ইসলামের ইতিহাসে জ্ঞান ও প্রজ্ঞার ক্ষেত্রে উম্মুল মুমিনিন হজরত আয়েশা (রা.) এক অনন্য ব্যক্তিত্ব। তিনি কেবল নবী কারিম (স.)-এর প্রিয়তমা স্ত্রীই ছিলেন না, বরং মুসলিম উম্মাহর কাছে ইসলামের বিশুদ্ধ জ্ঞান ও শরিয়তের বিধি-বিধান পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে তাঁর অবদান অপরিসীম। প্রাজ্ঞ আলেমদের মতে, শরিয়তের বিধি-বিধানের একটি বিশাল অংশই তাঁর বর্ণনার মাধ্যমে সংরক্ষিত ও উম্মাহর কাছে পৌঁছেছে।
জন্ম ও পরিচয়
হজরত আয়েশা (রা.) নবুয়তের চতুর্থ বা পঞ্চম বর্ষে মক্কায় জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা ইসলামের প্রথম খলিফা এবং রাসুল (স.)-এর হিজরতের সাথী হজরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.)। তাঁর মূল নাম আয়েশা, উপাধি ‘সিদ্দিকা’ ও ‘হুমায়রা’। অত্যধিক সুন্দরী ও ফর্সা হওয়ায় রাসুল (স.) তাকে ভালোবেসে ‘হুমায়রা’ বলে ডাকতেন। যদিও তিনি নিঃসন্তান ছিলেন, তবে রাসুল (স.)-এর পরামর্শে তিনি তাঁর ভাগ্নে আবদুল্লাহ বিন জুবাইর (রা.)-এর নামানুসারে ‘উম্মে আবদুল্লাহ’ উপনাম (কুনিয়াত) গ্রহণ করেন (সুনানে আবু দাউদ: ৪৯৭০)
রাসুল (স.)-এর প্রিয়তমা ও স্বপ্নের মহীয়সী
হজরত আয়েশা (রা.) ছিলেন রাসুল (স.)-এর একমাত্র কুমারী স্ত্রী। হিজরতের প্রায় ১০ মাস আগে তাঁদের বিয়ে হয় এবং দ্বিতীয় হিজরির শাওয়াল মাসে বাসর হয়। তাঁর শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ স্বয়ং আল্লাহ তাআলা জিবরাঈল (আ.)-এর মাধ্যমে দিয়েছিলেন।
রাসুল (স.) আয়েশা (রা.)-কে বলেন, ‘দুবার তোমাকে আমায় স্বপ্নে দেখানো হয়েছে। আমি দেখলাম, তুমি একটি রেশমি কাপড়ে আবৃতা এবং আমাকে বলা হচ্ছে ইনি আপনার স্ত্রী, আমি ঘোমটা সরিয়ে দেখলাম, সে মহিলা তুমিই। তখন আমি ভাবছিলাম, যদি তা আল্লাহর পক্ষ হতে হয়ে থাকে, তবে তিনি তা বাস্তবায়িত করবেন। (সহিহ বুখারি: ৩৮৯৫)
একবার আমর বিন আস (রা.) রাসুল (স.)-কে জিজ্ঞেস করেন, আপনার কাছে প্রিয়তম ব্যক্তি কে? তিনি উত্তরে বলেন, ‘আয়েশা’। (সহিহ বুখারি: ৩৬৬২)
জ্ঞানসাধনায় অনন্য উচ্চতা
হজরত আয়েশা (রা.) নারী সাহাবিদের মধ্যে সর্বাধিক জ্ঞানের অধিকারী ছিলেন। মুসতাদরাকে হাকেম-এর বর্ণনা অনুযায়ী, শরীয়তের এক-চতুর্থাংশ বিধি-বিধান তাঁর বর্ণনা থেকে এসেছে।
