✕
নিউজ ডেস্ক
প্রকাশ :- ২০২৬-০৬-১১, | ২৩:২০:২৭ |বিশ্বজুড়ে এখন এক পাক্ষিক জ্বর। তবে এই জ্বরে কেউ কাবু হয় না বরং মেতে ওঠে এক অবিশ্বাস্য আনন্দে। আজ দেশের সব গণমাধ্যম থেকে শুরু করে পাড়া-মহল্লার চায়ের দোকান; সবখানেই কেবল ফুটবল আর ফুটবল। বাংলাদেশ তো বটেই, গোটা বিশ্বই এখন মজেছে বিশ্বকাপ ফুটবলের এই মহাযজ্ঞে। যেখানে জাতিসংঘের চেয়েও বেশি সদস্য দেশ নিয়ে ফিফা বিশ্বকে এক সুতোয় বেঁধেছে, সেখানে এবারই প্রথম রেকর্ড ৪৮টি দেশ লড়ছে মূল পর্বে। বাংলাদেশ হয়তো কোনোদিন মূল পর্বে খেলার গৌরব পায়নি, নিকট ভবিষ্যতে সেই আশাও ক্ষীণ, তবে ফুটবল নিয়ে মাতামাতি আর উন্মাদনার বিশ্বমঞ্চ সাজালে বাঙালির স্থান যে নির্দ্বিধায় সেরা চারে থাকবে, তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই।
উন্মাদনার এই রঙ কতটা গাঢ়, তা বোঝা যায় খোদ আয়োজক দেশ যুক্তরাষ্ট্রের দিকে তাকালে। যেখানে নিউইয়র্কের রাস্তায় তন্নতন্ন করে খুঁজলেও হয়তো লিওনেল মেসির একটা জার্সি পাওয়া দুষ্কর, সেখানে টুর্নামেন্ট শুরুর এক মাস আগে থেকেই বাংলাদেশে কোটি কোটি টাকার জার্সির বাজার রমরমা। দেশের আকাশে এখন কেবলই ব্রাজিল আর আর্জেন্টিনার পতাকার ওড়াউড়ি, প্রিয় দলের রঙে সেজেছে বসতবাড়ি। আগামী দেড় মাস বাঙালির রুটিনটাই বদলে যাবে চিরতরে। রাতভর খেলা দেখে ঘুমন্ত চোখে অফিস করা, আর ডেস্কে বসে কাজের চেয়ে আগের রাতের গোল-মিসাইলের চুলচেরা বিশ্লেষণই হবে মূল কাজ।
মাঠের এই লড়াই অদ্ভুত এক বিভাজন তৈরি করে আমাদের চেনা বৃত্তে। সহকর্মী, ভাই-বোন, প্রেমিক-প্রেমিকা কিংবা স্বামী-স্ত্রী; সবাই যেন দেড় মাসের জন্য একে অপরের চিরশত্রু। তর্ক-বিতর্ক, মান-অভিমান, এমনকি মাঝেমধ্যে হাতাহাতিও বাদ যায় না এই ফুটবল আবেগে। অথচ দেড় মাস পরই এই চিরশত্রুরা আবার বুক মেলাবে বুক, বকাঝকা বদলে যাবে কোলাকুলিতে। বাংলাদেশের মানুষের এই পাগলামি দেখলে হয়তো খোদ ব্রাজিলীয় বা আর্জেন্টাইনরাও ভিরমি খাবেন। বিশেষ করে ১৯৮৬ সালে ম্যারাডোনার জাদুতে যে আর্জেন্টিনা প্রেমের শুরু, মেসির হাত ধরে তা এখন চূড়ায়। সাড়ে চার কোটি জনসংখ্যার আর্জেন্টিনার চেয়েও বোধহয় বেশি সমর্থক বাস করে এই বদ্বীপের বুকে।
ফুটবলের এই সর্বগ্রাসী জোয়ারের কাছে দেশীয় আবেগও যেন আজ ফিকে। এই তো দুদিন আগে মিরপুরের মাঠে শক্তিশালী অস্ট্রেলিয়া ক্রিকেট দলকে ২১ বছর পর হারিয়ে ইতিহাস গড়ার দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ। আজ জিতে প্রথমবারের মতো অজিদের বিপক্ষে সিরিজ জয়ের ঐতিহাসিক গৌরব অর্জন করেছে টাইগাররা। একসময় যা ছিল কল্পনাতীত, আজ তা হাতের মুঠোয়। অথচ চারিদিকে কোনো আওয়াজ নেই। বিশ্বকাপের এই বিশাল ডামাডোলে আজকের সংবাদপত্রে সেই খবরের জায়গা পেতে যেন কষ্ট হয। এমনকি দেশের অর্থনীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, জাতীয় বাজেট পেশের খবরটিও ঢাকা পড়ে গেছে ফুটবলের সবুজ ঘাসের আড়ালে।
