এফ-৩৫ স্টিলথ যুদ্ধবিমানে আঘাত

যে কৌশলে মার্কিন দম্ভ পদপিষ্ট করল ইরান

  • নিউজ ডেস্ক

    প্রকাশ :- ২০২৬-০৩-২১, | ১২:৫৩:৪৩ |
গণহত্যাকারী ইসরাইল ও তাদের সহযোগী যুক্তরাষ্ট্র যৌথভাবে ইরানে আগ্রাসন চালাচ্ছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি হামলা শুরু করার পর দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিসহ শীর্ষ বেশ কয়েকজন নেতা ও সামরিক কর্মকর্তা নিহত হয়েছেন।

এরপর কঠোর ভাষায় পালটা হামলা শুরু করে তেহরান। একাই দুই পরাশক্তিকে সমুচিত জবাব দিয়ে যাচ্ছে খামেনির দেশ। ঝাঁকে ঝাঁকে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ছুড়ে ইসরাইলের অনেক শহর, সামরিক ও সরকারি স্থাপনা ধ্বংসস্তূপে পরিণত করেছে ইরান।

এর বাইরে উপসাগরীয় দেশগুলোয় মার্কিন সামরিক ঘাঁটি ও স্বার্থসংশ্লিষ্ট স্থাপনায় অনবরত আক্রমণ করছে ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী- আইআরজিসি। এতে মধ্যপ্রাচ্য ছেড়ে পালিয়ে গেছে হাজার হাজার মার্কিন নাগরিক, ব্যবসায়ী ও সেনা। ধ্বংস হয়েছে বেশ কয়েকটি আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও রাডার সিস্টেম। 

শুধু তাই নয়, ইরানের সঙ্গে লড়তে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্র একাই ডজনখানেক অত্যাধুনিক ড্রোন ও ১৬টি অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান হারিয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে অবাক করার মতো ঘটনা ঘটেছে গত বৃহস্পতিবার (১৯ মার্চ), যখন ইরানের মাত্র ৩ হাজার ডলারের একটি ক্ষেপণাস্ত্র যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ২০ কোটি ডলারের অত্যাধুনিক স্টিলথ যুদ্ধবিমান এফ-৩৫-এ আঘাত হানে। বিশ্বে প্রথমবারের মতো ইরান এটি করে দেখিয়েছে, যা মার্কিন অপরাজেয় দম্ভ চূর্ণ করে দিয়েছে।

এরপরই সমরাস্ত্র বিশ্লেষকদের মধ্যে হইচই পড়ে গেছে যে, ইরান এটি কীভাবে সম্ভব করল, যেখানে দেশটির সামরিক সক্ষমতা একেবারে ধ্বংস করে দেওয়ার দাবি করেছে মার্কিন সেনাবাহিনী।

চীনা বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের সম্ভাব্য হামলায় যুক্তরাষ্ট্রের পঞ্চম প্রজন্মের একটি এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান প্রথমবারের মতো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঘটনাটি ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, স্টিলথ জেটগুলোকে ইলেক্ট্রো-অপটিক্যাল/ইনফ্রারেড (ইও/আইআর) সেন্সর সিস্টেমের মাধ্যমে শনাক্ত করা সম্ভব।

মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার ইরানে একটি যুদ্ধ অভিযান চলাকালীন স্টিলথ ফাইটারটি জরুরি অবতরণ করতে বাধ্য হয়। 

মুখপাত্র ক্যাপ্টেন টিম হকিন্স এক বিবৃতিতে বলেন, ‘আমরা এই রিপোর্টের বিষয়ে অবগত যে, ইরানে একটি যুদ্ধ অভিযান শেষে একটি মার্কিন এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান ওই অঞ্চলের একটি মার্কিন বিমান ঘাঁটিতে জরুরি অবতরণ করেছে।’

তিনি আরও যোগ করেন, ‘বিমানটি নিরাপদে অবতরণ করেছে এবং পাইলট স্থিতিশীল অবস্থায় আছেন। এই ঘটনা বর্তমানে তদন্তাধীন রয়েছে।’

যদিও সঠিক বিবরণ এবং সময়সীমা এখনও নিশ্চিত হওয়া যায়নি, তবে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যৌথ বিমান হামলার মাধ্যমে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর এটিই হতে পারে ইরানের হাতে কোনো মার্কিন সর্বশেষ প্রজন্মের যুদ্ধবিমান ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার প্রথম ঘটনা। ইরানের আইআরজিসি একটি পৃথক বিবৃতিতে জানিয়েছে যে, তারা মধ্য ইরানের আকাশে একটি মার্কিন বিমানকে লক্ষ্যবস্তু করেছে।

স্টিলথ একটি প্রতিশ্রুতি মাত্র, কোনো নিশ্চয়তা নয়। মার্কিন বিমান বাহিনীর এফ-৩৫এ লাইটনিং-২ ইতিহাসের সবচেয়ে ব্যয়বহুল অস্ত্র কর্মসূচি, যা এই ধারণার ওপর ভিত্তি করে তৈরি করা হয়েছে যে এটি যেকোনো কঠোরভাবে সুরক্ষিত আকাশসীমা দিয়েও অলক্ষ্যে চলে যেতে পারবে। 

