদিকে হিজবুল্লাহ জানিয়েছে, তারা ইসরায়েলকে লেবাননে ‘অবাধ চলাচলের স্বাধীনতা’ দেবে না।
ইসরায়েল বলেছে, তারা যুক্তরাষ্ট্র-ইরান চুক্তির অংশ নয় এবং লেবাননে দখলকৃত এলাকা থেকে সেনা প্রত্যাহার করবে না। তাদের সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, তারা যুদ্ধবিরতি মেনে চলবে, তবে যেকোনো হুমকির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে।
ইসরায়েলি জনমত জরিপ
রয়টার্সের কাছে সরবরাহ করা হিব্রু ইউনিভার্সিটির এক জরিপে দেখা গেছে:
৯২% ইসরায়েলি মনে করেন, যৌথ ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্র সামরিক অভিযানে ইরান বেশি লাভবান হয়েছে। মাত্র ৮% মনে করেন, ইসরায়েল বিজয়ী হয়ে বেরিয়ে এসেছে। প্রায় ৯০% মনে করেন, যুদ্ধের লক্ষ্য পূরণ হয়নি। ৩০%-এরও কম মানুষ প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ‘বড় সাফল্য’ সংক্রান্ত দাবিতে বিশ্বাস করেন।
হতাহতের সংখ্যা
লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২ মার্চ থেকে ইসরায়েলি হামলায় ৪,০৫৭ জন নিহত হয়েছে, যার মধ্যে চিকিৎসাকর্মী, নারী ও শিশু রয়েছে। তবে কতজন যোদ্ধা নিহত হয়েছে তা উল্লেখ করা হয়নি।
অন্যদিকে ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, হিজবুল্লাহর সঙ্গে সংঘর্ষে অন্তত ৩২ জন সৈন্য ও ৪ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছে।
সূত্র: রয়টার্স
এ জাতীয় আরো খবর..