ব্রাজিলে জন্ম আর ফুটবল নিয়ে কারিকুরি করবে না এমন শিশু পাওয়া দুস্কর। পালমেইরাসের পরিচ্ছন্নতা কর্মী ডগলাস সুসার চোখ একদিন আটকে গেল তিন বছর বয়সী এক ছেলের বাইসাইকেল কিকে। ছেলেটি আর কেউ নয় নিজ পুত্র এনদ্রিক ফেলিপে।
ছেলের ফুটবল নিয়ে করা কারিকুরি উদ্দেশ্যহীনভাবে সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশ করতে থাকেন বাবা ডগলাস।
এতেই কপাল খুলে যায় এনদ্রিকের। ব্রাজিলের শীর্ষ ফুটবল প্রতিযোগিতা ব্রাজিলেইরাওয়ের ক্লাব পালমেইরাসের নজরে আসেন এনদ্রিক। মাত্র ১১ বছর বয়সে পালমেইরাসের বয়সভিত্তিক দলে খেলা শুরু করেন তিনি।
এরপর থেকেই ব্রাজিলিয়ান ফুটবলের ‘বিস্ময় বালক’ খ্যাতি পান এনদ্রিক।
যোগ দেওয়ার মাত্র ৫ বছরের মধ্যে দেড় শতাধিক গোল করে জায়গা করে নেন মূল দলে। মূল দলে এসেই ভেঙে দেন পালমেইরাসের ১০৬ বছরের রেকর্ড। এর আগে ক্লাবটির হয়ে ১৯১৬ সালে ১৬ বছর ১১ মাস ১৪ দিন বয়সে গোল করেছিলেন হেইটর। ২০২২ সালে প্যারানায়েন্সের বিপক্ষে মাত্র ১৬ বছর ৩ মাস ৭ দিনের মাথায় গোল করে ইতিহাস গড়েন তিনি।
এমন তরুণ প্রতিভার দাম ক্লাব থেকে ধরে দেওয়া হয়েছিল ৪০ মিলিয়ন ইউরো। পিএসজি কিছুটা চেষ্টা করলেও ৬৩.৬ মিলিয়নে তাকে দলে ভেড়ায় ইউরোপের সফলতম ক্লাব রিয়াল মাদ্রিদ। তবে চুক্তি অনুযায়ী ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার পর যোগ দেন রিয়ালে।
স্প্যানিশ জায়ান্টদের স্কোয়াডে যোগ দেওয়ার আগে অভিষেক হয় ব্রাজিল জাতীয় দলের হয়েও। ১৯৯৪ সালে রোনালদোর পর সর্বকনিষ্ঠ খেলোয়াড় হিসেবে ব্রাজিল জাতীয় দলে অভিষেক হয় এনদ্রিকের।
একজন ব্রাজিলিয়ান ফরোয়ার্ডের জন্য এরচেয়ে ভালো শুরু আর কি হতে পারে!
রিয়াল মাদ্রিদ অধ্যায় : সম্ভাবনার চাপে বাস্তবতা
পালমেইরাস থেকে রিয়াল মাদ্রিদে পা রাখার সময় এনদ্রিককে ঘিরে তুলনা হচ্ছিল রোনালদো-পেলেদের সঙ্গে। বয়স কম, কিন্তু প্রত্যাশা ছিল বিশাল। রিয়ালে তার শুরুটা মন্দ ছিল না—সংক্ষিপ্ত সময়ে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ গোল ও অ্যাসিস্ট করলেও, ভিনিসিয়ুস জুনিয়র, রদ্রিগো, বেলিংহ্যামের মতো তারকাদের ভিড়ে একাদশে স্থায়ী জায়গা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ে। আর ফরাসি তারকা এমবাপ্পে তো রিয়ালের প্রধান সেনাপতি।
নিজেকে আগেই প্রমাণ করা এনদ্রিকের তাই জায়গা হয় মাদ্রিদের বেঞ্চে। আর এতে সম্ভাবনার সঙ্গে চাপা পড়তে থাকে ব্রাজিলের হয়ে এই তারকার বিশ্বকাপ খেলার স্বপ্ন।
নিজেকে হারিয়ে খুঁজার মধ্যে লিওঁতে ধারে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। ক্লাবের কোচিং স্টাফদের পরামর্শও ছিল উন্নতির জন্য নিয়মিত খেলার কোন বিকল্প নেই।
লিওঁতে রাজাসুলভ প্রত্যাবর্তন
ফরাসি লিগ আঁতে যোগ দিয়েই এনদ্রিক যেন নতুন জীবন পেয়েছেন। আক্রমণের কেন্দ্রে তাকে ঘিরেই গড়ে উঠছে দলের পরিকল্পনা। দ্রুতগতির ড্রিবল, বক্সের ভেতরে নিখুঁত ফিনিশিং আর চাপের মুখে শান্ত থাকার ক্ষমতা—সব মিলিয়ে তিনি হয়ে উঠেছেন অলিম্পিক লিওঁর আক্রমণের মূল ভরসা।
ফরাসি ক্লাবটির হয়ে ৫ ম্যাচে এক হ্যাটট্রিকসহ ৫ গোল ও ম্যাচ-নির্ধারক পারফরম্যান্স তাকে সমর্থকদের প্রিয়পাত্রে পরিণত করেছে। ফরাসি সংবাদমাধ্যমে তাকে ইতিমধ্যে বলা হচ্ছে ‘লিওঁর নতুন রাজা’। এই আত্মবিশ্বাসই হয়তো ছিল তার সবচেয়ে বড় প্রয়োজন।
এদিকে রিয়াল হয়তো এখন এনদ্রিকের ফেরার পথে চেয়ে আছে। কারণ ধারের চুক্তিতে এই খেলোয়াড়কে কেনার কোন সুযোগ নেই লিওঁর।
এনদ্রিকের বিশ্বকাপের স্বপ্ন বাস্তবের পথে
লিওঁতে ধারাবাহিক পারফরম্যান্সের প্রভাব পড়ছে ব্রাজিল জাতীয় দলেও। কোচিং স্টাফের নজরে আবারও শক্তভাবে জায়গা করে নিচ্ছেন এনদ্রিক। ব্রাজিলের আক্রমণভাগে যেখানে প্রতিভার অভাব নেই, সেখানে ফর্মই হয়ে উঠছে কোচ আনচেলত্তির কাছে সবচেয়ে বড় মানদণ্ড।
যদি এই ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে পারেন, তবে আসন্ন বিশ্বকাপে ব্রাজিলের স্কোয়াডে এনদ্রিকের থাকা এখন আর কল্পনা নয়, বরং বাস্তব সম্ভাবনা।
এ জাতীয় আরো খবর..