বিমানের স্টিলথ ক্ষমতা মূলত রাডার-ভিত্তিক শনাক্তকরণ ব্যবস্থাকে পরাস্ত করার জন্য তৈরি করা হয়েছে; এর আকৃতি এমনভাবে দেওয়া হয়েছে যাতে এটি রেডিও-ফ্রিকোয়েন্সি তরঙ্গকে চারদিকে ছড়িয়ে দিতে পারে এবং এতে এমন উপাদানের প্রলেপ দেওয়া হয়েছে যা ওই তরঙ্গগুলো শুষে নিতে পারে।

কিন্তু এটি যা করতে পারে না, তা হলো এর তাপীয় সংকেত পুরোপুরি নির্মূল করা।

ইরান এমন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা তৈরি করেছে যা বিমানকে লক্ষ্যবস্তু করার জন্য রাডারের পরিবর্তে 'প্যাসিভ ইনফ্রারেড সেন্সর' ব্যবহার করে। এই পদ্ধতি ইতোমধ্যে ইয়েমেনে ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীদের দ্বারা ব্যবহৃত হয়ে কার্যকর প্রমাণিত হয়েছে।

প্যাসিভ সিস্টেমগুলো বিশেষভাবে বিপজ্জনক, কারণ এগুলো নিজস্ব কোনো রেডিও সংকেত নির্গত করে না। একটি বিমানের রাডার-ওয়ার্নিং রিসিভার আগত রাডার সংকেত শনাক্ত করতে পারে, কিন্তু প্যাসিভ ইনফ্রারেড ট্র্যাকার আঘাত হানার মুহূর্ত পর্যন্ত সম্পূর্ণ নীরব থাকে। এই ধরনের তাৎক্ষণিকভাবে তৈরি বা জোড়াতালি দেওয়া ব্যবস্থাগুলো হুমকির ব্যাপারে খুব সামান্য বা কোনো আগাম সতর্কবার্তা দেয় না, এমনকি আসন্ন আক্রমণের ক্ষেত্রেও নয়।

যদিও এফ-৩৫এ-তে নিজস্ব 'ডিস্ট্রিবিউটেড অ্যাপারচার সিস্টেম' রয়েছে (যা ছয়টি ইনফ্রারেড ক্যামেরার একটি নেটওয়ার্ক এবং চারপাশের ৩৬০-ডিগ্রি পরিস্থিতি সম্পর্কে ধারণা দেয়), তবে কোনো কিছু শনাক্ত করা এবং তা থেকে আত্মরক্ষা করা সম্পূর্ণ ভিন্ন দুটি বিষয়।’

হুথি বিদ্রোহীরা, যাদের কাছে ইরানের তুলনায় অনেক সাধারণ মানের ব্যবস্থা রয়েছে, তারা ইতোমধ্যে এই ফাঁকটি (দুর্বলতা) ধরিয়ে দিয়েছে। হুথি বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার বিরুদ্ধে লড়াইরত মার্কিন এফ-৩৫ বিমানগুলো সারফেস-টু-এয়ার (ভূমি থেকে আকাশে নিক্ষেপণযোগ্য) ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাত এড়াতে কৌশলী অবস্থান নিতে বাধ্য হয়েছিল।

'অপারেশন এপিক ফিউরি'-র গতিধারা এই ঝুঁকিকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। মার্কিন জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন সাংবাদিকদের বলেছেন, মার্কিন বিমানগুলো এখন আরও পূর্ব দিকে উড়ছে এবং ইরানের আকাশসীমার গভীরে প্রবেশ করছে। এই অঞ্চলেই ইরানের সেই সড়ক-মোবাইল (সহজে স্থানান্তরযোগ্য) বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাগুলো ঘনীভূত রয়েছে, যেগুলোকে খুঁজে বের করা এবং ধ্বংস করা অত্যন্ত কঠিন।

‘সড়ক-মোবাইল ব্যবস্থাগুলো প্রতিটি অভিযানের পর পুনরায় স্থানান্তর করা যায় এবং সাধারণ ভূখণ্ডে লুকিয়ে রাখা যায়। এগুলো কার্যত যেকোনো জায়গায় লুকিয়ে রাখা সম্ভব এবং স্থায়ী বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ধ্বংস হওয়ার অনেক পরেও যুদ্ধক্ষেত্রে এগুলো বড় হুমকি হিসেবে টিকে থাকে।

হরমুজ প্রণালির ওপর দিয়ে ইরানের উপকূল বরাবর নন-স্টিলথ এ-১০ গ্রাউন্ড অ্যাটাক জেট এবং এএইচ-৬৪ই অ্যাপাচি হেলিকপ্টারগুলো চলাচল করছে; এটি একটি সংকেত যে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের পশ্চিমাঞ্চলীয় আকাশসীমাকে নিয়ন্ত্রণযোগ্য এবং নিরাপদ মনে করছে। তবে ইরানের পূর্বদিকের অভ্যন্তরীণ অংশ সম্পূর্ণ ভিন্ন এক জগৎ।

যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এ পর্যন্ত এক ডজনেরও বেশি সামরিক বিমান হারিয়েছে। ২ মার্চ কুয়েতে একটি 'ফ্রেন্ডলি ফায়ার' (নিজেদের গুলিবর্ষণ) ঘটনায় তিনটি এফ-১৫ই স্ট্রাইক ইগল ভূপাতিত হয়। ১২ মার্চ পশ্চিম ইরাকে একটি কেসি-১৩৫ স্ট্র্যাটোট্যাঙ্কার বিধ্বস্ত হয়, যাতে ক্রুসহ ছয়জনই নিহত হন।’

সূত্র: সাউথ চীনা মর্নিং পোস্ট ও এনডিটিভি।

শেয়ার করুন



এ জাতীয় আরো খবর..