পর্যটকদের জাঙ্ক ফুড খেয়ে পেট ভালো রাখতে মাটি খাচ্ছে বানর!

পাহাড়ের নিচের দিকে থাকা বানররা পিচ ঢালাই রাস্তার গর্তে জমে থাকা আলকাতরা মেশানো মাটি বেশি পছন্দ করে। ছবি: এআই

  • নিউজ ডেস্ক

    প্রকাশ :- ২০২৬-০৪-২৩, | ২৩:১০:৪৫ |

পর্যটকদের দেওয়া চিপস-আইসক্রিম খেয়ে পেট খারাপ হওয়ায় জিব্রাল্টার পাহাড়ের বানররা এখন প্রতিকার হিসেবে মাটি খাওয়া শুরু করেছে বলে উঠে এসেছে সাম্প্রতিক এক গবেষণায়।

গবেষকরা বলছেন, পর্যটকদের কাছ থেকে পাওয়া বা কখনো কখনো ছিনিয়ে নেওয়া অস্বাস্থ্যকর খাবারের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে বাঁচতে ও পেটের ভারসাম্য ফেরাতেই বানরদের এ অদ্ভুত আচরণ।

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম গার্ডিয়ান লিখেছে, ‘বার্বারি মাকাক’ প্রজাতির বানর পর্যবেক্ষণের সময় এদের মাটি খাওয়ার অভ্যাসটি নজরে আসে গবেষকদের। বিজ্ঞানের ভাষায় যাকে বলে ‘জিওফ্যাগি’।

গবেষণায় উঠে এসেছে, যেসব বানর পর্যটকদের সংস্পর্শে বেশি আসে এরাই বেশি মাটি খায় এবং ছুটির দিনগুলোতে যখন পর্যটকদের ভিড় বাড়ে তখন মাটি খাওয়ার পরিমাণও এদের বেড়ে যায়।

জিব্রাল্টারে আটটি দলে প্রায় ২৩০টি বানর বাস করে। স্থানীয় কর্তৃপক্ষ এদের প্রতিদিন ফল, সবজি ও বীজ খেতে দিলেও পর্যটকরা নিয়ম ভেঙে চিপস, চকলেট, এমঅ্যান্ডএমস ও আইসক্রিমের মতো খাবার দেন।

বানররা ঠিক কেন মাটি খাচ্ছে তা এই পর্যবেক্ষণ থেকে নিশ্চিতভাবে প্রমাণিত না হলেও বিজ্ঞানীদের ধারণা, মাটি খাওয়ার বিষয়টি এদের পরিপাকতন্ত্রকে সুরক্ষা দেয়। পাহাড়ের বানরদের মধ্যে কেবল একটি দলকে মাটি খেতে দেখা যায়নি। এ দলটি পর্যটকদের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা বা দূরে থাকে।

‘ইউনিভার্সিটি অফ কেমব্রিজ’-এর প্রাইমেট আচরণ বিশেষজ্ঞ ড. সিলভাইন লেমোইন বলেছেন, বানররা সম্ভবত এদের পেটের ‘মাইক্রোবায়োম’ বা পরিপাকতন্ত্রে থাকা উপকারী জীবাণুর ভারসাম্য ঠিক রাখার জন্য মাটি খাচ্ছে। পর্যটকদের দেওয়া চর্বিওয়ালা, নোনতা ও মিষ্টিজাতীয় খাবার খাওয়ার ফলে এদের পেটের এ স্বাভাবিক ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যায়।

“আমাদের ধারণা, জাঙ্ক ফুড খাওয়ার ফলে এদের পেটের ব্যাকটেরিয়ার ভারসাম্য বিঘ্নিত হয়। মাটির খনিজ ও ব্যাকটেরিয়া সেই ভারসাম্য ফিরিয়ে আনতে এবং ক্ষতিকর প্রভাব কমাতে সাহায্য করতে পারে। মাটি এখানে সুরক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করছে বলে আমাদের অনুমান।”

২০২২ সালের গ্রীষ্ম থেকে ২০২৪ সালের বসন্ত পর্যন্ত পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, এসব বানর যা খায় তার প্রায় পাঁচ ভাগের এক ভাগই পর্যটকদের দেওয়া জাঙ্ক ফুড। পাহাড়ের চূড়ার দিকে থাকে এসব বানর, যেখানে পর্যটকদের ভিড় সবচেয়ে বেশি। এরা অন্যান্য বানরের তুলনায় দ্বিগুণ জাঙ্ক ফুড খায়। আবার, এ বানররাই সবচেয়ে বেশি মাটি খায়।

