✕
নিউজ ডেস্ক
প্রকাশ :- ২০২৬-০৪-৩০, | ২০:১৩:৪৯ |গ্রীষ্ম এলেই বাংলাদেশের বেশিভাগ ঘরবাড়িতে শুরু হয় তাপের সঙ্গে লড়াই। দুপুরের প্রখর রোদ, গরমে ভারী হয়ে থাকা বাতাস আর ঘরের ভেতর জমে থাকা তাপ অনেক সময় জীবনযাপনকে অস্বস্তিকর করে তোলে। অনেকেই এই সমস্যার সমাধান হিসেবে এয়ার কন্ডিশনার বা এসির কথা ভাবেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো, সবার পক্ষে এসি কেনা বা নিয়মিত চালানো সম্ভব হয় না। বিদ্যুৎ বিলের চাপ, পরিবেশগত প্রভাব এবং যন্ত্রের খরচ—সব মিলিয়ে অনেকেই বিকল্প উপায় খুঁজে থাকেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ঘর ঠান্ডা রাখতে সব সময় এসির প্রয়োজন হয় না। ঘরের নকশা, বাতাস চলাচল, রঙ, আসবাবপত্রের ধরন কিংবা দৈনন্দিন কিছু অভ্যাস বদলালেই অনেক ক্ষেত্রে ঘরের তাপমাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব। এমন কিছু সহজ কৌশল আছে, যেগুলো অনুসরণ করলে বড় অঙ্কের খরচ ছাড়াই ঘরকে অনেকটা শীতল রাখা যায়। একই সঙ্গে এসব পদ্ধতি পরিবেশবান্ধবও।
নিচে এমনই ১৫টি কার্যকর উপায় তুলে ধরা হলো, যেগুলো অনুসরণ করলে গরমের দিনেও ঘরকে তুলনামূলকভাবে ঠান্ডা ও আরামদায়ক রাখা সম্ভব।
ঘরের জন্য প্রাকৃতিক আলো জরুরি হলেও গরমকালে সূর্যের আলো যত বেশি ঢুকবে, ঘর তত গরম হবে। তাই দিনের বেলায় বিশেষ করে পশ্চিম ও উত্তরমুখী জানালা বন্ধ রাখা ভালো।
জানালায় হালকা রঙের মোটা সূতির পর্দা ব্যবহার করা যেতে পারে। পর্দা এমন পুরু হওয়া উচিত যাতে ঘর কিছুটা অন্ধকার হয়ে যায়। পর্দার বাইরের দিকে সাদা কাপড় থাকলে সূর্যের আলো প্রতিফলিত হয়ে ঘর ঠান্ডা রাখতে সাহায্য করে। পর্দায় ঠান্ডা পানি স্প্রে করলে বা ভেজা চাদর ঝুলিয়ে দিলে পানি বাষ্প হয়ে ঘরের বাতাস কিছুটা শীতল করে।
জানালাগুলো পানি দিয়ে ধুয়ে নিলেও কিছুটা উপকার পাওয়া যায়। যতক্ষণ সূর্যের তাপ বেশি থাকবে ততক্ষণ জানালা-দরজা বন্ধ রাখা ভালো। সূর্যাস্তের পর যখন বাতাস ঠান্ডা হয় তখন দরজা-জানালা খুলে দিলে শীতল বাতাস ঘরে ঢুকতে পারে।
ক্রস ভেন্টিলেশন তৈরি করতে একটি ঘরের জানালা খুলে বাতাস ঢুকতে দিন এবং বিপরীত পাশে থাকা অন্য ঘরের জানালায় বাইরে মুখ করে ফ্যান বসান। এতে গরম বাতাস বাইরে বের হয়ে যায়।
২. জানালা, দেয়াল ও ছাদে প্রলেপ
জানালায় হিট প্রোটেক্টিভ উইন্ডো ফিল্ম লাগালে প্রায় ৭৮ শতাংশ সৌর তাপ এবং ৯৯ শতাংশ ইউভি রশ্মি আটকে দেওয়া যায়। উইন্ডো ফিল্ম মূলত রঙিন স্টিকারের মতো একটি আবরণ, যা কাঁচের উপর লাগানো হয়। এটি না পেলে জানালার বাইরের কাঁচে সাদা রঙ করা বা সাদা কাগজ লাগালেও কিছুটা তাপ প্রতিরোধ করা সম্ভব।
দুই স্তরের কাঁচের জানালা তাপ নিরোধে আরও কার্যকর। এগুলো সাধারণ জানালার চেয়ে অনেক বেশি তাপ আটকে রাখে। ঘরের ছাদ ও দেয়ালে ইনসুলেশন করলে গরমে ঘর ঠান্ডা এবং শীতে তুলনামূলক উষ্ণ থাকে।
৩. ছাউনি
জানালার উপর সানশেড বা ছাউনি থাকলে সূর্যের তাপ অনেকটাই কম ঢোকে। সানশেড না থাকলে হালকা রঙের ছাউনি টানিয়ে ছায়া তৈরি করা যায়।
যুক্তরাষ্ট্রের বিদ্যুৎ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, জানালার উপর ছাউনি বসালে সূর্যের তাপ প্রায় ৭৭ শতাংশ পর্যন্ত কমানো সম্ভব।
