বৈশ্বিক খাদ্য সংকটের শঙ্কা

ইরান যুদ্ধে দুর্ভিক্ষের ঝুঁকিতে কোটি মানুষ

  • নিউজ ডেস্ক

    প্রকাশ :- ২০২৬-০৪-২০, | ১৩:৫১:৪২ |
পশ্চিম এশিয়ায় চলমান যুদ্ধের কারণে বৈশ্বিক খাদ্যনিরাপত্তার ওপর বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, মধ্যপ্রাচ্যের এ যুদ্ধের ফলে বিশ্বের অনেক দেশে খাদ্য সংকট ও দুর্ভিক্ষের আশঙ্কা দেখা দিচ্ছে।

সাধারণত মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধকে জ্বালানি তেলের দামের প্রেক্ষাপটে দেখা হলেও বর্তমান এ যুদ্ধ সরাসরি কৃষি উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর আঘাত হানছে। ফলে আফ্রিকা ও এশিয়ার দরিদ্র দেশগুলোর সাধারণ মানুষ দীর্ঘমেয়াদি সংকটের মুখে পড়তে যাচ্ছে। খবর ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস।

১৯৫০-এর দশকের ‘সবুজ বিপ্লবের’ পর থেকে বিশ্বের কৃষি ব্যবস্থা রাসায়নিক সার ও যন্ত্রপাতির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। আধুনিক উচ্চ ফলনশীল জাতের ফসল উৎপাদনের জন্য প্রচুর পরিমাণে নাইট্রোজেনযুক্ত সার (যেমন ইউরিয়া) প্রয়োজন হয়, যা মূলত প্রাকৃতিক গ্যাস থেকে তৈরি করা হয়। ফলে জ্বালানির দাম বাড়লে বা গ্যাসের সরবরাহ বিঘ্নিত হলে সরাসরি খাদ্যের উৎপাদন খরচ বেড়ে যায়। পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চল এখন এ সার উৎপাদন নেটওয়ার্কের কেন্দ্রে থাকায় চলমান যুদ্ধ লাখ লাখ মানুষকে দুর্ভিক্ষের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

কৃষি খাতে উপসাগরীয় দেশগুলোর প্রভাব: সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কাতারের মতো দেশগুলো এখন আর তেল রফতানিকারক দেশ নয়, বরং বিশ্ব খাদ্য অর্থনীতির মেরুদণ্ড হয়ে উঠেছে। বিশ্বের মোট অ্যামোনিয়া উৎপাদনের প্রায় ৩০ শতাংশই আসে এ অঞ্চল থেকে। অ্যামোনিয়া হলো নাইট্রোজেন সার তৈরির প্রধান কাঁচামাল। বর্তমানে সৌদি আরব বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অ্যামোনিয়া ও বৃহত্তম ইউরিয়া রফতানিকারক দেশ। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো, বিশেষ করে ভারত তাদের প্রয়োজনীয় অ্যামোনিয়ার তিন-চতুর্থাংশ এ অঞ্চল থেকে আমদানি করে। এ সরবরাহ ব্যবস্থা ব্যাহত হলে এসব অঞ্চলে ফসলের উৎপাদন মারাত্মকভাবে কমে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।

সরবরাহ সংকট ও ক্রমবর্ধমান ব্যয়: সংযুক্ত আরব আমিরাত বর্তমানে খাদ্য ও সার আমদানির প্রধান কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। দুবাইয়ের জেবেল আলী বন্দর দিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে খাদ্যপণ্য পাঠানো হয়। এমনকি ইউরোপ ও আফ্রিকার সঙ্গে চীনের বাণিজ্যের ৬০ শতাংশ এ বন্দর দিয়েই সম্পন্ন হয়। এ অঞ্চলে অস্থিরতা তৈরি হওয়ায় গম ও চালের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম ও প্রাপ্যতা নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। বিশ্বব্যাংক ও জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) তথ্যমতে, ২০২৬ সালের মার্চে বিশ্বজুড়ে জ্বালানির দাম ৪১ শতাংশের বেশি এবং সারের দাম ২৬ শতাংশ বেড়েছে। জাতিসংঘ সতর্ক করেছে, যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে সারের দাম আরো ২০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। ব্রিটেনসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে এরই মধ্যে খাদ্যপণ্যের দাম প্রায় ১০ শতাংশ বাড়তে শুরু করেছে।

বিপর্যস্ত দরিদ্র দেশগুলো: ধনী দেশগুলো ভর্তুকি দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দিলেও দরিদ্র দেশগুলো বড় বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে। সুদানের পরিস্থিতি সবচেয়ে ভয়াবহ, যেখানে প্রায় ১ কোটি ৯০ লাখ মানুষ চরম খাদ্য সংকটে এবং ৪৩ শতাংশ মানুষ তীব্র খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি) আশঙ্কা করছে, এ যুদ্ধের প্রভাবে আরো ৪ কোটি ৫০ লাখ মানুষ চরম ক্ষুধার সম্মুখীন হতে পারে। এর মধ্যে বড় একটি অংশই আফ্রিকার বাসিন্দা। অনেক দেশ ঋণের বোঝায় জর্জরিত থাকায় তারা নাগরিকদের খাদ্যসহায়তা দেয়ার সক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, জীবাশ্ম জ্বালানি বা রাসায়নিক সারের ওপর কৃষির নির্ভরশীলতা কমিয়ে টেকসই কৃষি ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে জরুরি হলো যুদ্ধ বন্ধ করা এবং ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোকে জরুরি ভিত্তিতে সহায়তা দেয়া। বিশ্ব নেতারা এখনই পদক্ষেপ না নিলে এ সামরিক উত্তেজনা এক ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় ডেকে আনবে।

শেয়ার করুন



এ জাতীয় আরো খবর..