বর্তমান বিশ্বে সামরিক অস্থিতিশীলতা প্রশমনের জন্য যে কয়টি অতি গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক চুক্তি রয়েছে তার মধ্যে অন্যতম হলো নিউ স্টার্ট চুক্তি। নিউ স্টার্ট হলো বিশ্বের দুই বৃহত্তম পারমাণবিক শক্তিধর দেশ, যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার মধ্যে স্বাক্ষরিত সর্বশেষ কার্যকর পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ চুক্তি। এর পূর্ণরূপ হলো স্ট্রাটেজিক আর্মস রিডাকশন ট্রিটি। ৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, এই ঐতিহাসিক চুক্তির মেয়াদ আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ হলো।
ফলে কয়েক দশকের মধ্যে এই প্রথম বিশ্ব পারমাণবিক অস্ত্রের ওপর কোনো আইনি নিয়ন্ত্রণহীন এক অনিশ্চিত যুগে প্রবেশ করল। আনুষ্ঠানিকভাবে চুক্তিটি শেষ হওয়ার ফলে কয়েক দশকের মধ্যে এই প্রথম বিশ্বের দুই প্রধান পারমাণবিক শক্তিধর দেশ কোনো আইনি বাধ্যবাধকতা ছাড়াই তাদের পারমাণবিক অস্ত্রাগার সম্প্রসারণের সুযোগ পেল।
জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস এই মুহূর্তটিকে আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তার জন্য একটি ‘ভয়াবহ মুহূর্ত’ হিসেবে অভিহিত করে সতর্কবার্তা দিয়েছেন।
চুক্তির উত্থান-পতনকাল
যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার মধ্যে চুক্তিটিতে ২০১০ সালে চেক প্রজাতন্ত্রের রাজধানী প্রাগে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা এবং রুশ প্রেসিডেন্ট দিমিত্রি মেদভেদেভ স্বাক্ষর করেন।
এই চুক্তিটি ২০১১ সালে কার্যকর হয়েছিল। ২০২১ সালে জো বাইডেন প্রশাসন ১০ বছর মেয়াদি চুক্তিটির সময়কাল ৫ বছর বাড়িয়ে ২০২৬ সাল পর্যন্ত নির্ধারণ করে। তবে ২০২৩ সালে ইউক্রেন যুদ্ধের টানাপোড়েনে রাশিয়া এই চুক্তিতে তাদের অংশগ্রহণ ‘স্থগিত’ করে। যদিও মস্কো দাবি করে আসছে, তারা চুক্তির নির্ধারিত অস্ত্রসীমা লঙ্ঘন করেনি।
কী ছিল চুক্তিতে
নিউ স্টার্ট চুক্তির মাধ্যমে দুই দেশ তাদের কৌশলগত পারমাণবিক অস্ত্রের সংখ্যার ওপর একটি সীমা নির্ধারণ করেছিল। চুক্তিতে মোতায়েন করা পারমাণবিক ওয়ারহেডের সংখ্যা এক হাজার ৫৫০-এর মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে বলা হয়। মোতায়েন করা আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, সাবমেরিন থেকে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র এবং ভারী বোমারু বিমানের সংখ্যা ৭০০-এর মধ্যে রাখতে বলা হয়। এ ছাড়া মোতায়েন ও অ-মোতায়েন মিলিয়ে মোট লঞ্চারের সংখ্যা ৮০০-এর বেশি না হওয়ার কথাও উল্লেখ ছিল।
যদিও এ চুক্তির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকটি কেবল সংখ্যার সীমাবদ্ধতা ছিল না, বরং স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা ছিল।
এর মাধ্যমে দুটি দেশ একে অপরের ওপর নজরদারি করতে পারত। চুক্তি অনুযায়ী, বছরে ১৮ বার এক দেশের পরিদর্শক দল অন্য দেশের পারমাণবিক ঘাঁটিগুলো সরজমিনে দেখার সুযোগ পেত। প্রতি ৬ মাস পর পর দুই দেশ তাদের ক্ষেপণাস্ত্র এবং ওয়ারহেডের সঠিক অবস্থান ও সংখ্যা একে অপরকে জানাত। এ ছাড়া ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষার সময় সংগ্রহ করা তথ্য একে অপরের সঙ্গে আদান-প্রদান করা হতো।
বিশ্বের জন্য গুরুত্বপূর্ণ কেন
পারমাণবিক ওয়ারহেডের সংখ্যার দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়া বিশ্বের সবচেয়ে বড় দুই পারমাণবিক শক্তি। বিশ্বে বিদ্যমান মোট পারমাণবিক ওয়ারহেডের প্রায় ৯০ শতাংশই এই দুই দেশের দখলে রয়েছে।
সেন্টার ফর আর্মস কন্ট্রোল অ্যান্ড নন-প্রোলিফারেশন (সিএসিএনপি)-এর হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে মস্কোর কাছে মোট ৫ হাজার ৪৫৯টি পারমাণবিক ওয়ারহেড রয়েছে, যার মধ্যে প্রায় ১ হাজার ৬০০টি সক্রিয়ভাবে মোতায়েন করা আছে।
