৩৯ বছর পান বিক্রি করেন সিদ্দিক, এক খিলির দাম ১৫৭৫ টাকা

  • নিউজ ডেস্ক

    প্রকাশ :- ২০২৬-০৩-২২, | ১৬:৫২:৫৩ |
রাজশাহীর ঐতিহ্যবাহী ঈদ মেলায় বাঘা দরগা শরিফের গেটের সামনে সিদ্দিক কবিরাজের পানের দোকান। একটি খিলি পান বিক্রির তালিকায় রয়েছে সর্বোচ্চ ১ হাজার ৫৭৫ টাকায়। সর্বনিন্ম ১০ টাকা পর্যন্ত।

তিনি ৩৯ বছর যাবত ব্যবসা করে আসলেও ঐতিহ্যবাহী ঈদ মেলায় ৩১ বছর যাবত পানের খিলি বিক্রি করে আসছেন।

সিদ্দিক কবিরাজ (৫৭) নাটোরের লালপুর উপজেলার জয়রামপুর-বেড়িলাবাড়ি গ্রামের মৃত গরিবউল্লার ছেলে। হরেক রকম জর্দ্দা ও মসলা দিয়ে তৈরি করেন বিভিন্ন স্বাদের পান। বাহারি এই পান খেতে দূরদূরান্ত থেকে লোক আসে সিদ্দিক কবিরাজের দোকানে।

অভাব-অনটন সিদ্দিক কবিরাজকে বাধ্য করেছে পান বিক্রি করতে। বড় ধরনের ব্যবসা করতে মোটা অংকের পুঁজির প্রয়োজন। তার সাধ থাকলেও সাধ্যের বাইরে ছিল সে স্বপ্ন। ১৯৮৭ সালে স্বল্প পুঁজি নিয়ে শুরু করেন এই খিলি পান বিক্রি।

দীর্ঘ ৩৯ বছর পানের দোকানদারী করে সিদ্দিক কবিরাজ এখন স্বাবলম্বী হয়ে উঠেছেন। তিনি এই মেলায় দুই দিনে প্রায় অর্ধলক্ষাধিক টাকার খিলি পান বিক্রি করেছেন। এই মেলায় ১টি খিলি ভালবাসার পান ৩৩৫ টাকায় বিক্রি করেছেন।

সিদ্দিক কবিরাজ এ মাসে প্রায় লক্ষাধিক টাকার পান বিক্রি হয়েছে। এর মধ্যে তিনি এই মেলায় ২ দিনে প্রায় অর্ধলক্ষাধিক টাকার খিলি পান বিক্রি করেছেন। বিভিন্ন পণ্যের দামসহ যাবতীয় খরচ বাদ দিয়ে প্রতি মাসে ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা আয় হয়। পান বিক্রি করেই সিদ্দিক কবিরাজ তার সন্তানদের লেখাপড়া শেখাচ্ছেন।

সিদ্দিক কবিরাজের মেয়ে শিখা খাতুন অনার্স মাস্টার্স সম্পন্ন কারিয়ে বিয়ে দিয়েছেন। ছেলে শান্ত হোসেন স্থানীয় স্কুল থেকে এবার এসএসসি পাশ করেছে। তিনি নিজে অর্থনৈতিক সংকটের কারণে খুব বেশি লেখাপড়া করতে পারেননি। তবে টাকার অভাবে যাতে ছেলের পড়াশুনা বন্ধ না হয়ে যায়, সে ব্যাপারে যথেষ্ট সচেতন রয়েছে সিদ্দিক কবিরাজ। মেয়ের মতো ছেলেকে উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত করে গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখছেন পান ব্যবসায়ী সিদ্দিক কবিরাজ।

সিদ্দিক কবিরাজের দোকানে পানের মূল্যের তালিকার মধ্যে- নবাব পান ১৫৭৫ টাকা, জমিদার পান ১০৫০ টাকা, নাটোরের বনলতা পান ১৫৭৫ টাকা, আয়ুর্বেদিক পান ৯৯৫ টাকা, বিয়াই-বিয়ান পান ৮৮৫ টাকা, শালি-দুলাভাই পান ৭৭৫ টাকা, হাসি-খুশি পান ৫৫৫ টাকা, নতুন বাবুর হাতের পান ৪৪৫ টাকা, ভালো বাসার পান ৩৩৫ টাকা, বন্ধু-বান্ধবীর পান ২৫ টাকা ও জনতার পান ১০ টাকা।

সোমবার (২২ মার্চ) দৌলতপুর থেকে মেলায় ঘুরতে এসে এক ব্যক্তি ভালবাসার পান ৩৩৫ টাকা মূল্যের একটি পান নেন।

এ সময় এ প্রতিবেদককে বলেন, এর আগেও তার কাছে থেকে পান খেয়েছি। তার পান খেলে মনে হয় মুখ থেকে পান ফুরোচ্ছে না। খেতে খুব সুস্বাদু।

এ বিষয়ে বাঘা প্রেস ক্লাবের আহ্বায়ক আবদুল লতিফ মিঞা বলেন, দীর্ঘ দিন থেকে এই মেলায় পান বিক্রি করে আসছেন সিদ্দিক কবিরাজ। তার পান খাওয়ার জন্য মানুষ কিছু সময়ে লাইন নিয়ে থাকেন। বিক্রিও ভালো হয়।

সিদ্দিক কবিরাজ বলেন, আমি দেশের বিভিন্ন জেলায় পান বিক্রি করে বেড়াই। স্থানীয়ভাবে ব্যবসা করি না। ভ্রাম্যমাণ হিসেবে এ ব্যবসা করে আসছি। যেখানে বড় বড় মেলা বা অনুষ্ঠান হয় সেখানে যায়। এভাবে দীর্ঘ ৩৯ বছর চলছে।

তিনি বলেন, আমার সাত ভাই বোনের মধ্যে আমি বড়। বাবা ১২ বছর আগে মারা গেছেন। বর্তমানে বৃদ্ধ মাসহ ৫ সদস্যের পরিবার পরিচালনা করতে কোনো বেগ পেতে হয় না।

উল্লেখ্য, প্রায় ৫০০ বছর আগে ১৫২৩-২৪ সালে (৯৩০ হিজরি) হুসেন শাহী বংশের প্রতিষ্ঠাতা আলাউদ্দিন হুসেন শাহের পুত্র সুলতান নুসরাত শাহ, হযরত আব্বাসী এবং তার বংশধর হযরত শাহ মোয়াজ্জেম ওরফে শাহদৌলা (র.), তার পুত্র হযরত আবদুল হামিদ দানিশমন্দ (র.) এবং জহর খাকীসহ পাঁচজন সঙ্গী ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে পদ্মা নদীর তীরবর্তী বাঘায় বসবাস শুরু করেন। তাদের চরিত্র, ব্যবহার ও আত্মিক শক্তিতে আকৃষ্ট হয়ে এলাকার বহু মানুষ ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। তাদের স্মরণে ওরসকে কেন্দ্র করে ঈদের দিন থেকে বাঘা ওয়াকফ এস্টেটের বিশাল এলাকাজুড়ে এই মেলা অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে।

শেয়ার করুন



এ জাতীয় আরো খবর..