তবে ফুটবলের আড়ালে ঢাকা পড়েছে আরও এক নির্মম বাস্তবতার গল্প। যখন আমেরিকা মেতেছে বিশ্বকাপের ঢক্কানিনাদে, তখন মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে জমছে যুদ্ধের ঘন কালো মেঘ। গত ২৮শে ফেব্রুয়ারি ইরান ভূখণ্ডে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের একতরফা যৌথ হামলার পর যে বারুদের গন্ধ ছড়িয়েছিল, তা থামেনি আজও। মাঝেমধ্যে যুদ্ধবিরতি কিংবা পাকিস্তানের দূতিয়ালিতে শান্তির বাতাবরণ তৈরির চেষ্টা হলেও কিছু ক্ষমতালোভীর গোঁয়ার্তুমির কাছে তা বারবার জিম্মি হচ্ছে। যুদ্ধবিরতি ভেঙে লেবাননে ইসরায়েলের নতুন হামলা পরিস্থিতিকে করে তুলেছে আরও জটিল, যার প্রেক্ষিতে খোদ ডোনাল্ড ট্রাম্পও ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীকে 'উন্মাদ' বলতে ছাড়েননি; যা আসলে এক পাগলের মুখে অন্য পাগলের নিন্দার মতোই শোনায়।
এই দুই যুদ্ধোন্মাদের খামখেয়ালিপনায় আজ গোটা বিশ্ব দাঁড়িয়ে এক গভীর খাদের কিনারায়। হরমুজ প্রণালী বন্ধ থাকায় বৈশ্বিক জ্বালানি তেলের সরবরাহ কমে গেছে প্রায় পাঁচ ভাগের এক ভাগ, যার সরাসরি প্রভাব পড়েছে বিশ্ববাজারে। অর্থনীতির মারপ্যাঁচ না বোঝা সাধারণ মানুষও জানে, তেলের দাম বাড়া মানে প্রতিটি নিত্যপণ্যের দামের আগুন লাগা। এই যুদ্ধ পৃথিবীকে এক অবশ্যম্ভাবী অর্থনৈতিক মন্দার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। যুদ্ধ যত দীর্ঘ হবে, সাধারণ মানুষের প্লেটের ভাতের হাহাকার ততটাই তীব্র হবে।
ফুটবলকেও আমরা এক ধরনের যুদ্ধ বলি, যেখানে আক্রমণ-পাল্টা আক্রমণ চলে প্রতিনিয়ত। তবে মাঠের এই লড়াই কখনো রক্ত ঝরায় না, কোনো সভ্যতাকে ধ্বংস করে না। আগামী দেড় মাস হয়তো প্রিয় দলের গোলের পর কোটি মানুষের সম্মিলিত চিৎকার আকাশ কাঁপানো মিসাইলের শব্দকেও ছাপিয়ে যাবে। মানুষ ভুলে থাকবে তার যাপিত জীবনের সব কষ্ট। কিন্তু এই উৎসবের সমান্তরালে যদি আসল যুদ্ধ না থামে, তবে ফুটবল শেষে মানুষ যখন বাস্তবে ফিরবে, তখন দেখবে তাদের খাবারের প্লেটে টান পড়েছে। দিনশেষে মাঠের গোল কিংবা সোনালি ট্রফি তো আর ক্ষুধার্ত পেট ভরাতে পারবে না।
আমরা মুখে গণতন্ত্রের বুলি আওড়াই, জনমতের বড়াই করি। অথচ বিশ্বজুড়ে যদি আজ গণভোট নেওয়া হয়, তবে খোদ আমেরিকার আপামর জনতাসহ পৃথিবীর প্রায় সব মানুষ যুদ্ধের বিপক্ষেই রায় দেবেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে, সিদ্ধান্ত নেওয়ার চেয়ারে বসা যুদ্ধবাজদের কাছে এই জনমতের মূল্য কানাকড়িও নেই। ফুটবল সাময়িকভাবে হয়তো যুদ্ধের দামামাকে আড়াল করতে পেরেছে কিন্তু শান্তিকামী মানুষের একটাই আকুতি; খেলাধুলার এই আনন্দ যেন চিরতরে পৃথিবীর বুক থেকে যুদ্ধের চিরতরে অবসান ঘটাতে পারতো!