✕

সর্বশেষ :
হরমুজে ইরানের নতুন চাল, বিপাকে যুক্তরাষ্ট্র ও উপসাগরীয় দেশগুলো সুপ্রিম কোর্টের ছুটির সংস্কৃতি বিচার ব্যবস্থায় প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছে : অ্যাটর্নি জেনারেল পাবনায় হাসপাতালে প্রসবের পর দুই নবজাতকের মৃত্যু, অবহেলার অভিযোগ জুলাই গণঅভ্যুত্থানের স্মৃতি সংরক্ষণে শিল্পীদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে : সংস্কৃতিমন্ত্রী বিনিয়োগ ও ব্লু ইকোনমি নিয়ে নেদারল্যান্ডসের সঙ্গে ফলপ্রসূ আলোচনা: মাহ্দী আমিন আন্দোলনের মাঝেই যন্তর মন্তরে বিক্ষোভ নিষিদ্ধ করল দিল্লি পুলিশ হুতিদের হামলায় আতঙ্কিত সৌদি যুবরাজ, বাংকারে আশ্রয়ের খবর লালমনিরহাটে স্কুলছাত্রীকে ধর্ষণ মামলায় আসামির যাবজ্জীবন অনিয়মিত অভিবাসন রোধে একযোগে কাজ করতে সম্মত বাংলাদেশ ও ইইউ তাজমিনের পোশাক ও মোবাইল পরীক্ষার জন্য যাচ্ছে সিআইডিতে

আন্দালুসের পথ ধরে ইউরোপে ইসলামের আলো

  • নিউজ ডেস্ক

    প্রকাশ :- ২০২৬-০৬-১৮, | ১০:৫৭:৩৬ |

১৪৯২ সালের ২ জানুয়ারি। গ্রানাডার আকাশে তখন শীতের বিষণ্ন আলো। স্পেনের দক্ষিণে সিয়েরা নেভাদার পাদদেশে দাঁড়িয়ে থাকা শহরটি সেদিন অস্বাভাবিক নীরব। রাজপ্রাসাদের মিনার থেকে আর বিজয়ের পতাকা উড়ছে না। শহরের চাবি হস্তান্তর করা হচ্ছে ক্যাস্টিলের রানি ইসাবেলা ও আরাগনের রাজা ফার্দিনান্দের হাতে। এর মধ্য দিয়েই ইউরোপে মুসলিম শাসনের শেষ স্বাধীন রাষ্ট্রটির পতন ঘটে।

ইতিহাসের কাছে ঘটনাটি ছিল একটি রাজনৈতিক পরিবর্তন। কিন্তু সভ্যতার তারিখে তা ছিল একটি দীর্ঘ আলোকিত অধ্যায়ের সমাপ্তি। সেদিন গ্রানাডার পতনের সঙ্গে শুধু একটি রাজবংশের অবসান ঘটেনি; অস্তমিত হয়েছিল এমন একটি সভ্যতার সূর্য, যার আলো একসময় সমস্ত ইউরোপে রেঁনেসা এনেছিল। 
আজও কর্ডোভার পুরোনো মসজিদের স্তম্ভের সারির দিকে তাকালে কিংবা আলহামরার দেয়ালে খোদাই করা আরবি লিপিগুলো পড়ার চেষ্টা করলে সেই হারিয়ে যাওয়া যুগের কথা মনে পড়ে। মনে হয়, পাথরের গায়ে গায়ে ইতিহাস এখনও তার স্মৃতি ধরে রেখেছে। সেই স্মৃতির নাম আন্দালুস।

আন্দালুসের ইতিহাস শুরু হয় ৭১১ খ্রিস্টাব্দে। উত্তর আফ্রিকার উপকূল থেকে মুসলিম সেনাপতি তারিক বিন জিয়াদ আইবেরীয় উপদ্বীপে অবতরণ করেন। তাঁর অবতরণের স্থানটি আজও জিব্রাল্টার নামে পরিচিত, যার আরবি নাম ছিল ‘জাবালুত তারিক’ অর্থাত্ তারিকের পাহাড়। কয়েক বছরের মধ্যেই মুসলমানরা উপদ্বীপের বৃহত্ অংশ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হয়। কিন্তু আন্দালুসের প্রকৃত গুরুত্ব সামরিক সাফল্যে নয়। ইতিহাসে বিজয়ী সেনাপতির সংখ্যা অনেক, কিন্তু সভ্যতা নির্মাতার সংখ্যা অল্প। মুসলমানরা আন্দালুসে যে উত্তরাধিকার রেখে গিয়েছিল, তার কেন্দ্রবিন্দু ছিল জ্ঞান, শিক্ষা, সংস্কৃতি এবং নগরসভ্যতা।

অষ্টম শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে উমাইয়া বংশের যুবরাজ আবদুর রহমান (প্রথম) আন্দালুসে একটি স্বাধীন ইমারাত প্রতিষ্ঠা করেন। দামেস্কে উমাইয়া খেলাফতের পতনের পর তিনি প্রাণ বাঁচিয়ে আফ্রিকা হয়ে স্পেনে পৌঁছেছিলেন। ইতিহাসের বিচিত্র পরিহাস, যে বংশকে পূর্বে উত্খাত করা হয়েছিল, সেই বংশই পশ্চিমে এসে নতুন সভ্যতার ভিত্তি স্থাপন করে। সময়ের প্রবাহে কর্ডোভা শুধু আন্দালুসের রাজধানী নয়, জ্ঞান ও সংস্কৃতির রাজধানীতেও পরিণত হয়। দশম শতাব্দীতে কর্ডোভা ছিল পৃথিবীর অন্যতম সমৃদ্ধ নগরী। ইউরোপের বহু শহর তখনও অন্ধকার ও অনুন্নত, অথচ কর্ডোভার রাস্তায় রাতের বেলায় প্রদীপ জ্বলত। ছিল সুসংগঠিত সড়কব্যবস্থা, গণস্নানাগার, হাসপাতাল এবং জনকল্যাণমূলক নানা প্রতিষ্ঠান।

