যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান আজ শুক্রবার ওমানে বৈঠকে বসতে রাজি হয়েছে। উভয়পক্ষের কর্মকর্তারা বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তবে আলোচনার এজেন্ডা নিয়ে দুই দেশ এখনো অনড় অবস্থানে রয়েছে। ওয়াশিংটন চায়, আলোচনায় তেহরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি অন্তর্ভুক্ত থাকুক। অন্যদিকে ইরান বলছে, তারা শুধু পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে কথা বলবে।
আলোচনায় কী কী নিয়ে কথা হবে সেটির একটি কাঠামো তৈরি করেছে মধ্যস্থতাকারী দেশ তুরস্ক, মিশর ও কাতার। গতকাল বৃহস্পতিবার এ নিয়ে এক্সক্লুসিভ খবর প্রকাশ করে সংবাদমাধ্যম আলজাজিরা। সংবাদমাধ্যমটিকে দুটি সূত্র জানিয়েছে, এই কাঠামোর আলোকে ইরানকে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বহুলাংশে হ্রাস করতে হবে। এ ছাড়া ইরানের ব্যালিস্টিক মিসাইল ব্যবহারের ক্ষেত্রেও বিধিনিষেধ থাকবে। সঙ্গে হিজবুল্লাহ ও হুতির মতো যেসব সশস্ত্র বাহিনী আছে, তাদের সহায়তা বন্ধ করে দিতে হবে।
প্রস্তাবিত চুক্তির কাঠামোতে কী আছে: প্রস্তাবিত চুক্তির কাঠামোতে বলা হয়েছে—ইরান আগামী তিন বছর একটুও ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করতে পারবে না। এ সময় শেষ হওয়ার পর তাদের ১ দশমিক ৫ শতাংশ হারে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণে অনুমতি দেওয়া হবে। বর্তমানে ইরানের কাছে উচ্চ সমৃদ্ধকৃত যেসব ইউরেনিয়াম— যার মধ্যে রয়েছে ৬০ শতাংশ সমৃদ্ধকৃত ৪৪০ কেজি ইউরেনিয়াম—তৃতীয় কোনো দেশে স্থানান্তর করতে হবে।
এ ছাড়া ইরান হিজবুল্লাহ বা হুতির মতো বাহিনীর কাছে কোনো অস্ত্র ও প্রযুক্তি পাঠাতে পারবে না। এগুলোর পাশাপাশি ইরানকে কথা দিতে হবে, ইরান তাদের ব্যালিস্টিক মিসাইল ব্যবহার করবে না। তবে যুক্তরাষ্ট্র দাবি করছে, ইরানকে মিসাইল উৎপাদন সীমিত এবং এগুলোর আঘাত হানার সীমা কমাতে হবে। একটি সূত্র জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে ‘আগ্রাসনবিরোধী চুক্তি’ নিয়েও প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
প্রাথমিকভাবে তুরস্কের ইস্তাম্বুলে বসার কথা থাকলেও উভয় পক্ষ এখন ওমানের মাসকাটে আলোচনা করতে সম্মত হয়েছে। তবে এজেন্ডার বিষয়ে কোনো সমঝোতায় পৌঁছানোর লক্ষণ দেখা যায়নি।
মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সেনা উপস্থিতি বাড়ানো এবং একটি বৃহত্তর যুদ্ধ এড়াতে আঞ্চলিক দেশগুলোর প্রচেষ্টার মধ্যেই এই স্পর্শকাতর কূটনৈতিক উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সাম্প্রতিক দিনগুলোয় আলোচনার পরিধি ও স্থান নিয়ে মতভেদের কারণে বৈঠকটি হওয়া নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছিল। এতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানকে যে হামলার হুমকি দিয়েছিলেন, তা কার্যকর করার পথও খোলা ছিল।
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির চিন্তিত হওয়া উচিত কি না, গত বুধবার এমন এক প্রশ্নের জবাবে এনবিসি নিউজকে ট্রাম্প বলেন, ‘আমি বলব, তার খুব চিন্তিত হওয়া উচিত। হ্যাঁ, অবশ্যই।’ তিনি আরও বলেন, ‘তারা আমাদের সঙ্গে আলোচনা করছেন।’ তবে এ বিষয়ে বিস্তারিত কিছু বলেননি ট্রাম্প।
