দীর্ঘ রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, বিতর্ক ও জল্পনার অবসান ঘটিয়ে বৃহস্পতিবার (১২ ফেব্রুয়ারি) সকাল সাড়ে ৭টা থেকে রাজধানীতে শুরু হয় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোটগ্রহণ। বিকাল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত টানা ভোট চলে। দিনভর রাজধানীর বিভিন্ন কেন্দ্রে ছিল উৎসবমুখর পরিবেশ, সতর্ক নিরাপত্তা, বিচ্ছিন্ন অভিযোগ-আর ভোটারদের প্রত্যাশা।
বড় ধরনের কোনো সহিংসতার খবর না থাকলেও একাধিক আসনে প্রার্থীর এজেন্টদের বের করে দেওয়া, জাল ভোটের অভিযোগ এবং বিএনপি–জামায়াত নেতাকর্মীদের বাকবিতণ্ডায় সাময়িক উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। তবুও সামগ্রিক চিত্র ছিল শান্তিপূর্ণ-যা নিয়ে দিন শেষে জনমনে ছিল স্বস্তির নিঃশ্বাস।
ঢাকা–৭: সকাল থেকেই সরব ভোটকেন্দ্র
রাজধানীর অন্যতম আলোচিত ঢাকা–৭ আসনে সকাল থেকেই ভোটারদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। ভোরে উপস্থিতি কিছুটা কম থাকলেও বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কেন্দ্রগুলোতে ভোটারের সারি দীর্ঘ হয়।
বিএনপি মনোনীত প্রার্থী হামিদুর রহমান হামিদ সকাল ৮টায় পাকিস্তান মাঠ আগাসাদেক রোড আইডিয়াল স্কুল কেন্দ্রে ভোট দেন। ভোট দিয়ে তিনি বলেন, আমি নির্বাচনে নিজের ইচ্ছায় আসিনি, জনগণ আমাকে দাঁড় করিয়েছে। পাশাপাশি জাতীয়তাবাদী দল বিএনপির বড় শক্তি অনুপ্রেরণায় আমাকে আরও রাজনীতির দিকে ধাবিত করে। তারেক রহমান আমার হাতে বিশ্বাস করে যে ধানের শীষ তুলে দিয়েছে, জনগণই আমাকে ধানের শীষে ভোট দিয়ে জয়ী করবেন ইনশাল্লাহ।
স্বতন্ত্র প্রার্থী ফুটবল প্রতীকের ইসহাক সরকার সকাল সোয়া ৮টায় বংশাল প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভোট দেন। তিনি বলেন, উৎসবমুখর পরিবেশে ভোটাররা ভোট দিচ্ছেন। আমি দীর্ঘদিন ধরে পুরান ঢাকার মানুষের জন্য নিজ উদ্যোগে বিভিন্ন সেবামূলক কাজ করেছি। আশাকরি ভোটাররা ফুটবল প্রতীকে আস্থা রাখবেন।
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর মনোনীত প্রার্থী হাফেজ হাজী এনায়েত উল্লাহ বিভিন্ন কেন্দ্র পরিদর্শন শেষে ভোটের পরিবেশ দেখে সন্তুষ্টি প্রকাশ করেন।
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের হাতপাখা প্রতীকের প্রার্থী আলহাজ্ব আব্দুর রহমান ক্যামব্রিজ স্কুল কেন্দ্র পরিদর্শন শেষে জানান, সকাল থেকে উৎসবমুখর পরিবেশে ভোট গ্রহণ চলছে। বড় ধরনের কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি।
আজিমপুর মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মোট ৩৬৭৫ জন পুরুষ ভোটার। সকাল সাড়ে ৯টা পর্যন্ত ভোট দিয়েছেন ৩৫৭ জন।
নতুন পল্টন লাইন স্কুল অ্যান্ড কলেজে ৩৭৪০ জন মহিলা ভোটার; সকাল সাড়ে ৯টা পর্যন্ত ভোট পড়ে ২২৬।
ওয়েস্ট এন্ড হাই স্কুলে ২৩৫৬ ভোটারের মধ্যে সকাল ৯টা ২০ মিনিট পর্যন্ত ভোট দেন ৫৯ জন।