৪. দেয়াল, মেঝে ও আসবাবপত্র
গাঢ় রঙের দেয়াল ও আসবাবপত্র আলো বেশি শোষণ করে এবং তাপমাত্রা বাড়িয়ে দেয়। অন্যদিকে হালকা রঙ আলো প্রতিফলিত করে, ফলে তাপ কম ধরে। তাই দেয়াল, মেঝে ও আসবাবপত্রে হালকা রঙ ব্যবহার করা ভালো।
মেঝে ঠান্ডা রাখতে মার্বেল, স্যান্ডস্টোন বা গ্রানাইট ভালো হলেও এগুলো অনেক ব্যয়বহুল। বিকল্প হিসেবে কাঠ, ভিনাইল প্ল্যাঙ্ক, সাদা সিরামিক বা পোরসেলিন টাইলস ব্যবহার করা যেতে পারে। মাটির ঘর হলে নতুন করে মাটি লেপে দিলেও ঘরে ঠান্ডা ভাব থাকে। ঘরে আসবাবপত্র কম রাখলে তাপ শোষণও কম হয়।
৫. ছাদ
গাঢ় রঙের ছাদ দ্রুত তাপ শোষণ করে। ছাদ যদি সাদা রঙ করা হয় তাহলে সূর্যের বেশিরভাগ আলো প্রতিফলিত হয়।গবেষণায় দেখা গেছে, সাদা রঙ প্রায় ৮৫ শতাংশ আলো প্রতিফলিত করতে পারে, যেখানে গাঢ় রঙ পারে মাত্র ২০ শতাংশ। ছাদে বাগান করা, ঘাস লাগানো বা সোলার প্যানেল বসালেও তাপমাত্রা কমানো যায়।
৬. সিলিং ফ্যান
ফ্যানের পাখা যদি ঘড়ির কাঁটার গতিতে ঘোরে তাহলে গরম বাতাস নিচে নামতে পারে। আর বিপরীত দিকে ঘুরলে তা গরম বাতাস উপরে ঠেলে দিয়ে ঘর ঠান্ডা রাখতে সাহায্য করে। তাই ফ্যানের দিক ঠিক আছে কি না খেয়াল রাখা দরকার।
৭. ঠান্ডা বাতাস তৈরি
একটি প্লেটে বরফ রেখে তার সামনে টেবিল ফ্যান চালালে ঠান্ডা বাতাস পাওয়া যায়। বরফ না থাকলে ফ্যানের নিচে ঠান্ডা পানির বালতি রাখলেও কিছুটা কাজ করে। এ ছাড়া দিনে কয়েকবার ঠান্ডা পানি দিয়ে ঘর মুছে নিলেও ঘরের তাপমাত্রা কমে।
৮. এক্সস্ট ফ্যান
এক্সস্ট ফ্যান ঘরের ভেতরের গরম বাতাস বাইরে বের করে দেয়। এটি দেয়ালের উপরের দিকে বসানো হয় এবং রান্নাঘর বা বাথরুমে বেশি কার্যকর।
৯. বিছানা ও বালিশ
গরমে ১০০ শতাংশ সূতির কাপড় ব্যবহার করা সবচেয়ে ভালো। পলেস্টার বা সিল্ক তাপ ধরে রাখে। বিছানার চাদর হালকা রঙের হলে ভালো। বাঁশ বা প্রাকৃতিক ফাইবারের তোশক ব্যবহার করলেও তাপ কম থাকে।
১০. বাতি পরিবর্তন
হ্যালোজেন বাতি প্রচুর তাপ তৈরি করে।
এলইডি বাতি তাপ কম উৎপন্ন করে এবং বিদ্যুৎও কম খরচ হয়।
অপ্রয়োজনীয় বাতি বন্ধ রাখা উচিত।
১১. রান্না
রান্না করলে ঘরের তাপমাত্রা বাড়ে। তাই গরমে এমন খাবার খাওয়া ভালো যা অল্প সময়েই রান্না হয়।
১২. বৈদ্যুতিক যন্ত্র
মোবাইল চার্জার, ল্যাপটপ, কম্পিউটারসহ অনেক যন্ত্র তাপ উৎপন্ন করে।
ব্যবহার শেষে প্লাগ খুলে রাখা ভালো।
১৩. গাছ লাগানো
বাড়ির আশপাশে বড় গাছ থাকলে তা প্রায় ৭০ শতাংশ রোদ আটকে দিতে পারে।
ঘরের ভেতরে মানিপ্ল্যান্ট, অ্যালোভেরা বা অ্যারিকা পাম রাখা যেতে পারে।
১৪. ডিহিউমিডিফায়ার
ডিহিউমিডিফায়ার ঘরের আর্দ্রতা কমায়। বাংলাদেশের আর্দ্র আবহাওয়ায় এটি ঘরকে তুলনামূলক আরামদায়ক করে।
১৫. শরীর ঠান্ডা রাখা
ঘর ঠান্ডা রাখার পাশাপাশি শরীর ঠান্ডা রাখা জরুরি। পর্যাপ্ত পানি পান, হালকা খাবার খাওয়া, ঠান্ডা পানিতে গোসল এবং সুতির ঢিলেঢালা পোশাক পরা এতে সহায়ক।
সব মিলিয়ে, কিছু ছোট ছোট পরিবর্তন ও সচেতন অভ্যাসের মাধ্যমে এসি ছাড়াও ঘরকে অনেকটা শীতল রাখা সম্ভব। এতে যেমন বিদ্যুৎ সাশ্রয় হয়, তেমনি পরিবেশও থাকে নিরাপদ।
সূত্র : বিবিসি