যুদ্ধে ইরানের বিজয় বিশ্বে খর্ব করেছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব: বিশ্লেষণ

  • নিউজ ডেস্ক

    প্রকাশ :- ২০২৬-০৬-১৯, | ২২:৩১:০২ |

মাত্র এক বছরের ব্যবধানে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক বাস্তবতায় নাটকীয় পরিবর্তন দেখা গেছে। গত বছর ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের প্রথম যৌথ হামলার পর একটি রসিকতা বেশ জনপ্রিয় হয়েছিল—একজন বারটেন্ডার একজন আমেরিকান, একজন ইসরায়েলি এবং একজন ইরানিকে অভিনন্দন জানিয়ে বলছেন, “আপনারা সবাই জিতেছেন।” কিন্তু এবারের পরিস্থিতি ভিন্ন। দ্বিতীয় দফার সংঘাতে একমাত্র স্পষ্ট বিজয়ী ইরান; আর পরাজিতদের তালিকায় রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল।

তবে যুদ্ধবিরতি মানেই শান্তি নয়। গুরুত্বপূর্ণ অনেক বিষয় ভবিষ্যৎ আলোচনার জন্য রেখে দেওয়া হয়েছে এবং সেগুলোর সফল বাস্তবায়ন নিয়েও অনিশ্চয়তা রয়েছে। এটি কেবল একটি আঞ্চলিক সংঘাত নয়; বরং পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক ক্ষমতার ভারসাম্যের প্রেক্ষাপটে চলমান বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার অংশ।

এই দৃষ্টিকোণ থেকে মধ্যপ্রাচ্য এখন এমন এক বৃহত্তর সংঘর্ষের ক্ষেত্র, যেখানে পূর্ব ইউরোপে রাশিয়া এবং পূর্ব এশিয়ায় চীনের বিরুদ্ধে পশ্চিমা শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতার প্রতিফলনও দেখা যায়। ফলে বর্তমান যুদ্ধবিরতি সাময়িক স্বস্তি দিলেও দীর্ঘমেয়াদে নতুন সংঘাতের সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

তবে এই যুদ্ধবিরতির সবচেয়ে বড় তাৎপর্য হলো, ইরান এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ঘোষিত লক্ষ্য ছিল তেহরানের ওপর চাপ সৃষ্টি করে শাসনব্যবস্থা দুর্বল করা, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি সীমিত করা, পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধ করা এবং আঞ্চলিক মিত্রদের থেকে ইরানকে বিচ্ছিন্ন করা। কিন্তু বাস্তবে এসব লক্ষ্য অর্জিত হয়নি।

হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালু হওয়া এবং ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন নৌ অবরোধ প্রত্যাহারের ফলে স্বল্পমেয়াদে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে স্বস্তি ফিরতে পারে। তবে এই সংকট দেখিয়ে দিয়েছে, বিশ্ববাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথগুলো ভবিষ্যতে ভূরাজনৈতিক চাপের মুখে পড়তে পারে। ইরানের কাছে হরমুজ প্রণালি বন্ধ করার সক্ষমতা এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত হাতিয়ার হিসেবে দেখা হচ্ছে।

পারমাণবিক কর্মসূচির ক্ষেত্রেও তেহরান তার অবস্থান থেকে সরে আসবে বলে মনে হয় না। কোনো সমঝোতা হলেও ইরান নিজস্ব প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ধরে রাখতে চাইবে। একই সঙ্গে সাম্প্রতিক যুদ্ধ একটি নতুন বাস্তবতাও সামনে এনেছে—পারমাণবিক অস্ত্রধারী দেশগুলোর বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার ক্ষেত্রে বড় শক্তিগুলো অনেক বেশি সতর্ক।

যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে ইরানের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা এবং জব্দ করা সম্পদ মুক্ত করে দেওয়ার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র দেশটির ওপর প্রভাব বিস্তারের নতুন পথ খুঁজতে পারে। ওয়াশিংটনের আশা, অর্থনৈতিক উন্মুক্ততা ও উন্নয়ন ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে পরিবর্তনের সুযোগ তৈরি করবে। তবে তেহরানের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে যুদ্ধের অর্জনকে অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার মাধ্যমে ধরে রাখা।

অন্যদিকে লেবানন ইস্যু ভবিষ্যতে নতুন উত্তেজনার কারণ হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সমঝোতায় লেবানন প্রসঙ্গ অন্তর্ভুক্ত হলেও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত রাখার পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। এ নিয়ে ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের মধ্যে মতপার্থক্যও স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

বিশ্লেষকদের মতে, ইসরায়েলই এই সংঘাতের সবচেয়ে বড় ক্ষতিগ্রস্ত পক্ষ। একাধিক ফ্রন্টে সামরিক চাপ বজায় রাখার কৌশল দেশটিকে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের দিকে ঠেলে দিতে পারে। একই সঙ্গে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা প্রতিরোধে ইসরায়েলের নিরাপত্তা কাঠামোর সীমাবদ্ধতাও প্রকাশ পেয়েছে।

পারস্য উপসাগরীয় আরব দেশগুলোর অবস্থানও খুব একটা শক্তিশালী হয়নি। নিরাপত্তার জন্য মার্কিন সামরিক উপস্থিতির ওপর নির্ভরশীলতা তাদের প্রত্যাশিত সুরক্ষা দিতে পারেনি; বরং এসব ঘাঁটি ইরানি পাল্টা হামলার সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে। ফলে অঞ্চলটির নিরাপত্তা নীতির পুনর্মূল্যায়নের প্রয়োজনীয়তা সামনে এসেছে।

সব মিলিয়ে, ইরানকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সাম্প্রতিক সামরিক অভিযান বৈশ্বিক ক্ষমতার পরিবর্তনশীল বাস্তবতার একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। এই সংঘাতে পশ্চিমা জোট তাদের প্রত্যাশিত লক্ষ্য অর্জন করতে পারেনি। যদিও এটি বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার সমাপ্তি নয়, তবুও এটি ক্ষমতার নতুন ভারসাম্যের দিকে অগ্রযাত্রার একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত।

সূত্র: আরটি 

শেয়ার করুন



এ জাতীয় আরো খবর..