জাতিসংঘের সতর্কবার্তা

তীব্র দাবদাহে হুমকির মুখে বিশ্ব খাদ্য ব্যবস্থা

  • নিউজ ডেস্ক

    প্রকাশ :- ২০২৬-০৪-২৩, | ২১:৪৪:২৭ |
বিশ্বজুড়ে ক্রমবর্ধমান তাপপ্রবাহ বা চরম দাবদাহ বৈশ্বিক কৃষি ও খাদ্য ব্যবস্থাকে খাদের কিনারায় ঠেলে দিচ্ছে।

ফলে ১০০ কোটিরও বেশি মানুষের জীবিকা ও স্বাস্থ্য মারাত্মক ঝুঁকির মুখে রয়েছে বলে সতর্ক করেছে জাতিসংঘের দুটি বিশেষ সংস্থা। সম্প্রতি জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) এবং বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (ডব্লিউএমও) যৌথভাবে এ আশঙ্কাজনক প্রতিবেদনটি প্রকাশ করেছে। খবর রয়টার্স।

সংকটে কৃষি ও কৃষক
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তাপপ্রবাহ এখন আগের চেয়ে আরো ঘন ঘন হচ্ছে এবং এর তীব্রতা ও স্থায়িত্বও বাড়ছে। চরম পরিস্থিতি সরাসরি ফসল, গবাদিপশু, মৎস্যসম্পদ ও বনাঞ্চলকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।

এফএওর জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক প্রধান কাভে জাহেদি বলেন, ‘চরম তাপ কৃষিকাজের ধরন পাল্টে দিচ্ছে। এখন কৃষকরা কী চাষ করবেন বা কখন করবেন, তা আর আগের মতো থাকছে না। অনেক ক্ষেত্রে প্রচণ্ড তাপের কারণে শ্রমিকদের মাঠে কাজ করাই অসম্ভব হয়ে পড়ছে। এটি আমাদের জন্য একটি ভয়াবহ ভবিষ্যতের ইঙ্গিত দিচ্ছে।’

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব ও পরিসংখ্যান
সাম্প্রতিক তথ্যানুযায়ী, বৈশ্বিক উষ্ণায়ন অনেক দ্রুতগতিতে বাড়ছে। ২০২৫ সালটি ছিল ইতিহাসের অন্যতম তিনটি উষ্ণতম বছরের একটি। এছাড়া তাপপ্রবাহ এখন খরা, দাবানল ও পোকামাকড়ের উপদ্রবকে কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে। ফলে তাপমাত্রা একটি নির্দিষ্ট সীমা অতিক্রম করলে ফসলের ফলন নাটকীয়ভাবে কমে যায়।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি তাপমাত্রা অধিকাংশ প্রধান ফসলের জন্য ক্ষতিকর। তাপমাত্রা এর ওপরে গেলে গাছপালা, পশুপাখি ও মানুষসহ সবারই টিকে থাকা বা স্বাভাবিকভাবে কাজ করা কঠিন হয়ে পড়ে। উদাহরণ হিসেবে মরক্কোর কথা উল্লেখ করা হয়েছে প্রতিবেদনে। উত্তর আফ্রিকার দেশটিতে টানা ছয় বছরের খরার পর তীব্র তাপপ্রবাহ দেখা দেয়। ফলে সম্প্রতি সেখানে শস্যের ফলন ৪০ শতাংশের বেশি কমে গেছে এবং জলপাই ও লেবুজাতীয় ফলের ফলন বলতে গেলে পুরোপুরিই ধ্বংস হয়ে গেছে।

মৎস্য ও সমুদ্রের ওপর প্রভাব
কেবল ডাঙায় নয়, তাপের তীব্রতা থাবা বসিয়েছে পানির নিচেও। একে বলা হচ্ছে ‘মেরিন হিটওয়েভ’ বা সামুদ্রিক তাপপ্রবাহ। ফলে পানিতে অক্সিজেনের মাত্রা কমে যাচ্ছে এবং মাছের মজুদ মারাত্মক হুমকির মুখে পড়ছে। ২০২৪ সালে বিশ্বের ৯১ শতাংশ সমুদ্র অন্তত একবার হলেও মেরিন হিটওয়েভের কবলে পড়েছে।

জলবায়ু বিশেষজ্ঞ জাহেদি জানান, গড়ে প্রতি ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে বিশ্বের প্রধান চারটি ফসলের ফলন গড়ে ৬ শতাংশ হারে কমে যায়। এগুলো হলো ভুট্টা, ধান, সয়াবিন ও গম।

এফএও এবং ডব্লিউএমও বলছে, বিচ্ছিন্নভাবে কোনো পদক্ষেপ নিয়ে এ বিপর্যয় ঠেকানো সম্ভব নয়। উন্নত ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও আগাম সতর্কবার্তা ব্যবস্থার ওপর জোর দেয়ার আহ্বান জানিয়েছে দুই সংস্থার বিশেষজ্ঞরা। যদি কৃষকদের হাতে সঠিক সময়ে সঠিক তথ্য পৌঁছনো যায়, তবে তারা আবহাওয়া বুঝে চাষের সময় বা ফসলের ধরন পরিবর্তন করতে পারবেন।

তবে প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, কেবল খাপ খাইয়ে নেয়ার চেষ্টাই যথেষ্ট নয়। সংকট থেকে মুক্তির একমাত্র স্থায়ী সমাধান হলো জলবায়ু পরিবর্তন রোধে বিশ্বব্যাপী বড় ও সমন্বিত পদক্ষেপ নেয়া।

বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে এরই মধ্যে তাপদাহের প্রভাব স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত বছর কিরগিজস্তানে ভয়াবহ দাবদাহ দেখা দেয়। সেখানে তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে প্রায় ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বেড়ে যায়। ফলে ২০২৫ সালে দেশটির শস্য উৎপাদন কমে ২৫ শতাংশ। অতিরিক্ত গরমের কারণে সেখানে পঙ্গপালের উপদ্রব বেড়ে যাওয়াসহ সেচ ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

এছাড়া ২০২৩ ও ২০২৪ সালে ব্রাজিলে দীর্ঘমেয়াদী খরা ও প্রচণ্ড গরমে সয়াবিনের ফলন ২০ শতাংশ পর্যন্ত হ্রাস পায়। অন্যদিকে, ২০২১ সালে উত্তর আমেরিকায় রেকর্ডভাঙা দাবদাহের কারণে ফল জাতীয় ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়।

তীব্র তাপমাত্রার প্রভাব শুধু ফসলের ওপর নয়, মানুষের ওপরও সমানভাবে পড়তে শুরু করেছে বলে উল্লেখ করেছে জাতিসংঘ। দক্ষিণ এশিয়া, সাব-সাহারান আফ্রিকা এবং লাতিন আমেরিকার দেশগুলোয় সাম্প্রতিক বছরে কাজের পরিবেশ অসহনীয় হয়ে উঠেছে। আশঙ্কা করা হচ্ছে, এসব অঞ্চলে বছরে ২৫০ দিনই কাজ করার অনুপযোগী হয়ে পড়তে পারে।

শেয়ার করুন



এ জাতীয় আরো খবর..