ইরান যুদ্ধ

এশিয়ার জ্বালানি ও কাঁচামাল সংকটের প্রভাব পড়তে পারে সমগ্র বিশ্বে

  • নিউজ ডেস্ক

    প্রকাশ :- ২০২৬-০৪-২৩, | ২১:৪৮:০৫ |

ইরান যুদ্ধের প্রভাবে এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে তীব্র জ্বালানি ও কাঁচামাল সংকট দেখা দিয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা এ পরিস্থিতির ভয়াবহতাকে করোনা মহামারীর সঙ্গে তুলনা করেছেন। মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল ও গ্যাস সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হওয়ায় এশিয়ার শিল্প উৎপাদন ও জনজীবন স্থবির হয়ে পড়েছে। জাতিসংঘ আশঙ্কা করছে, এ সংকট অব্যাহত থাকলে চলতি বছরের শেষ নাগাদ এশিয়ায় কয়েক মিলিয়ন মানুষ নতুন করে দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে যেতে পারে। খবর দ্য জাপান টাইমস।

পরিবহন খাতে বড় ধাক্কা

যুদ্ধের প্রভাবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এশিয়ার পরিবহন খাত। জেট ফুয়েলের দাম প্রায় দ্বিগুণ হওয়ায় শুধু মার্চেই বিশ্বজুড়ে ৯২ হাজারের বেশি ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে। এর বড় একটি অংশই ছিল এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের। মালয়েশিয়ার বাটিক এয়ার দেউলিয়া হওয়া থেকে বাঁচতে ৩৫ শতাংশ ফ্লাইট কমিয়ে দিয়েছে। আকাশপথে যাত্রী ও পণ্য পরিবহন এক-তৃতীয়াংশ কমে যাওয়ায় পর্যটন ও হোটেল ব্যবসায় ধস নেমেছে। শ্রীলংকার মতো দেশগুলোয় পর্যটকের সংখ্যা ৯০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যাওয়ায় স্থানীয় হোটেল ব্যবসা চরম সংকটে পড়েছে।

উৎপাদন খাতে স্থবিরতা

উৎপাদন খাতেও নেমে এসেছে চরম স্থবিরতা। এশিয়ার রফতানি খাতের কাঁচামাল ও জ্বালানির বড় অংশ আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে। ইন্দোনেশিয়ায় গ্যাস সংকটে তামা ও নিকেল উৎপাদন ১০ শতাংশ কমেছে। বাংলাদেশের পোশাক শিল্পেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। গাজীপুর ও আশুলিয়ার কারখানাগুলো জ্বালানি ও কাঁচামালের সংকটে ভুগছে। সুতার দাম অস্বাভাবিক হারে বেড়ে যাওয়ায় বিশ্বখ্যাত ব্র্যান্ডগুলোর ক্রয়াদেশ সময়মতো সরবরাহ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। পাশাপাশি কাতার থেকে হিলিয়াম সরবরাহ বন্ধ হওয়ায় প্রযুক্তি খাতে তাইওয়ানের চিপ উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, যার প্রভাব পড়ছে স্মার্টফোন ও গাড়ি তৈরির কারখানায়।

মানবিক বিপর্যয় ও ক্রমবর্ধমান দারিদ্র্য

এ সংকটের সবচেয়ে ভয়াবহ দিকটি হলো সাধারণ মানুষের ভোগান্তি। জাতিসংঘের তথ্যমতে, যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের প্রায় ৮৮ লাখ মানুষ নতুন করে দরিদ্র হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। এর মধ্যে শুধু ইরানেই ৫০ লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

ভারতে জ্বালানি সংকটের কারণে অনেক শিল্প কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় শ্রমিকরা শহর ছেড়ে গ্রামে ফিরে যেতে বাধ্য হচ্ছেন। ফিলিপাইনে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার প্রতিবাদে ধর্মঘট চলায় পণ্য পরিবহন বন্ধ হয়ে গেছে। দেশটির উত্তরাঞ্চলের কৃষকরা উৎপাদিত বাঁধাকপি বা ব্রকলি বাজারে পাঠাতে পারছেন না। কারণ পরিবহনের খরচ এখন ফসলের দামের চেয়েও বেশি। ফলে মাঠেই নষ্ট হচ্ছে প্রচুর শাকসবজি। সাধারণ মানুষের আয় কমলেও নিত্যপণ্যের দাম হু হু করে বাড়ছে, যা মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তদের জীবন দুর্বিষহ করে তুলেছে।

দীর্ঘস্থায়ী সংকটের শঙ্কা

এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানির ওপর সবচেয়ে বেশি নির্ভরশীল। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যদি আজই যুদ্ধ বন্ধ হয়ে যায় এবং শান্তি ফিরে আসে, তবু তেল ও গ্যাস উৎপাদন স্বাভাবিক হতে কয়েক বছর সময় লেগে যেতে পারে।

জাতিসংঘের পূর্বাভাস অনুযায়ী, এ যুদ্ধের কারণে এশিয়ার দেশগুলোর প্রায় ৩০ হাজার কোটি ডলারের অর্থনৈতিক ক্ষতি হতে পারে। খাদ্য সংকট, মূল্যস্ফীতি ও বেকারত্বের হার বেড়ে যাওয়ায় সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা ক্রমে কঠিন হয়ে পড়ছে। এ পরিস্থিতির দ্রুত সমাধান না হলে এশিয়ার এ সংকট শিগগিরই সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

শেয়ার করুন



এ জাতীয় আরো খবর..