ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যুদ্ধ চতুর্থ সপ্তাহে গড়িয়েছে। যুদ্ধের ফলাফল এখন আর কেবল রণক্ষেত্রে নির্ধারণ হচ্ছে না, পর্দার আড়ালে শুরু হয়েছে জোর কূটনৈতিক তৎপরতা।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নাটকীয়ভাবে সোমবার ইরানের বিদ্যুৎকেন্দ্রে হামলার পরিকল্পনা পাঁচদিন স্থগিত করেছেন। 'ইরানের সঙ্গে সবকিছু ভালোভাবে চলছে'- এমন মন্তব্যও করেছেন তিনি। তবে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমঝোতামূলক কোনো ধরনের আলোচনার কথা দ্ব্যর্থহীনভাবে অস্বীকার করেছে ইরান।
এমন প্রেক্ষাপটে আলোচনায় এসেছে পাকিস্তানের নাম। বলা হচ্ছে, যুদ্ধ বন্ধে ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের সমঝোতা আলোচনায় মধ্যস্থতা করছে ইসলামবাদ।
কূটনৈতিক সূত্রের বরাতে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের খবর, ইসলামাবাদ মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ থামাতে গত সপ্তাহে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালনের প্রস্তাব দেয়। এ বিষয়ে পাকিস্তানের সামরিক ও বেসামরিক একাধিক কর্মকর্তা উচ্চপদস্থ মার্কিন কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। ইসলামাবাদে একটি ত্রিপক্ষীয় বৈঠক আয়োজনের প্রস্তাবও দেওয়া হয় বলে জানা যায়।
ওয়াশিংটনভিত্তিক ইরানি বিশ্লেষক ভ্যালি নাসর মনে করেন, পাকিস্তানের এই উদ্যোগ একক- এমনটি ভাবার সুযোগ নেই। কেননা, পাকিস্তান তখনই এগিয়ে আসে যখন পেছনে সৌদি আরবের জোরালো সমর্থন থাকে। সুতরাং, রিয়াদ নিশ্বয়ই এই প্রক্রিয়ায় যুক্ত রয়েছে। আর পাকিস্তানের সঙ্গে সৌদি আরবের সামরিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক গভীর হওয়ায়, ইসলামবাদের মধ্যস্থতায় রিয়াদের ‘সম্মতি’ রয়েছে- এটা ধরেই নেওয়া যায়। তবে তেহরানের পাশাপাশি ওয়াশিংটনের সঙ্গে ইসলামাবাদের ভালো যোগাযোগের বিষয়টিও এখানে বিবেচনার দাবি রাখে।
বিশ্লেষক মাইকেল কুগেলম্যান বিষয়টি আরও স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি মনে করেন, পাকিস্তান মোটেও অপ্রাসঙ্গিক কোনো পক্ষ নয়। কারণ, গত এক বছরে পাকিস্তান ও ইরানের মধ্যে বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান প্রশাসনও পাকিস্তানের সামরিক নেতৃত্বের প্রতি আস্থাশীল। স্বয়ং ট্রাম্প বলেছেন, ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির ইরানকে অন্য অনেকের চেয়ে ভালো চেনেন। সবচেয়ে বড় কথা, যুক্তরাষ্ট্রে ইরানের কূটনৈতিক স্বার্থ অনেকটাই দেখাশোনা করে পাকিস্তান।
তুরস্ক ও মিসরের ভূমিকা
অনেকেই মনে করেন, যুদ্ধ থামানোর মধ্যস্থতায় ইসলামবাদ একা নয়, এ উদ্যোগে তুরস্ক এবং মিসর যুক্ত রয়েছে। কারণ, পাকিস্তান তুরস্ক—উভয়ই ইরানের প্রতিবেশী। যুদ্ধের কারণে ইরানে আরও অস্থিরতা তৈরি হলে তার প্রভাব সরাসরি পড়বে দেশ দুটির ওপর। ভৌগোলিক এই বাস্তবতা উত্তেজনা প্রশমনে তাদের আগ্রহী করে তুলেছে।
অন্যদিকে, মিসরের অবস্থান ভিন্ন হলেও তাৎপর্যপূর্ণ। বৃহত্তম আরব দেশ হিসেবে এবং ইসরায়েলের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ থাকায় কায়রো এমন গোপন বার্তা আদান-প্রদানে সক্ষম, যা অন্যদের পক্ষে সম্ভব নয়। আরব দেশগুলোর সরকার ও ইসরায়েলি নেতৃত্বের সঙ্গে মিসরের এই সুসম্পর্ক, যুদ্ধ বন্ধের উদ্যোগ নিতে বাড়তি মাত্রা যোগ করে।
পাকিস্তানের তৎপরতার কারণ
কূটনৈতিক পর্যবেক্ষকরা পাকিস্তানের তৎপরতার পেছনে তিনটি কারণ দেখছেন। এগুলো হলো- (১) প্রাথমিক হামলা-পাল্টা হামলার পর সংঘাত এখন দীর্ঘস্থায়ী ও বিপজ্জনক রূপ নিয়েছে। বিপর্যয় এড়াতে গোটাবিশ্ব যুদ্ধ থেকে বের হওয়ার পথ খুঁজছে; (২) যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি এবং তেহরানের জাতীয় মর্যাদা— দুটোই সরাসরি আলোচনায় বসার ক্ষেত্রে বড় বাধা। এই পরিস্থিতিতে তৃতীয় পক্ষের মধ্যস্থতা হতে পারে কার্যকর; এবং (৩) গত কয়েক দিনে ওয়াশিংটন, তেহরান ও উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ করে ইসলামাবাদ বুঝতে পারে, যুদ্ধ বন্ধে কিছুএকটা করা সম্ভব। সম্ভবত এই সুযোগটিই লুফে নিয়েছে ইসলামাবাদ। সূত্র: ডন
এ জাতীয় আরো খবর..