ইরানেরই বড় ‘উপকার’ করল যুক্তরাষ্ট্র

  • নিউজ ডেস্ক

    প্রকাশ :- ২০২৬-০৩-২০, | ১৪:২৪:০৬ |

ইরানের জ্বালানি খাতের ওপর ইসরায়েলি হামলার প্রেক্ষাপটে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি এক ভয়াবহ মোড় নিয়েছে। এতে বিশ্ব অর্থনীতি ও ভূ-রাজনীতিতে চরম অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন এই সংকট মোকাবিলায় যে কৌশল অবলম্বন করেছে, তাকে আনাড়ি বা ত্রুটিপূর্ণ হিসেবে অভিহিত করছেন আরব বিশ্বের নীতি-নির্ধারকরা। তাদের মতে, তেহরানের জ্বালানি স্থাপনায় হামলার সবুজ সংকেত দিয়ে ওয়াশিংটন আসলে নিজের অজান্তেই ইরানকে যুদ্ধের ময়দানে শক্তিশালী কৌশলগত অবস্থান উপহার দিয়েছে।

সম্প্রতি ইরানের দক্ষিণ পার্স গ্যাসক্ষেত্রে ইসরায়েলি হামলার পর তেহরান যে পাল্টা জবাব দিয়েছে, তা দীর্ঘদিনের যুদ্ধ-পরিকল্পনাকারীদের জন্য ছিল দুঃস্বপ্নের মতো বাস্তবতা। ইরান সরাসরি কাতারের রাস লাফান প্রাকৃতিক গ্যাস কেন্দ্রে হামলা চালিয়েছে, যা বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের আঘাত। এই পাল্টা আক্রমণের মধ্য দিয়ে তেহরান প্রমাণ করেছে, তারা কেবল আত্মরক্ষা নয় বরং প্রতিপক্ষের এবং তাদের মিত্রদের অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়ার সক্ষমতা রাখে।

আরব কর্মকর্তারা মিডল ইস্ট আইকে জানিয়েছেন যে দক্ষিণ পার্স গ্যাসক্ষেত্রে হামলার মাধ্যমে ওয়াশিংটন ও তেল আবিব মূলত একটি 'প্যান্ডোরার বাক্স' খুলে দিয়েছে। এর আগে ইরান কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নিয়েছিল এবং সেখানে নিজস্ব নৌ-করিডোর তৈরি করে শুল্ক আদায় শুরু করেছিল। এখন উৎপাদন স্থাপনায় সরাসরি আঘাত হানার মাধ্যমে তারা বুঝিয়ে দিয়েছে যে যুদ্ধের এই নতুন ফ্রন্টে তারা যেকোনো সীমা অতিক্রম করতে প্রস্তুত।

হামলার শিকার কাতারের রাস লাফান শিল্পনগরীর ক্ষয়ক্ষতি অত্যন্ত ব্যাপক বলে জানা গেছে। কাতার এনার্জির প্রধান নির্বাহী সাদ আল-কাবি জানিয়েছেন যে এই হামলার ফলে দেশটির এলএনজি রপ্তানি ক্ষমতা প্রায় ১৭ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। সবচেয়ে আশঙ্কাজনক তথ্য হলো, এই ধ্বংসযজ্ঞ কাটিয়ে উঠে উৎপাদন স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে অন্তত তিন থেকে পাঁচ বছর সময় লেগে যেতে পারে। এটি কেবল কাতারের জন্য নয়, বরং বিশ্বজুড়ে জ্বালানি আমদানিকারক দেশগুলোর জন্যও এক দীর্ঘমেয়াদী সংকটের সংকেত।

এদিকে ওয়াশিংটনের ভেতরে এই হামলার দায় নিয়ে এক ধরনের ধোঁয়াশা তৈরির চেষ্টা দেখা যাচ্ছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দাবি করেছেন যে তিনি দক্ষিণ পার্স হামলায় ইসরায়েলের পরিকল্পনা সম্পর্কে কিছুই জানতেন না। তবে মধ্যপ্রাচ্য বিশ্লেষক এবং সাবেক মার্কিন কূটনীতিকরা এই দাবিকে সরাসরি নাকচ করে দিয়েছেন। সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত ড্যান শাপিরো স্পষ্ট বলেছেন যে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড বা সেন্টকমের পূর্ণ উপস্থিতি এবং সম্মতি ছাড়া ইসরায়েল কখনোই এই ধরনের স্পর্শকাতর হামলা চালাতে পারে না।

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি অত্যন্ত কড়া ভাষায় এই পরিস্থিতির ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তিনি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দম্ভের সাথে জানিয়েছেন যে ইসরায়েলি হামলার জবাবে তারা তাদের শক্তির কেবল সামান্য অংশ প্রয়োগ করেছেন। তিনি হুশিয়ারি দিয়ে বলেছেন যে যদি ইরানের অবকাঠামোতে পুনরায় আঘাত করা হয়, তবে তারা বিন্দুমাত্র সংযম প্রদর্শন করবেন না। আরাগচির এই বক্তব্য উপসাগরীয় আরব দেশগুলোর মধ্যে নতুন করে আতঙ্ক ছড়িয়েছে, যারা এখন নিজেদের জ্বালানি সম্পদের নিরাপত্তা নিয়ে চরম উদ্বিগ্ন।

বিশ্ববাজারে তেলের দাম ইতোমধ্যেই আকাশচুম্বী হতে শুরু করেছে, যেখানে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেল প্রতি ১১৫ ডলার পর্যন্ত স্পর্শ করেছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা তাদের জরুরি মজুদ থেকে ৪০ কোটি ব্যারেল তেল বাজারে ছাড়ার ঘোষণা দিলেও দাম নিয়ন্ত্রণে আসছে না। মার্কিন ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্ট এমনকি ইরানের ওপর থেকে তেলের নিষেধাজ্ঞা শিথিলের ইঙ্গিত দিয়েছেন যাতে আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ ঠিক রাখা যায়, যা ট্রাম্প প্রশাসনের চরম অসহায়ত্বকেই প্রকাশ করছে।

উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলো এই সংঘাতকে একটি চূড়ান্ত সন্ধিক্ষণ হিসেবে দেখছে। একদিকে ইরানের বেপরোয়া মনোভাব এবং অন্যদিকে ট্রাম্প প্রশাসনের অদূরদর্শী সিদ্ধান্ত পুরো অঞ্চলকে এমন এক জায়গায় নিয়ে গেছে যেখানে বৈশ্বিক অর্থনীতির স্থায়িত্ব হুমকির মুখে। প্রাকৃতিক গ্যাসের বাজারে কাতারের বিশাল প্রভাব থাকায় ইউরোপসহ এশিয়ার দেশগুলো এখন এক অনিশ্চিত অন্ধকারের দিকে ধাবিত হচ্ছে, যার কোনো তাৎক্ষণিক সমাধান আপাতত কারো হাতে নেই।

মিডলইস্ট আইয়ের বিশ্লেষণ

শেয়ার করুন



এ জাতীয় আরো খবর..