বাংলাদেশের স্বাধীনতা-পরবর্তী একটি প্রজন্মকে রীতিমতো কাঁপিয়েছেন তিনি। কণ্ঠ দিয়ে মাতিয়ে রেখেছেন দেশ ও দেশের বাইরের কোটি কোটি ভক্তকে। গানের প্রতি, বিশেষ করে গণসংগীতের প্রতি একটা বাড়তি টান থেকেই নিজেকে সংগীত জগতে বিলিয়ে দেন আজম খান।
একাধারে গানকে সৃজনশীলভাবে উপস্থাপন করা এবং সাধারণ মানুষের হৃদয়ে পৌঁছে দেওয়ার মাধ্যমে আজম খান তরুণ প্রজন্মকে মাতিয়েছিলেন। তার গান ছিল বিনোদন, প্রেরণা, সচেতনতা এবং দেশপ্রেমের সংমিশ্রণ। দেশের বিভিন্ন প্রান্তের তরুণ-তরুণী উন্মাদ হয়ে উঠত তার কনসার্টে। রবীন্দ্রসংগীত, ফোক এবং বিদেশি প্রভাবের সঙ্গে তিনি এক নতুন বাংলা পপের ধারার জন্ম দেন।
আজম খানের জীবন ছিল সরল-সহজ, তবু অসাধারণ। জীবনের কোনো অহংকার ছিল না; গানই ছিল তার প্রাণ। সপ্তবর্ণা, ক্রান্তি শিল্পীগোষ্ঠী এবং অন্যান্য ব্যান্ডের সঙ্গে তার অভিজ্ঞতা বাংলা গানের দৃশ্যপট পাল্টে দিয়েছিল। দেশের হাজার হাজার তরুণ-তরুণী উন্মাতাল হয়ে উঠত তার কনসার্টে। তিনি ছিলেন সরল, ভদ্র এবং মানুষের কাছাকাছি; এ কারণেই প্রতিটি গান তার ভক্তদের মনে গভীর ছাপ ফেলে।
শৈশব কেটেছে আজিমপুর ও কমলাপুরে। ছোটবেলাতেই তিনি ভাষা আন্দোলনের উন্মাদনা অনুভব করেছেন। জানালার বাইরে তিনি দেখতেন মাতৃভাষার জন্য মানুষের গণজমায়েত এবং শুনতেন ‘ওরা আমার মুখের ভাষা কাইড়া নিতে চায়’, ‘কইমু না ভাই, কইমু না’ গানগুলো। স্কুল জীবনে তিনি বন্ধুদের সঙ্গে গান গাইতেন এবং মনে রাখতেন প্রতিটি সুর। হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের গান, আবদুল আলিম এবং শ্যামলের গান শোনার পর তিনি নিজেই সেগুলো হুবহু পরিবেশন করার চেষ্টা করতেন।
ষাটের দশকে তিনি যোগ দেন ক্রান্তি শিল্পীগোষ্ঠীতে। গান ছিল তার হাতে থাকা শক্তি। গণসংগীতের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের জীবন, সংগ্রাম এবং আশা-ভরসার গল্প তুলে ধরতেন তিনি। এরপর দেশব্যাপী গানের অনুষ্ঠান আয়োজন শুরু করেন। গণ-আন্দোলনের সময়ও তিনি গান পরিবেশন করতেন। পুলিশের লাঠির আওয়াজ, মুক্তিযুদ্ধের উত্তেজনা-সবই তার গানের সৃজনশীলতাকে প্রভাবিত করেছে।
মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি দেশ স্বাধীন করতে যুদ্ধেও যোগ দেন। মা-বাবার আশ্বাস নিয়ে দুই বন্ধুর সঙ্গে ভারতে ট্রেনিংয়ের উদ্দেশ্যে রওনা হন। ক্যাম্পে গানও চলত, গান হয়ে ওঠে প্রেরণার হাতিয়ার। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ফের ঢাকায় ফিরে তিনি গান চর্চা শুরু করেন। বিদেশি ব্যান্ড এবং বিটলস, রোলিং স্টোনস শোনার প্রভাব তার নতুন ধারার গানকে সমৃদ্ধ করেছে।
আজম খানের জনপ্রিয় গানগুলোর মধ্যে রয়েছে- ‘রেললাইনের ওই বস্তিতে’, ‘হাইকোর্টের মাজারে’, ‘এত সুন্দর দুনিয়ায়’, ‘অভিমানী’, ‘অনামিকা’, ‘পাপড়ি’, ‘আলাল ও দুলাল’, ‘আসি আসি বলে তুমি আর এলে না’, ‘আমি যারে চাইরে’, ‘জ্বালা জ্বালা’, ‘ও চাঁদ সুন্দর’, ‘ও রে সালেকা ও রে মালেকা’, ‘জীবনে কিছু পাব না রে’, ‘বাধা দিয়ো না’ এবং আরও অনেক। প্রতিটি গানই আজম খানের সমাজচেতনাসম্পন্ন ভাবধারা, দেশপ্রেম ও তরুণদের প্রেরণা বহন করে।
২০১০ সালে ক্রান্তি শিল্পীগোষ্ঠীর পক্ষ থেকে জাতীয় প্রেসক্লাবে তার ৬০তম জন্মবার্ষিকী পালন করা হয়েছিল। আজ, জন্মদিনের এই দিনে, আমরা তাকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করি। তার সংগীত, সাহসিকতা, সরলতা এবং অবিচল ভালোবাসা বাংলা সংগীত ও তরুণ প্রজন্মের মনে চিরকাল বেঁচে থাকবে। বন্ধু আমার, তুমি যেখানেই থাকো-ভালো থেকো, শান্তিতে থেকো। ২০১১ সালের ৫ জুন শিল্পী আজম খান অনন্তের পথে পাড়ি জমান।