প্রয়াত ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির পূর্বপুরুষ সম্পর্কে উঠে এসেছে নতুন একটি তথ্য। তার পূর্বপুরুষরা ভারতীয়। ভারতের উত্তর প্রদেশের জেলা বারাবাঁকির কিন্তুর নামে এক প্রত্যন্ত গ্রামে তাদের পূর্বপুরুষের শিকড়।
টাইমস অব ইন্ডিয়ার একটি প্রতিবেদনে থেকে বিষয়টি জানা গেছে।
প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ভারতের উত্তর প্রদেশের জেলা বারাবাঁকি। ভারতের শতাব্দীপ্রাচীন লক্ষ্ণৌ শহর থেকে ৭০ কিলোমিটার দূরে ঘাঘরা নদীর তীরে অবস্থিত ১৩ হাজার জনসংখ্যার শান্ত গ্রাম কিন্তুর। সেখানে এখন মাত্র পাঁচটি শিয়া পরিবার বসবাস করে। তাদের মধ্যে কাজমি পরিবার দাবি করে যে তাদের দূর সম্পর্ক রয়েছে সাইয়েদ আহমদ মুসাভি হিন্দির সঙ্গে, যিনি ছিলেন আয়াতুল্লাহ-রুহুল্লাহর দাদা। সেই প্রভাবশালী ধর্মগুরু, যিনি ১৯৭৯ সালের ইরানের ইসলামি বিপ্লবের সূচনা করেন এবং দেশের প্রথম সর্বোচ্চ নেতা হন।
উনিশ শতকের শুরুর দিকে কিন্তুরে জন্ম নেওয়া সাইয়েদ আহমদ মুসাভির জীবনযাত্রা এই সাধারণ গ্রাম থেকে শুরু হয়ে পশ্চিম এশিয়ার ইতিহাসে গভীর প্রভাব ফেলে। ১৮৩০ সালে তিনি ঔপনিবেশিক শাসন থেকে পালিয়ে ভারত ছেড়ে ইরানের নাজাফ শহরে পাড়ি জমান এবং পরে ১৮৩৪ সালে খোমেইনে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। সেখান থেকেই তাদের পারিবারিক নামের উৎপত্তি।
সাইয়েদ আহমদ মুসাভির ঘরে এখনো রুহুল্লাহ খোমেনির একটি প্রতিকৃতি
সত্তরোর্ধ্ব সাইয়েদ নিহাল কাজমি বলেন, “আমার প্রপিতামহের প্রপিতামহ মুফতি মোহাম্মদ কুলি মুসাভি এবং সাইয়েদ আহমদ মুসাভি ছিলেন চাচাতো ভাই। আহমদের যাত্রা শুরু হয়েছিল এই কিন্তুরে। তিনি শেষ পর্যন্ত ইরানের স্থায়ী হন।’’
একসময় আওধ রাজ্যে শিয়া শিক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র ছিল এই গ্রাম।
বিবিসি সাংবাদিক ও লেখক বাকের মঈন তার ‘খোমেনি: লাইফ অব দ্য আয়াতুল্লাহ’ বইয়ে লিখেছেন যে সাইয়েদ আহমদ মুসাভি হিন্দি প্রায় ১৮৩০ সালের দিকে তীর্থযাত্রার উদ্দেশ্যে ইরাকের নাজাফ শহরে যান। সেখানে তার পরিচয় হয় ইরানের খোমেইনের কাছে ফারাহান এলাকার জমিদার ইউসুফ খান কামারচির সঙ্গে।
ইউসুফের অনুপ্রেরণায় সাইয়েদ আহমদ ১৮৩৯ সালে ইরানে বসতি স্থাপন করেন এবং খোমেইনে একটি বড় বাড়ি ও বাগান কিনে নেন, যা এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে তাদের পরিবারে ছিল।
পরবর্তীতে সাইয়েদ আহমদ মুসাভি একজন দ্বাদশ ইমামপন্থী শিয়া ধর্মগুরু হয়ে ওঠেন। তার তৃতীয় স্ত্রী সাকিনেহ আহমদের ঘরে তার তিন কন্যা ও এক পুত্র সাইয়েদ মোস্তফা জন্ম নেন। সাইয়েদ মোস্তফা রুহুল্লাহ খোমেনির পিতা। সাইয়েদ আহমদ মুসাভি ১৮৬৯ সালে মৃত্যুবরণ করেন। কারবালায় তাকে দাফন করা হয়।
বাকের মঈনের মতে, “ আটারশ শতকের শুরুতে তারা ভারতে এসে কিন্তুরে বসতি স্থাপন করে।’’ এই মুসাভি সাইয়েদ পরিবার দাবি করে যে তারা নবী মুহাম্মদের বংশধর। তার কন্যা এবং সপ্তম শিয়া ইমাম মুসা আল-কাজিমের মাধ্যমে তাদের বংশপরিচয় গড়ে উঠেছে।
নিহাল কাজমির কনিষ্ঠ পুত্র এবং এলএলবি ডিগ্রিধারী সাইয়েদ আদিল কাজমি বলেন, “আমাদের পূর্বপুরুষদের নিশাপুর থেকে কিন্তুরে আগমন এবং আহমদের ইরানে ফিরে যাওয়া এই দুই বিশ্বের মধ্যে একটি যোগসূত্র তৈরি করেছে।’’
বর্তমানে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির অধীনে দেশের যে প্রতিরোধ দেখা যায়, তা খোমেনির অদম্য চেতনার প্রতিফলন- তিনি বলেন।
আদিল বলেন, “খামেনি বা ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের অনেক আগেই আমাদের কিন্তুরে জন্ম নেওয়া সাইয়েদ আহমদের ইরানে বসতি স্থাপনের সিদ্ধান্ত পশ্চিম এশিয়ার ইতিহাসে পরিবর্তন এনেছিল।’’
সাইয়েদ আহমদের যাত্রা থেকে খোমেনির বিপ্লব পর্যন্ত কিন্তুরের নিস্তব্ধ পথগুলো বিশ্বাস, অভিবাসন এবং এমন একটি পরিবারের গল্প ধারণ করে, যারা দুই মহাদেশকে যুক্ত করে ইতিহাসে অমোচনীয় ছাপ রেখে গেছে।
কিন্তুরের ঐতিহ্যের মধ্যে আরও রয়েছেন বিচারপতি সাইয়েদ করামত হুসাইন। যিনি আলাহাবাদ হাইকোর্টের বিচারপতি হয়েছিলেন এবং লক্ষ্ণৌ শহরে ‘করামত হুসাইন মুসলিম গার্লস পিজি কলেজ’ প্রতিষ্ঠা করে নারীদের শিক্ষার প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন।