শীর্ষ নেতাদের মৃত্যু

ইরান চালাচ্ছেন কে বা কারা?

  • নিউজ ডেস্ক

    প্রকাশ :- ২০২৬-০৩-২৪, | ২২:০২:০২ |
ইরানের প্রবীণ সর্বোচ্চ নেতা ও ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ডের কোরের (আইআরজিসি) শীর্ষ কয়েকজন কমান্ডার যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় নিহত হয়েছেন। শীর্ষ নীতি-নির্ধারকদের প্রাণহানি সত্ত্বেও গত ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া এই যুদ্ধে দেশটির শাসনব্যবস্থা কৌশল নির্ধারণ ও সামরিক কার্যক্রম পরিচালনার সক্ষমতা ধরে রেখেছে।

১৯৭৯ সালের বিপ্লবের মধ্য দিয়ে জন্ম নেওয়া ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান এক জটিল ক্ষমতার কাঠামো গড়ে তুলেছে। এই ব্যবস্থা গুটিকয়েক ব্যক্তির ওপর নির্ভর না করে ধর্মতাত্ত্বিক শাসনব্যবস্থার টিকে থাকার সম্মিলিত অঙ্গীকারের ওপর ভিত্তি করে বিভিন্ন স্তরের প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পরিচালিত হয়।

শীর্ষ নেতৃত্বের বড় একটি অংশ হারানোর পর বর্তমানে ইরানের দৃঢ় ও শক্তিশালী এই শাসনকাঠামোয় কারা ক্ষমতা ও প্রভাবের অধিকারী চলুন জেনে নেওয়া যাক...

• সর্বোচ্চ নেতা কি আসলেই দায়িত্বে আছেন?

যুদ্ধের শুরুতেই এক হামলায় ইরানের বর্ষীয়ান সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হয়েছেন। ১৯৮৯ সাল থেকে ক্ষমতায় থাকা খামেনির সিদ্ধান্তই ছিল দেশটির যেকোনও বড় বিষয়ে চূড়ান্ত।

ইরানের রাষ্ট্রীয় আদর্শ ‘ভেলায়েত-ই ফকিহ’ অনুযায়ী সর্বোচ্চ নেতা একজন বিদ্বান আলেম। যিনি শিয়া ইসলামের নবম শতাব্দীতে অন্তর্হিত হওয়া ১২তম ইমামের প্রতিনিধি হিসেবে জাগতিক ক্ষমতা পরিচালনা করেন। সর্বোচ্চ নেতার কার্যালয় ‘বাইত’ নামে পরিচিত; যার বিশাল কর্মকর্তা-কর্মচারী বাহিনী সরকারের অন্যান্য শাখার ওপর নজরদারি করে এবং সরাসরি আমলাতন্ত্রে হস্তক্ষেপের সুযোগ পায়।

খামেনির ছেলে মোজতবা খামেনি নতুন নেতা হিসেবে ব্যাপক আনুষ্ঠানিক ক্ষমতা উত্তরাধিকার সূত্রে পেলেও তার বাবার মতো স্বয়ংক্রিয় কর্তৃত্ব তিনি এখনও অর্জন করতে পারেননি। রেভল্যুশনারি গার্ডের পছন্দের এই নেতা কট্টরপন্থী সামরিক বাহিনীর কাছে অনেকটা ঋণী থাকতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।

মোজতবা নিজেও হামলায় আহত হয়েছিলেন এবং রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে তাকে বর্তমান যুদ্ধের ‌‘আহত বীর’ হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। নিয়োগের তিন সপ্তাহ পার হয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত কোনও ছবি বা ভিডিওতে তাকে দেখা যায়নি। কেবল দু’টি লিখিত বিবৃতি দিয়েছেন ইরানের নতুন এই সর্বোচ্চ নেতা।

• বিপ্লবী গার্ডের ভূমিকা কতটা গুরুত্বপূর্ণ?
কয়েক দশক ধরেই ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) প্রভাব বাড়ছে। তবে বর্তমান যুদ্ধ এবং আলি খামেনির মৃত্যুর পর মোজতবা খামেনির নিয়োগের ফলে কৌশলগত সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে এই বাহিনী আরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে।

নেতৃত্বশূন্যতা মোকাবিলায় দীর্ঘদিনের প্রস্তুতি থাকায় আইআরজিসির একটি ‘মোজাইক’ বা খণ্ডকালীন সাংগঠনিক কাঠামো রয়েছে। সেখানে প্রতিটি কমান্ডারের জন্য বিকল্প উত্তরসূরি আগে থেকেই নির্ধারিত থাকে এবং প্রত্যেক ইউনিট নির্ধারিত পরিকল্পনা অনুযায়ী স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে।