রহমত উল্লাহ বয়েজ স্কুলে ২৩৩২ জন মহিলা ভোটারের মধ্যে সকাল ১০টা পর্যন্ত ভোট দেন ১৫৯ জন; একই প্রতিষ্ঠানের আরেক অংশে ২৬৬৯ নারী ভোটারের মধ্যে সকাল ৯টা ৩০ পর্যন্ত ভোট পড়ে ২২০।
লালবাগ জামিলা খাতুন সরকারি বালিকা বিদ্যালয়ে ৩২৪৮ জন পুরুষ ভোটারের মধ্যে সকাল ৯টা ৩০ পর্যন্ত ভোট দেন ৩৪১ জন; একই কেন্দ্রে ৩৮৮ জন মহিলা ভোটারের মধ্যে ২০৪ জন সকাল সাড়ে ৭টা থেকে ৯টা ৩০ পর্যন্ত ভোট দেন।
৭০ থেকে ৭৯ বছর বয়সী প্রবীণ ভোটাররা জানান, দীর্ঘদিন পর স্বতঃস্ফূর্তভাবে ভোট দিতে পেরে তারা আনন্দিত। প্রথমবার ভোট দিতে আসা ১৮ বছর বয়সী তানজিলা পারভিনের চোখে ছিল নতুন অভিজ্ঞতার উচ্ছ্বাস। ২৬ নম্বর ওয়ার্ডের মো. শাহ আলম বলেন, শান্তিপূর্ণ পরিবেশে ভোট দিতে পেরে ভালো লাগছে।
অন্যান্য আসনের চিত্র
ঢাকা–৮ আসনে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস শাহজাহানপুরে ভোট দেন। দুপুরে একটি কেন্দ্রে ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী নাসির উদ্দিন পাটোয়ারীর সঙ্গে ভোটারদের বাকবিতণ্ডায় সাময়িক উত্তেজনা সৃষ্টি হয়।
আরামবাগ হাইস্কুল কেন্দ্রে স্থানীয় কিছু লোক ঢুকে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করলে বিকালে ভোটার উপস্থিতি কমে যায় বলে অভিযোগ করেন প্রিজাইডিং অফিসার তুহিন আহম্মেদ।
ঢাকা–৯ এ বিএনপি প্রার্থী হাবিবুর রশিদ হাবিব মাদারটেকে ভোট দেন। স্বতন্ত্র প্রার্থী ডা. তাসলিম জারা অভিযোগ করেন, তার এজেন্টদের কেন্দ্র থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে।
ঢাকা–১০ আসনে ওয়াইডব্লিউসিএ কেন্দ্রে দুপুর ২টা পর্যন্ত ৩৫ শতাংশ ভোট পড়ে। ঢাকা কলেজ ও টিচার্স ট্রেনিং ইনস্টিটিউটে দুপুর পর্যন্ত ৩৭ শতাংশ ভোট গণনা হয়।
নিউমার্কেট থানা যুবদলের সদস্য সচিব কেএম চঞ্চল বলেন, দীর্ঘ ১৮ বছর পর মানুষ ভোট দিতে পেরে ঈদের চেয়েও বেশি আনন্দে মেতে উঠেছে।
ঢাকা–৪, ৫, ৬ ও ১২ আসনেও বিএনপি ও স্বতন্ত্র প্রার্থীরা সকালে নিজ নিজ কেন্দ্রে ভোট দেন। অধিকাংশ কেন্দ্রে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় ছিল।
ভোটারদের চোখে নির্বাচন
ফারহানা নামের এক নতুন ভোটার শিশুসন্তানকে নিয়ে কেন্দ্রে এসে বলেন, বিয়ের আগে ভোটার হলেও আগে রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে ভোট দিতে পারিনি। এবার প্রথম ভোট দিতে পেরে ভালো লাগছে।
দিনভর প্রবীণ, তরুণ ও প্রথমবারের ভোটার-সবাই মিলিয়ে কেন্দ্রগুলোতে তৈরি হয়েছিল উৎসবের আবহ। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ছিল সতর্ক অবস্থানে; প্রবেশপথে তল্লাশি ও পরিচয় যাচাইয়ের পর ভোটারদের প্রবেশ করতে দেখা যায়।
বহুল আলোচিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট–২০২৬ বড় ধরনের সহিংসতা ছাড়াই সম্পন্ন হয়েছে। বিচ্ছিন্ন উত্তেজনা ও অভিযোগ থাকলেও রাজধানীতে দিনটি কেটেছে শান্ত পরিবেশে। এখন সবার দৃষ্টি চূড়ান্ত ফলাফলের দিকে।
এ জাতীয় আরো খবর..