✕
নিউজ ডেস্ক
প্রকাশ :- ২০২৬-০৩-২১, | ১৬:০৬:০০ |যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান সামরিক তৎপরতা এবং মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ওয়াশিংটন আবারও ১৯৮৮ সালের মতো জটিল সমীকরণের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে। সম্প্রতি ইরানের গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক কেন্দ্র খারগ দ্বীপে মার্কিন বিমান হামলার পর প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, সেখানকার সামরিক স্থাপনাগুলো পুরোপুরি ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে। তবে তেল অবকাঠামোতে সরাসরি আঘাত না হানার সিদ্ধান্ত ইঙ্গিত দিচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্র বর্তমানে অত্যন্ত সতর্কতার সাথে পা ফেলছে। একই সময়ে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চল থেকে আড়াই হাজার নৌসেনার একটি বিশেষ দল মধ্যপ্রাচ্যের দিকে পাঠানোর ঘটনাটি সমরবিদদের মধ্যে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই বিপুল সংখ্যক নৌসেনার মোতায়েন আসলে হরমুজ প্রণালীতে অবস্থিত কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ ইরানি দ্বীপগুলো দখলের আগাম প্রস্তুতি হতে পারে। বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের অবাধ সরবরাহ নিশ্চিত করতে এই প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ নেওয়া যুক্তরাষ্ট্রের জন্য অপরিহার্য হয়ে পড়েছে, কারণ যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই ইরান এই জলপথে বাণিজ্যিক জাহাজে নিয়মিত হামলা চালিয়ে আসছে।
মার্কিন নৌবাহিনী যদি এই দ্বীপগুলোর নিয়ন্ত্রণ নিতে পারে, তবে তারা সরাসরি ট্যাংকারগুলোর সুরক্ষা নিশ্চিত করতে পারবে। অন্যথায় দীর্ঘমেয়াদী সংকটের ফলে জ্বালানি নির্ভর উপসাগরীয় মিত্র দেশগুলো এমনকি নিরপেক্ষ রাষ্ট্রগুলোও ওয়াশিংটনের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে পারে।
বর্তমান এই উত্তপ্ত পরিস্থিতির সাথে চার দশক আগের ‘ট্যাংকার যুদ্ধ’ বা ১৯৮৮ সালের ঘটনাবলীর অদ্ভুত সাদৃশ্য খুঁজে পাওয়া যায়। সে সময় ইরান-ইরাক যুদ্ধের চরম পর্যায়ে হরমুজ প্রণালী দিয়ে যাতায়াতকারী কয়েকশ আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা চালানো হয়েছিল। সেই পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র কুয়েতি ট্যাংকারগুলোকে মার্কিন পতাকাবাহী জাহাজে রূপান্তর করে পাহারা দেওয়ার কাজ শুরু করে। ১৯৮৭ সালে একটি ইরাকি ক্ষেপণাস্ত্র মার্কিন যুদ্ধজাহাজ ইউএসএস স্টার্ক-এ আঘাত হানলে ৩৭ জন নৌসেনার মৃত্যু হয়। যা ওয়াশিংটনকে এই অঞ্চলে সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপ করতে বাধ্য করেছিল।
১৯৮৮ সালের এপ্রিলে ইরানি মাইন বিস্ফোরণে ইউএসএস স্যামুয়েল বি. রবার্টস ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র 'অপারেশন প্রেয়িং ম্যানটিস' শুরু করে। একদিনের সেই বিধ্বংসী নৌযুদ্ধে মার্কিন বাহিনী ইরানের নৌবহরের প্রায় অর্ধেক অংশ ধ্বংস করে দিয়েছিল, যা ছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সর্ববৃহৎ নৌ-লড়াই। সেই উত্তাল সময়েও যুক্তরাষ্ট্র ইরানের কয়েকটি দ্বীপ দখলের পরিকল্পনা হাতে নিয়েছিল, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তারা স্থলভাগে কোনো অভিযান চালায়নি। তৎকালীন গোয়েন্দা বিশেষজ্ঞ ম্যালকম ন্যান্সের মতে, হরমুজ, কেশম ও লারাকের মতো দ্বীপগুলো দখলের পরিকল্পনা সে সময় খতিয়ে দেখা হয়েছিল, কিন্তু তা বাস্তবায়িত হয়নি অত্যন্ত সংবেদনশীল কিছু কারণে।