সাহাবিদের শিক্ষক: আবু মুসা আশআরি (রা.) বলেন, ‘আমরা রাসুলের সাহাবিরা কোনো হাদিস নিয়ে সমস্যায় পড়লে আয়েশা (রা.)-এর কাছে যেতাম এবং তাঁর কাছ থেকে নতুন জ্ঞান লাভ করতাম।’
বহুমুখী পাণ্ডিত্য: প্রখ্যাত তাবিঈ আতা বিন রাবাহ (রহ.) বলেন, ‘আয়েশা (রা.) ছিলেন মানুষের মধ্যে সবচেয়ে বেশি জ্ঞান, বিচক্ষণতা এবং সুন্দর মতামতের অধিকারী।’ ফিকহ ও হাদিসের পাশাপাশি চিকিৎসা শাস্ত্র, আরবের ইতিহাস এবং কবিতাতেও তাঁর অগাধ পাণ্ডিত্য ছিল।
৯টি অনন্য বৈশিষ্ট্য: যা অন্য কাউকে দেওয়া হয়নি
আল্লামা জাহাবি (রহ.) বর্ণনা করেন, হজরত আয়েশা (রা.) তাঁর নিজের ৯টি বিশেষ বৈশিষ্ট্যের কথা উল্লেখ করেছেন, যা মারইয়াম বিনতে ইমরান ছাড়া আর কোনো নারী পাননি-
১. জিবরাঈল (আ.) রেশমি কাপড়ে তাঁর প্রতিচ্ছবি নিয়ে রাসুল (স.)-এর কাছে এসেছিলেন।
২. রাসুল (স.) এর স্ত্রীগণের মধ্যেই একমাত্র তিনিই ছিলেন কুমারী।
৩. মৃত্যুকালে রাসুল (স.)-এর মাথা তাঁর ঊরুর ওপর ছিল।
৪. তাঁর কক্ষেই রাসুল (স.)-কে দাফন করা হয়।
৫. ফেরেশতারা তাঁর ঘর বেষ্টন করে রাখতেন।
৬. রাসুলের সাথে একই কম্বলের নিচে থাকা অবস্থায় ওহি অবতীর্ণ হতো।
৭. তিনি প্রথম খলিফার কন্যা।
৮. আসমান থেকে (সুরা নূরে) তাঁর পবিত্রতার ঘোষণা এসেছে।
৯. তাঁকে ক্ষমা ও সম্মানজনক রিজিকের আশ্বাস দেওয়া হয়েছে।
শ্রেষ্ঠত্বের ঘোষণা
রাসুল (স.) আয়েশা (রা.)-এর মর্যাদা বোঝাতে গিয়ে বলেছেন, ‘সব খাবারের মধ্যে সারিদ (আরবদের প্রিয় খাবার) যেমন শ্রেষ্ঠ, তেমনি সব নারীদের মধ্যে আয়েশা শ্রেষ্ঠ মর্যাদার অধিকারী।’ (সহিহ বুখারি: ৩৪১১)
মহাপ্রয়াণ
ইলমে দ্বীনের এই প্রদীপ্ত চেরাগ ৫৮ হিজরির ১৭ রমজান রাতে মদিনায় ইন্তেকাল করেন। তাঁর অসিয়ত অনুযায়ী রাতে জান্নাতুল বাকিতে তাঁকে দাফন করা হয়। প্রখ্যাত সাহাবি হজরত আবু হুরায়রা (রা.) তাঁর জানাজার নামাজ পড়ান।
হজরত আয়েশা (রা.) প্রমাণ করে গেছেন যে, জ্ঞান ও প্রজ্ঞার লড়াইয়ে লিঙ্গভেদ কোনো বাধা নয়। বর্তমান সময়ে নারী শিক্ষার গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা নিয়ে যখন বিশ্বজুড়ে আলোচনা হয়, তখন হজরত আয়েশা (রা.)-এর পাণ্ডিত্যপূর্ণ জীবনই প্রমাণ করে যে ইসলাম আজ থেকে চৌদ্দশ বছর আগেই নারীকে জ্ঞানের সর্বোচ্চ শিখরে আরোহণের অধিকার দিয়েছে। আধুনিক বিশ্বের জ্ঞানপিপাসু ও প্রগতিশীল মুসলিম নারীদের জন্য তিনি এক অবিনশ্বর আলোকবর্তিকা এবং বুদ্ধিবৃত্তিক নেতৃত্বের শ্রেষ্ঠ রোল মডেল।
এ জাতীয় আরো খবর..