কিন্তু কর্ডোভার সবচেয়ে বড় পরিচয় ছিল তার বই। ইতিহাসবিদদের বর্ণনায় জানা যায়, খলিফা হাকাম দ্বিতীয়ের ব্যক্তিগত গ্রন্থাগারেই কয়েক লক্ষ পাণ্ডুলিপি সংরক্ষিত ছিল। সে সময় ইউরোপের অনেক রাজদরবারে যত বই ছিল, কর্ডোভার একটি গ্রন্থাগারে তার চেয়েও বেশি বই পাওয়া যেত। বই সংগ্রহ, অনুলিপি প্রস্তুত এবং জ্ঞানচর্চা তখন সমাজের মর্যাদাপূর্ণ কাজ হিসেবে বিবেচিত হতো।

আন্দালুসে জ্ঞানচর্চা কোনো একটি শাস্ত্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। চিকিত্সাবিজ্ঞান, গণিত, দর্শন, জ্যোতির্বিজ্ঞান, সাহিত্য, কৃষিবিজ্ঞান—সব ক্ষেত্রেই নতুন নতুন অবদান যুক্ত হচ্ছিল। চিকিত্সাবিদ্যার ইতিহাসে আবুল কাসিম আল-জাহরাউয়ি (৯৩৬-১০১৩ খ্রিস্টাব্দ)-এর নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। 
তাঁর রচিত আত-তাসরিফ গ্রন্থ ইউরোপের চিকিত্সা শিক্ষায় শতাব্দীর পর শতাব্দী প্রভাব বিস্তার করেছে। অস্ত্রোপচারের জন্য তিনি যে যন্ত্রগুলোর বর্ণনা দিয়েছিলেন, সেগুলোর অনেকগুলোর নকশা আধুনিক চিকিত্সাবিজ্ঞানেও দেখা যায়।

দর্শনের ক্ষেত্রে ইবন রুশদ (১১২৬ু১১৯৮ খ্রিস্টাব্দ) এমন এক নাম, যার প্রভাব আন্দালুসের সীমানা অতিক্রম করে ইউরোপীয় চিন্তাধারায় গভীর ছাপ ফেলেছিল। অ্যারিস্টটলের দর্শনের ওপর তাঁর ব্যাখ্যা পরবর্তীকালে ইউরোপের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়। একইভাবে ইবন হাজম, ইবন তুফাইল ও অন্যান্য পণ্ডিতেরা জ্ঞানজগেক তাঁদের মৌলিক চিন্তা ও গবেষণার মাধ্যমে সমৃদ্ধ করেছেন।

আন্দালুসের আরেকটি বড় অবদান ছিল জ্ঞানের সেতুবন্ধ তৈরি করা। মুসলিম পণ্ডিতেরা গ্রিক, সিরিয়াক ও প্রাচ্য জ্ঞানের ভাণ্ডারকে সংরক্ষণ ও বিকশিত করেন। পরে টলেডোর অনুবাদ আন্দোলনের মাধ্যমে সেই জ্ঞান লাতিন ভাষায় ইউরোপে পৌঁছে যায়। ইতিহাসবিদদের একটি বড় অংশ মনে করেন, ইউরোপীয় রেনেসাঁর পেছনে এই জ্ঞানপ্রবাহ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। শুধু জ্ঞান নয়, সৌন্দর্যবোধেও আন্দালুস ছিল অনন্য। কর্ডোভার মহামসজিদ, সেভিলের স্থাপত্যকীর্তি এবং গ্রানাডার আলহামরা প্রাসাদ আজও সেই শিল্পরুচির সাক্ষ্য বহন করে। 

তবে সভ্যতার ইতিহাস কখনো সরলরেখায় এগোয় না। রাজনৈতিক বিভক্তি, অভ্যন্তরীণ সংঘাত এবং উত্তর দিকের খ্রিস্টান রাজ্যগুলোর ধারাবাহিক অগ্রযাত্রার ফলে আন্দালুস ধীরে ধীরে দুর্বল হতে থাকে। একসময়ের ঐক্যবদ্ধ শক্তি ছোট ছোট ‘তাইফা’ রাষ্ট্রে বিভক্ত হয়ে পড়ে। বিভক্তির সেই মূল্য শেষ পর্যন্ত পুরো সভ্যতাকেই দিতে হয়। অবশেষে ১৪৯২ সালে গ্রানাডার পতনের মাধ্যমে মুসলিম আন্দালুসের রাজনৈতিক অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটে। কিন্তু ইতিহাসের বিস্ময়কর সত্য হলো, রাষ্ট্রের পতন ঘটলেও সভ্যতার প্রভাব বিলীন হয়নি। আন্দালুসের জ্ঞান, স্থাপত্য, কৃষি, দর্শন ও সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার ইউরোপের ভেতরেই বেঁচে থাকে। অনেক ক্ষেত্রে তা আধুনিক ইউরোপীয় সভ্যতার বিকাশের অংশে পরিণত হয়।

শেয়ার করুন



এ জাতীয় আরো খবর..