অন্যদিকে সিএসিএনপি বলছে, যুক্তরাষ্ট্রের কাছে প্রায় ৫ হাজার ৫৫০টি পারমাণবিক ওয়ারহেড রয়েছে, যার মধ্যে আনুমানিক ৩ হাজার ৮০০টি সক্রিয়। শীতল যুদ্ধকালীন সময়ে, ১৯৬০-এর দশকের মাঝামাঝি যুক্তরাষ্ট্রের পারমাণবিক অস্ত্রভান্ডার সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছিল। সে সময় দেশটির হাতে সক্রিয় ও নিষ্ক্রিয় মিলিয়ে ৩১ হাজারের বেশি পারমাণবিক ওয়ারহেড ছিল।
কার্যত এ চুক্তি এ দুই শক্তিধর রাষ্ট্রকে নিয়ন্ত্রণে রেখেছে।
বর্তমান পরিস্থিতি
চুক্তির মেয়াদকাল অনুসারে, আজ ৫ ফেব্রুয়ারি এ চুক্তির শেষ দিন। অর্থাৎ আজ থেকে এ চুক্তি মেনে চলার বাধ্যবাধকতা নেই দুই দেশের। এর আগে ২০২৩ সালে ইউক্রেন যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে রাশিয়া এই চুক্তিতে তাদের অংশগ্রহণ স্থগিত করে। তবে তারা জানিয়েছিল, ২০২৬ সাল পর্যন্ত তারা অস্ত্রের নির্ধারিত সীমা মেনে চলবে। যদিও চুক্তির একটি বড় অংশ ছিল একে অপরের পারমাণবিক ঘাঁটি পরিদর্শন করা, যা কোভিড-১৯ এবং পরবর্তী রাজনৈতিক উত্তেজনার কারণে গত কয়েক বছর ধরেই বন্ধ ছিল।
গত ২৯ জানুয়ারি ক্রেমলিন জানিয়েছিল, দুই দেশের মধ্যে অবশিষ্ট শেষ পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ চুক্তির বিধান এক বছরের জন্য অনানুষ্ঠানিকভাবে সম্প্রসারণের বিষয়ে প্রস্তাব দিয়েছেন রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন এবং রাশিয়া মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রতিক্রিয়ার অপেক্ষায় আছে।
তবে ট্রাম্পের প্রশাসন এই চুক্তির মেয়াদ বাড়াতে এখনো পর্যন্ত কোনো আগ্রহ দেখায়নি। ওয়াশিংটনের প্রধান যুক্তি ছিল, চীনের ক্রমবর্ধমান পারমাণবিক সক্ষমতাকে অন্তর্ভুক্ত না করে কেবল রাশিয়ার সঙ্গে এই চুক্তি বজায় রাখা মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।
ভবিষ্যৎ কী
চুক্তির মেয়াদ শেষ হলে যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়া—এই দুই দেশের জন্য মোতায়েনযোগ্য কৌশলগত পারমাণবিক ওয়ারহেডের সংখ্যার ওপর যে আইনি সীমা ছিল, তা বিলুপ্ত হয়ে যাবে।
আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা কর্মসূচির গবেষণা সহযোগী জর্জিয়া কোল জানুয়ারির শেষ দিকে লেখেন, ‘এটি পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা দ্বিপক্ষীয় পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার সঙ্গে একটি বড় ধরনের বিচ্ছেদের সূচনা হবে। একই সঙ্গে এটি পারমাণবিক সংযম থেকে সরে আসার ইঙ্গিত দেবে, যা বিশ্বকে আরো বিপজ্জনক করে তুলবে। নিউ স্টার্ট চুক্তির সীমা না থাকলে উভয় পক্ষের কৌশলগত পরিকল্পনা অনিশ্চয়তা ও সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতির আশঙ্কার ওপর বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়বে। এর ফলে নতুন একটি অস্ত্র প্রতিযোগিতার ঝুঁকি বাড়বে।’
আর্মস কন্ট্রোল অ্যাসোসিয়েশনের নির্বাহী পরিচালক ড্যারিল কিমবল পলিটিকোকে বলেন, ‘ট্রাম্প ও পুতিন যদি শিগগিরই কোনো ধরনের সমঝোতায় পৌঁছতে না পারেন, তাহলে রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র তাদের ক্ষেপণাস্ত্রে আরো বেশি ওয়ারহেড সংযোজন শুরু করবে—এটা অসম্ভব নয়।’
যুক্তরাষ্ট্রের একটি রাজনৈতিক সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, নিউ স্টার্ট চুক্তি ছাড়া ভবিষ্যতের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা দপ্তর ইতোমধ্যে প্রস্তুতি নেওয়া শুরু করেছে। এ বিষয়ে অবগত তিনজন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সূত্রের বরাতে প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়। তবে এসব আলোচনা বা পরিকল্পনার সুনির্দিষ্ট বিষয়বস্তু কী, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
রুশ উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই রিয়াবকভ হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, ‘নিয়ন্ত্রণহীন পারমাণবিক অস্ত্রের এক নতুন বিশ্বের জন্য রাশিয়া প্রস্তুত।’ অন্যদিকে, ডোনাল্ড ট্রাম্প একটি ‘বৃহত্তর এবং আরো উন্নত’ চুক্তির কথা বললেও চীন এখনও কোনো ত্রিপক্ষীয় আলোচনায় যোগ দিতে রাজি হয়নি।
এ জাতীয় আরো খবর..