ড. লেমোইন বলেছেন, পর্যটকদের পাশাপাশি স্থানীয়রাও বানরদের নোনতা বাদাম, চকলেট, চিপস, শুকনো পাস্তা, পাউরুটি, কোকা-কোলা, কমলার রস ও আইসক্রিমের মতো খাবার দেন।

“এরা আইসক্রিম খুব পছন্দ করে, বিশেষ করে ম্যাগনাম ও করনেটো। তবে ফলের আইসক্রিম এরা খুব একটা পছন্দ করে না।”

গবেষকরা মোট ৪৪টি বানরকে ৪৬ বার মাটি খেতে দেখেছেন। যার মধ্যে তিনবার দেখা গেছে, আইসক্রিম, বিস্কুট বা পাউরুটি খাওয়ার ঠিক পরেই এরা মাটি খাচ্ছে। শীতকালে পর্যটকের সংখ্যা কমে গেলে বানরদের বাইরের খাবার খাওয়ার প্রবণতা ৪০ শতাংশ কমে যায় এবং একইসঙ্গে এদের মাটি খাওয়ার হারও ৩০ শতাংশের বেশি কমে।

গবেষণাটি প্রকাশ পেয়েছে বিজ্ঞানভিত্তিক জার্নাল ‘সায়েন্টিফিক রিপোর্টস’-এ।

গবেষণাপত্রে গবেষকরা লিখেছেন, বানররা সম্ভবত একে অপরের কাছ থেকে এ মাটি খাওয়ার অভ্যাসটি শেখে। বিভিন্ন দলের বানররা এদের এলাকা অনুসারে ভিন্ন ভিন্ন ধরনের মাটি পছন্দ করে। বেশিরভাগ বানরই জিব্রাল্টার জুড়ে পাওয়া লাল মাটি বা টেরা রোসা খুঁজে বের করে খায়।

তবে পাহাড়ের নিচের দিকে থাকা ‘এপস ডেন’ দলের বানররা আবার পিচ ঢালাই রাস্তার গর্তে জমে থাকা আলকাতরা মেশানো মাটি বেশি পছন্দ করে।

গোটা বিশ্বেই মানুষের মাটি খাওয়ার চল আছে, বিশেষ করে আফ্রিকা, এশিয়া ও দক্ষিণ আমেরিকায় অনেক গর্ভবতী নারী বমি ভাব কমাতে বা প্রয়োজনীয় খনিজ উপাদানের ঘাটতি মেটাতে মাটি খেয়ে থাকেন।

তবে গবেষকরা গর্ভবতী বা স্তন্যদানকারী মা বানরদের মধ্যে মাটি খাওয়ার বাড়তি কোনো প্রবণতা দেখেননি। এর থেকে ইঙ্গিত মেলে, শরীরে পুষ্টির অভাব মেটানোর জন্য নয়, বরং জাঙ্ক ফুডের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে বাঁচতেই এরা মাটি খাচ্ছে।

ড. লেমোইন বলেছেন, বানররা এদের পরিপাকতন্ত্রকে উচ্চ ক্যালরিওয়ালা তবে কম আঁশওয়ালা জাঙ্ক ফুডের হাত থেকে রেহাই পেতে মাটি খায়। কারণ, এ ধরনের অস্বাস্থ্যকর খাবার অনেক বানরের পেট খারাপের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

জিব্রাল্টারের পর্যটকদের জন্য বানরদের স্পর্শ করা বা খাবার দেওয়া নিষিদ্ধ থাকলেও নিয়মটি ঠিকমতো মানা হয় না। জাঙ্ক ফুড যেমন বানরদের জন্য ক্ষতিকর তেমনই এ মাটি খাওয়াও এদের জন্য বিপজ্জনক হতে পারে।

কারণ, এরা যে মাটি খাচ্ছে তার বেশিরভাগই ব্যস্ত রাস্তার ধারের।

ড. লেমোইন বলেছেন, “প্রতিদিন সেখানে প্রচুর যানবাহন চলাচল করে, যার বেশিরভাগই এখনও ইলেকট্রিক নয়। আমরা এই মাটি পরীক্ষা করতে চাই। মাটিতে কী পরিমাণ দূষক পদার্থ মিশে আছে তা দেখতে আমরা খুবই আগ্রহী।”

শেয়ার করুন



এ জাতীয় আরো খবর..