ইরানে মার্কিন ও ইসরাইলি আগ্রাসনের সম্মানজনক সমাধানের পথ খুঁজছে প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোগান নেতৃত্বাধীন তুরস্ক। একটি সম্ভাব্য চুক্তির বিষয়ে আলোচনা শুরু করতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসলামি প্রজাতন্ত্রের সাথেই যোগাযোগ করছে আঙ্কারা। এ বিষয়ে অবগত সূত্রগুলো তথ্যটি নিশ্চিত করেছে।
তুর্কি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সূত্রমতে, রোববার (২২ মার্চ) তুর্কি পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান এ সংঘাত অবসানের পদক্ষেপগুলো নিয়ে আলোচনা করতে ইরান, মিশর ও ইউরোপীয় সমকক্ষদের সঙ্গে ধারাবাহিক টেলিফোন আলাপ করেছেন।
একই দিনে ফিদান ঊর্ধ্বতন মার্কিন কর্মকর্তাদের সঙ্গেও কথা বলেন, যার মধ্যে বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং জ্যারেড কুশনার থাকতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সূত্রগুলো আরও জানায়, ওইদিন পরবর্তী সময়ে তিনি সৌদি আরব, কাতার, ইরাক ও পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সঙ্গেও আলোচনা করেন, যেখানে লড়াই থামানোর জন্য বিভিন্ন ‘উদ্যোগের মূল্যায়ন’ করা হয়।
আঙ্কারার চিন্তাভাবনার সঙ্গে পরিচিত ব্যক্তিদের মতে, তুরস্ক আলোচনার পরিবেশ তৈরির জন্য একটি সংক্ষিপ্ত যুদ্ধবিরতির ওপর জোর দিচ্ছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, যিনি এর আগে হরমুজ প্রণালিতে তেহরানের অব্যাহত অবরোধের কারণে ইরানের বিদ্যুৎ কেন্দ্রে হামলার হুমকি দিয়েছিলেন, সোমবার (২৩ মার্চ) জানিয়েছেন যে মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত নিরসনের লক্ষ্যে ওয়াশিংটন ‘ফলপ্রসূ কথোপকথন’ চালিয়ে যাচ্ছে।
তিনি পেন্টাগনকে ইরানের জ্বালানি অবকাঠামোতে যেকোনো সামরিক হামলা পাঁচ দিনের জন্য স্থগিত করার নির্দেশ দিয়েছেন এবং জানিয়েছেন যে পুরো সপ্তাহজুড়ে আলোচনা চলবে।
সপ্তাহান্তে তুর্কি পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান সাংবাদিকদের বলেন, আঙ্কারা আলোচনার সুযোগ তৈরির জন্য একটি সংক্ষিপ্ত ও অস্থায়ী যুদ্ধবিরতির কথা বিবেচনা করছে—যাতে আলোচনা ব্যর্থ হলে সব পক্ষই পুনরায় যুদ্ধ শুরু করার সুযোগ পায়।
ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সম্ভাব্য নেতিবাচক ভূমিকার দিকে ইঙ্গিত করে ফিদান বলেন, ‘ইসরাইল যুদ্ধ দীর্ঘায়িত করা এবং ইরানের আরও বেশি ক্ষতি করার নীতি অনুসরণ করতে পারে।’
তিনি আরও বলেন, এ ধরণের পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। ইসরাইল এমন একটি ধারণা দিচ্ছে যে তারা তাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ও শিল্প লক্ষ্যবস্তুগুলো ধ্বংস না করা পর্যন্ত থামবে না। সমস্যা হলো ইসরাইল শান্তি চায় না।
একটি তুর্কি সূত্র জানায়, ইসরাইলি প্রভাব মোকাবিলায় আঙ্কারা আলোচনার একটি ঐক্যবদ্ধ ফ্রন্ট তৈরির চেষ্টা করছে এবং সংঘাত নিরসনে ইউরোপীয়, পারস্য উপসাগরীয় এবং অন্যান্য আঞ্চলিক শক্তির সঙ্গে কাজ করছে।
সূত্রটি আরও যোগ করেছে যে, পারস্য উপসাগরীয় জ্বালানি অবকাঠামো এবং লবণাক্ত পানি বিশুদ্ধকরণ প্ল্যান্টের ওপর ইরানের হুমকি ওই অঞ্চলের দেশগুলোকে আতঙ্কিত করেছে, যা পরিস্থিতি পুনর্বিবেচনার একটি সুযোগ তৈরি করেছে।
প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো এমন একটি পথ খুঁজে বের করা যা উভয় পক্ষকে সন্তুষ্ট করবে। সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং কিছুটা সৌদি আরবসহ কয়েকটি উপসাগরীয় দেশ জোর দিচ্ছে যে, ইরানকে ভবিষ্যতে হরমুজ প্রণালিতে কোনোভাবেই অবরোধ সৃষ্টি করতে দেওয়া যাবে না।
ফিদান বলেন, যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর উপসাগরীয় দেশগুলো ইরানের কাছে তাদের প্রত্যাশা স্পষ্ট করতে পারে এবং নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ হলে মনোযোগ অর্থনৈতিক সহযোগিতার দিকে সরিয়ে নেওয়া যেতে পারে। ইরানও উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন ঘাঁটির বিষয়ে দাবি তুলে ধরতে পারে।
ইরান কি আলোচনার জন্য প্রস্তুত
আঙ্কারাভিত্তিক ইরান রিসার্চ সেন্টারের (আইআরএএম) চেয়ারম্যান সেরহান আফাকান বলেন, ইরান সম্ভবত আলোচনার যেকোনো বিশ্বাসযোগ্য পথ গ্রহণ করবে, কারণ যুদ্ধের কারণে তারা রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে মারাত্মক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন যে, তেহরানের দীর্ঘমেয়াদী স্থিতিশীলতা অনিশ্চিত রয়ে গেছে, বিশেষ করে যদি মার্কিন-ইসরাইলি হামলা ইরানের জ্বালানি অবকাঠামোকে লক্ষ্যবস্তু করে।
তুর্কি সূত্রের মতে, ইরানের দুটি প্রধান দাবি রয়েছে: ভবিষ্যতে কোনো হামলা না হওয়ার নিশ্চয়তা এবং তাদের ক্ষয়ক্ষতির ক্ষতিপূরণ।
সূত্রটি জানায়, একটি সম্ভাব্য সমাধান হতে পারে ইরানকে তাদের তেল বাণিজ্যের অর্থ ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া—যা হরমুজ প্রণালি দিয়ে সম্পদের অবাধ প্রবাহ নিশ্চিত করতে সাহায্য করতে পারে। ট্রাম্প প্রশাসন সম্প্রতি ১৪ কোটি ব্যারেল ইরানি তেলের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নিয়েছে, যা আনুমানিক ১৪ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য উন্মুক্ত করেছে।
আফাকান উল্লেখ করেছেন যে, আর্থিক বিষয়ের চেয়ে ভবিষ্যতে আর কোনো হামলা না চালানোর বিষয়ে মার্কিন প্রতিশ্রুতি পাওয়া ইরানের কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
এই প্রচেষ্টাগুলো সত্ত্বেও, আঙ্কারার অভ্যন্তরীণ মহল একটি স্থায়ী চুক্তির বিষয়ে হতাশাবাদী। তারা সন্দেহ পোষণ করছেন যে, ইসরাইল ইরানকে আক্রমণ না করার বিষয়ে কোনো দীর্ঘমেয়াদী প্রতিশ্রুতি মেনে নেবে। ইরানের পারমাণবিক সমৃদ্ধকরণ শূন্যতে নামিয়ে আনার ট্রাম্পের দাবিও একটি বড় বাধা হিসেবে রয়ে গেছে।
তাদের এই সংশয়ের কারণ মূলত ইসরাইলের তথাকথিত ‘মোয়িং দ্য লন’ (ঘাস কাটা) কৌশলের প্রতি সমর্থন, যার আওতায় তেহরানের আঞ্চলিক প্রভাব সীমিত করতে পর্যায়ক্রমে ইরানি সামরিক সক্ষমতার ওপর হামলা চালানো হয়।
ভবিষ্যৎ পদক্ষেপ হিসেবে ট্রাম্প ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনায় রাশিয়াকে একজন 'গ্যারান্টর' বা জামিনদার হিসেবে রাখার প্রস্তাব দিতে পারেন—বিশেষ করে যেহেতু ওয়াশিংটন ওমানকে আর আলোচনার উপযুক্ত স্থান হিসেবে দেখছে না। ইরান ও ইসরাইলের পাশাপাশি সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরবের সঙ্গে রাশিয়ার দীর্ঘদিনের সুসম্পর্ক দেশটিকে একটি প্রধান মধ্যস্থতাকারী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে পারে।
তুর্কি সূত্রটি বলেছে, ট্রাম্প যেকোনো সময় বিজয় ঘোষণা করতে পারেন, কিন্তু ইসরাইলিরা হামলা অব্যাহত রাখতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ বলে মনে হচ্ছে।
সূত্র: মিডল ইস্ট আই।
এ জাতীয় আরো খবর..