গত বছর এবং এই যুদ্ধের শুরুতে অনেক শীর্ষ কমান্ডার নিহত হলেও তাদের স্থলাভিষিক্ত হয়েছেন অভিজ্ঞ ব্যক্তিরা; যারা এখন পর্যন্ত এই জটিল যুদ্ধ পরিস্থিতি সামলাতে সক্ষম হয়েছেন। এই সক্ষমতা ১৯৮০-৮৮ সালের ইরাক যুদ্ধের অভিজ্ঞতা এবং দশকের পর দশক ধরে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন প্রক্সি যোদ্ধাদের নেতৃত্ব দেওয়ার শক্তিশালী কমান্ড কাঠামোরই প্রতিফলন।

• রাজনৈতিক নেতৃত্বের ভূমিকা কী?
ইরানের রাজনৈতিক ব্যবস্থা ধর্মীয় শাসনের সঙ্গে নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ও পার্লামেন্টের সমন্বয়ে গঠিত। আইআরজিসির পাশাপাশি এই প্রতিষ্ঠানগুলোরও দেশ পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।

খামেনির প্রধান উপদেষ্টা আলি লারিজানির মৃত্যু বর্তমান শাসকগোষ্ঠীর জন্য এক বড় ধাক্কা। ইরানের বিভিন্ন ক্ষমতার কেন্দ্রের মধ্যে সমন্বয় এবং বহির্বিশ্বের সঙ্গে আলোচনার ক্ষেত্রে তার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা ছিল অতুলনীয়। বর্তমানে আরও অনেক অভিজ্ঞ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব থাকলেও লারিজানির স্থলাভিষিক্তরা নিহতদের তুলনায় আরও বেশি কট্টরপন্থী হতে পারেন।

• গুরুত্বপূর্ণ নেতৃত্বে এখন আছেন কারা?
• আহমদ ওয়াহিদি (আইআরজিসি প্রধান) : দু’জন পূর্বসূরি নিহত হওয়ার পর আইআরজিসির বর্তমান প্রধান হিসেবে নিযুক্ত হন তিনি। তিনি আইআরজিসির অভিজাত শাখার কুদস ফোর্সের প্রধান ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন।

• ইসমাইল কানি (কুদস ফোর্স প্রধান) : ২০২০ সালে কাসেম সোলেইমানি নিহত হওয়ার পর থেকে তিনি এই ইউনিটের প্রধান। অত্যন্ত রহস্যময় এই ব্যক্তি আঞ্চলিক প্রক্সি ও মিত্রদের সঙ্গে ইরানের সম্পর্ক বজায় রাখেন।

• আলিরেজা তাংসিরি (আইআরজিসি নৌ-প্রধান) : ২০১৮ সাল থেকে দায়িত্ব পালন করছেন। হরমুজ প্রণালি বন্ধ করার ক্ষেত্রে তিনি বড় ভূমিকা পালন করেছেন।

• মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ (স্পিকার) : সাবেক আইআরজিসি কমান্ডার ও তেহরানের মেয়র গালিবফ বর্তমানে জীবিতদের মধ্যে অন্যতম শীর্ষ রাজনৈতিক নেতা। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নেপথ্যে আলোচনার ক্ষেত্রে তার নাম শোনা যাচ্ছে।

• আয়াতুল্লাহ গোলাম হোসেন মোহসেনি-এজেই (বিচার বিভাগীয় প্রধান) : ২০০৯ সালের বিক্ষোভ দমনে ভূমিকার জন্য আলোচিত সাবেক এই গোয়েন্দা প্রধান একজন কট্টরপন্থী হিসেবে পরিচিত।

• মাসুদ পেজেশকিয়ান (প্রেসিডেন্ট) : ইরানের প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা আগের চেয়ে অনেক কমলেও সরাসরি ভোটে নির্বাচিত হওয়ায় তার গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান রয়েছে। তবে উপসাগরীয় দেশগুলোর কাছে ইরানি হামলার জন্য ক্ষমা চেয়ে সম্প্রতি তিনি গার্ড বাহিনীর রোষানলে পড়েন এবং বক্তব্য আংশিক প্রত্যাহার করতে বাধ্য হন।

• সাঈদ জলিলি (সাবেক নিরাপত্তা প্রধান) : কট্টরপন্থী এই নেতা সাবেক পরমাণু আলোচক। ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে তিনি পরাজিত হন।

• আয়াতুল্লাহ আলিরেজা আরাফি (গার্ডিয়ান কাউন্সিল সদস্য) : খামেনির মৃত্যুর পর গঠিত তিন সদস্যের অন্তর্বর্তীকালীন কাউন্সিলের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন তিনি। তিনি অত্যন্ত বিশ্বস্ত একজন ধর্মীয় নেতা হিসেবে পরিচিত।

• আব্বাস আরাঘচি (পররাষ্ট্রমন্ত্রী) :  এই অভিজ্ঞ কূটনীতিক দীর্ঘ সময় ধরে পশ্চিমাদের পাশাপাশি রাশিয়া, চীন ও আরব দেশগুলোর সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের দরকষাকষি চালিয়ে আসছেন।

সূত্র: রয়টার্স।

শেয়ার করুন



এ জাতীয় আরো খবর..