তৎকালীন মার্কিন নীতিনির্ধারকরা বুঝতে পেরেছিলেন, এই দ্বীপগুলোতে আক্রমণ করার অর্থ হবে সরাসরি ইরানের মূল ভূখণ্ডে আক্রমণ করা। এর ফলে লাখ লাখ ইরানি বিপ্লবী গার্ড এবং বাসিজ বাহিনী পার্শ্ববর্তী পাহাড়গুলো থেকে দ্বীপগুলোর ওপর আত্মঘাতী হামলা ও বোমাবর্ষণ শুরু করত। বর্তমান প্রেক্ষাপটেও ম্যালকম ন্যান্স সতর্ক করে দিয়েছেন, ১৯৮৮ সালের সেই বাধাগুলো আজও সমানভাবে বিদ্যমান। আরব আমিরাত বা কাতারের মতো দেশগুলো যদি তাদের ঘাঁটি ব্যবহারের অনুমতি না দেয়, তবে মার্কিন সরবরাহ ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হবে এবং অত্যন্ত সংকীর্ণ এই প্রণালীতে মার্কিন জাহাজগুলো ইরানি ড্রোন ও মাইনের সহজ লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হবে।
বর্তমানে ট্রাম্প প্রশাসন যে আড়াই হাজার নৌসেনা মোতায়েন করেছে, সামরিক বিশ্লেষকদের মতে তা কোনো দ্বীপ দখলের জন্য একেবারেই অপর্যাপ্ত। আশির দশকে যখন এই ধরণের অভিযানের পরিকল্পনা করা হয়েছিল, তখন অন্তত ছয় হাজার নৌসেনার প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হয়েছিল। তারপরেও ঝুঁকি বিবেচনায় সেই সিদ্ধান্ত বাতিল করা হয়েছিল। যদি যুক্তরাষ্ট্র প্যারাশুট ব্যবহার করে এই দ্বীপগুলোতে নামার চেষ্টা করে, তবে তাদের পরিণতি ইউক্রেন যুদ্ধের শুরুর দিকে কিয়েভের কাছে হোস্টোমেল বিমানবন্দরে রুশ কমান্ডোদের পরাজয়ের মতো হতে পারে। সেখানে রুশ বাহিনী আকাশপথে সেনা নামালেও নিরাপদ সাপ্লাই লাইন নিশ্চিত করতে না পেরে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির শিকার হয়েছিল।
আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর রাজনৈতিক অবস্থান। যারা হয়তো মার্কিন বাহিনীকে তাদের ভূমি ব্যবহার করে ইরানে সরাসরি আক্রমণ করতে দিতে রাজি হবে না। এমন পরিস্থিতিতে মার্কিন রসদ সরবরাহ ব্যবস্থা অত্যন্ত নাজুক হয়ে পড়বে। ইরানের দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ও আত্মঘাতী ড্রোনের মুখে মার্কিন সেনারা অরক্ষিত হয়ে পড়বে। বিশ্লেষকরা সতর্ক করেছেন। তারা বলছেন, যুদ্ধের উন্মাদনায় কোনো ভুল সিদ্ধান্ত নিলে এটি ১৯৮০ সালের ব্যর্থ মার্কিন জিম্মি উদ্ধার অভিযান 'অপারেশন ইগল ক্ল'-এর মতো একটি সামরিক বিপর্যয়ে রূপ নিতে পারে।
ইতিহাস সাক্ষী দিচ্ছে, বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক বাহিনী হওয়া সত্ত্বেও ভূ-প্রাকৃতিক সুবিধা এবং স্থানীয় প্রতিরোধের সক্ষমতা যেকোনো বড় শক্তির জন্য দুঃস্বপ্ন হয়ে দাঁড়াতে পারে। ইরানের উপকূলীয় পর্বতমালা থেকে শুরু করে সমুদ্রের তলদেশের মাইন পর্যন্ত প্রতিটি ইঞ্চি এলাকা মার্কিন বাহিনীর জন্য প্রতিকূল। তাই হোয়াইট হাউস বা পেন্টাগন যদি সত্যিই দ্বীপ দখলের পথে হাঁটে, তবে তাদের শুধু সামরিক সক্ষমতা নয় বরং চার দশক আগের সেই অমীমাংসিত সমীকরণগুলোকেও মাথায় রাখতে হবে।