ইরান চায়, আলোচনা শুধু পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে তাদের দীর্ঘদিনের পারমাণবিক বিরোধের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকুক। তবে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বুধবার ভিন্নমত পোষণ করেন। সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ‘ইরানিরা চাইলে আমরা প্রস্তুত।’ তবে তিনি বলেন, পারমাণবিক বিষয়ের পাশাপাশি ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, মধ্যপ্রাচ্যে সশস্ত্র প্রক্সি গ্রুপগুলোকে সমর্থন দেওয়া ও দেশটির জনগণের সঙ্গে আচরণের বিষয়গুলোও আলোচনায় থাকতে হবে।
কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বৈঠকে ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার, মার্কিন বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ ও ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি অংশ নেবেন।
এদিকে ইরানের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা স্পষ্ট জানিয়েছেন, ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি নিয়ে আলোচনার কোনো সুযোগ নেই। অন্য এক কর্মকর্তা বলেন, পারমাণবিক বিরোধ নিয়ে আলোচনাকে তেহরান স্বাগত জানায়, কিন্তু এর বাইরের বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত করার মার্কিন জেদ এ আলোচনাকে ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে।
একদিকে বৈঠকের আয়োজন চলছে, অন্যদিকে কিন্তু সংঘাতে প্রস্তুতি থামেনি। মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে সামরিক শক্তি বাড়িয়ে চলেছে যুক্তরাষ্ট্র। এর মধ্যে মাটির নিচে থাকা নিজেদের নতুন আরেকটি মিসাইল ঘাঁটি উন্মোচন করেছে ইরান। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান উত্তেজনার মধ্যে দেশটির চৌকস ইসলামিক বিপ্লবী গার্ড বুধবার এ ঘাঁটির তথ্য সামনে নিয়ে আসে।
ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান আব্দুল রহমান মৌসাভি এবং বিপ্লবী গার্ডের অ্যারোস্পেস বিভাগের প্রধান সায়েদ মাজেদ মৌসাভি ওই ঘাঁটিতে যান। তখন এটি উন্মোচন করা হয়। সামরিক বাহিনীর উচ্চপদস্থ এ দুই কর্মকর্তা বিপ্লবী গার্ডের মিসাইল সক্ষমতা এবং প্রস্তুতি বিষয়ে খোঁজখবর নেন। তাদের পাশাপাশি অন্য কমান্ডারদের এ ব্যাপারে অবহিত করা হয়।
সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান বলেন, ‘শত্রুদের যে কোনো কিছুর জন্য আমরা প্রস্তুত। গত বছরের জুনে ইসরায়েলের সঙ্গে ১২ দিনের যুদ্ধ শেষে আমরা আমাদের রণকৌশল পরিবর্তন করেছি। আমরা এখন প্রতিরক্ষামূলক থেকে আক্রমণাত্মক অবস্থান নিয়েছি। যার ভিত্তিতে দ্রুততম সময়ে এবং বৃহৎ পরিসরে অভিযান পরিচালনার পদ্ধতি অনুসরণ করছি। একই সঙ্গে অসম যুদ্ধ এবং প্রতিপক্ষের সামরিক কৌশলকে চূর্ণ করার কৌশল অবলম্বন করছি আমরা।’
কয়েকদিন ধরে ইরানের শঙ্কা হচ্ছে, যদি আলোচনায় কোনো সমাধান না আসে, তাহলে ইরানে হামলা চালাতে পারে মার্কিন বাহিনী। তবে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি বলেছেন, এবার যদি যুক্তরাষ্ট্র হামলা চালায় তাহলে এটির প্রভাবে আঞ্চলিক যুদ্ধ শুরু হবে।
এ জাতীয় আরো খবর..