বাঁশের তৈরি জরাজীর্ণ হেলে পড়া ঝুপড়ি ঘর। তার মধ্যে গা ধাক্কাধাক্কি করে পাঠদান। শীত-গ্রীষ্মে ধুলাবালি আর বর্ষায় বৃষ্টির পানিতে প্রতিদিন ভিজে নষ্ট হয় বই-খাতা ও পোশাক। নেই স্বাস্থ্যসম্মত শৌচাগারও। ভাঙা ও নষ্ট বাঁশের বেড়ার ঘরটিতে মাত্র দুইটি কক্ষ। এর একটি কক্ষে একসঙ্গে চলে পাঁচটি শ্রেণির ক্লাস।
এভাবে ৯ বছর ধরে শিক্ষা কার্যক্রম চলছে বান্দরবানের থানচি উপজেলার সদর ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ডের দুর্গম পাহাড়ি এলাকার টুকটংপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে।
বিদ্যালয়টিতে বর্তমানে রয়েছেন পাঁচজন শিক্ষক। আর চরম ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে লেখাপড়া করছে ৬৪ জন শিক্ষার্থী। বৃষ্টি এলেই শ্রেণিকক্ষ কাদাপানিতে ভরে যায়। বর্ষা মৌসুমে শিক্ষকদের হাজিরা খাতা ও রেজিস্ট্রারসহ শিক্ষার্থীদের বই-খাতা ভিজে নষ্ট হওয়ার ঘটনা এখানে নিত্যদিনের বলে জানান শিক্ষক ও অভিভাবকরা।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ২০২২ সালে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)-এর অর্থায়নে প্রায় এক কোটি ২১ লাখ টাকা ব্যয়ে বিদ্যালয়ের জন্য একটি তিনতলা ভবন নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এতে আসবাবপত্র ও স্বাস্থ্যসম্মত শৌচাগারও অন্তর্ভুক্ত ছিল। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ পায় বান্দরবানের মিল্টন ট্রেডার্স।
কিন্তু কাজের ধীরগতি ও বারবার সময় বাড়ানোর আবেদনের কারণে চার বছর পেরিয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত ভবনটি ব্যবহারের উপযোগী হয়নি। ফলে শিক্ষার পরিবেশ উন্নয়নের বদলে শিক্ষার্থীদের দুর্ভোগ চরম আকার ধারণ করেছে।
সম্প্রতি সরেজমিন বিদ্যালয়টিতে দেখা যায়, নতুন নির্মীয়মাণ ভবনে মাত্র চারজন শ্রমিক টুকটাক কাজ করছেন। পাশে ঝুঁপড়ি ঘরের একটি কক্ষে পাশাপাশি চলছে পাঁচটি শ্রেণির কার্যক্রম। নির্মীয়মাণ ভবনে নির্মাণ মিস্ত্রি জুয়েল বলেন, জানালা-দরজা ঠিক হয়নি, সিঁড়ির রেলিং লাগানো বাকি, আসবাবপত্রও আসেনি। এখনো অনেক কাজ বাকি। আরো প্রায় এক বছর লাগতে পারে।
এ সময় শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা জানান, এক শ্রেণির পাঠদানের শব্দে অন্য শ্রেণির পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে। রয়েছে নিরাপত্তাহীনতাও।
বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষিকা গুংগাবি ত্রিপুরা বলেন, ২০০৮ সালে গ্রামবাসীর উদ্যোগে বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠিত হয়। ২০১৭ সালে জাতীয়করণ হলেও কোনো সংস্কার হয়নি। বর্তমানে এ পরিবেশে পড়াশোনা করানো সত্যিই কষ্টকর। শিশুদের স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা মারাত্মক ঝুঁকিতে রয়েছে।
কথা হয় তৃতীয়, চতুর্থ ও পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী ও মেনসায় ম্রো, মেনয়াং ম্রো, মানরাও ম্রো ও এনয়া ম্রোর সঙ্গে। তারা জানায়, বাতাস এলে চোখে ধুলা যায়। পাশে অন্য ক্লাসের শিক্ষকরা শব্দ করে পড়ালে অন্য শ্রেণির পাঠদান। ব্যাহত হয়। শীতে ঠাণ্ডা বাতাস ঢোকে। বর্ষায় আরো ভোগান্তি বাড়ে। পর্যাপ্ত আলোর অভাবে চোখে ঠিকমতো দেখা যায় না। বিদ্যালয়ে শৌচাগারও নেই। ফলে শৌচাগারে যাওয়ার দরকার হলে বিপদে পড়তে হয় তাদের।
টুকটংপাড়া কারবারা (পাড়ার প্রধান) মাংসান ম্রো (৬৪) অভিযোগ করেন, সরকার টাকা দিয়েছে, তবু চার বছরেও নতুন ভবন নির্মাণের কাজ শেষ হয়নি। নিম্নমানের ইট, বালু, রড আর লোকাল পাথরের কংক্রিট ব্যবহার করা হয়েছে। ঢালাইয়ের সময় সাইট ইঞ্জিনিয়ার থাকেন না। তবু কিছু বলিনি, যেভাবেই হোক ভবনের কাজ শেষ হোক, এই আশায়।
অভিভাবক ও সাবেক ইউপি সদস্য টিমপাও ম্রো বলেন, কোটি টাকা খরচের কথা শুনি, কিন্তু আমাদের বাচ্চারা আজও ঝুপড়ি ঘরে পড়ে। ধুলা আর শব্দে কিছুই বুঝতে পারে না। এভাবে চললে ওদের ভবিষ্যৎ অন্ধকার।
ইয়ং ম্রো নামের এক অভিভাবক বলেন, বৃষ্টি হলে বই-খাতা ভিজে যায়, ভারি বৃষ্টিতে ক্লাসই হয় না। দ্রুত নতুন ভবনে ক্লাস চাই।
ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান মিল্টন ট্রেডার্স-এর ব্যবস্থাপক মো. খোকন আহম্মেদ বলেন, নির্মাণ সামগ্রীর দাম ও শ্রমিক মজুরি বেড়ে যাওয়ায় ধীরে কাজ চলছে। আগামী জুন ২০২৬ সালের মধ্যে যেভাবেই হোক কাজ শেষ করে হস্তান্তর করব।
থানচি উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) সোনা মৈত্র চাকমা বলেন, বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে একাধিকবার জানানো হয়েছে। দ্রুত কাজ শেষ করতে তাগিদ দেওয়া হয়েছে।
এলজিইডির থানচি উপজেলা প্রকৌশলী মো. আবদুর হানিফ বলেন, নির্ধারিত সময় অনেক আগেই শেষ। ঠিকাদারকে বারবার বলা হলেও সে কথা শুনছে না।
এ জাতীয় আরো খবর..