জীবনে চলার পথে বহু মানুষের সঙ্গে আমাদের পরিচয় হয়, তৈরি হয় গভীর সম্পর্ক। কিন্তু এই সম্পর্ক সবসময় মসৃণ থাকে না। ভুল-বোঝাবুঝি বা রাগের কারণে কখনো কখনো দূরত্ব তৈরি হয়, মনে কষ্ট আসে। এমন পরিস্থিতিতে প্রতিশোধ না নিয়ে ক্ষমা (Forgiveness) করে দেওয়া ইসলামে একটি মহৎ গুণ।
ক্ষমাশীলতার সংজ্ঞা ও স্বরূপ
ক্ষমা মানে কেবল ‘ছেড়ে দেওয়া’ নয়। প্রতিশোধ নেওয়ার পূর্ণ ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও অপরাধীকে মাফ করে দেওয়া এবং মনের ভেতর কোনো জিঘাংসা বা বিদ্বেষ পুষে না রাখাই হলো প্রকৃত ক্ষমা। এটি দুর্বলতা নয়, বরং আত্মিক শক্তির বহিঃপ্রকাশ।
আল্লাহর এক নাম ‘আল-গাফুর’
মহান আল্লাহর ৯৯টি গুণবাচক নামের একটি হলো ‘আল-গাফুর’ বা ‘ক্ষমাশীল’। তিনি বান্দার অপরাধের বিচার সঙ্গে সঙ্গে করতে সক্ষম হলেও অবকাশ দেন এবং তাওবা কবুল করেন। আল্লাহ বলেন- ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ মার্জনাকারী ও ক্ষমাশীল।’ (সুরা নিসা: ৪৩)
অন্যত্র তিনি বলেন- ‘তিনিই তাঁর বান্দাদের তাওবা কবুল করেন ও পাপসমূহ মার্জনা করেন।’ (সুরা শুরা: ২৫)
হাদিসে কুদসিতে আল্লাহ বলেন- ‘হে আদম সন্তান! তুমি যদি পৃথিবী ভর্তি গুনাহ নিয়েও আমার কাছে আসো এবং শিরক না করো, তবে আমিও পৃথিবীব্যাপী ক্ষমা নিয়ে তোমার কাছে আসব।’ (সুনানে তিরমিজি: ৩৫৪০)
কোরআনের আলোকে ক্ষমার নির্দেশ
আল্লাহ তাআলা মানুষকে মহৎ হতে হলে ক্ষমার পথ বেছে নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন।
আল্লাহর ভালোবাসা লাভ: আল্লাহ বলেন- ‘যারা মানুষকে ক্ষমা করে, আল্লাহ তাদের ভালোবাসেন।’ (সুরা আলে ইমরান: ১৩৩)
ক্ষমার আদেশ: রাসুল (স.)-কে নির্দেশ দিয়ে আল্লাহ বলেন- ‘আপনি ক্ষমাশীলতা অবলম্বন করুন, সৎকাজের নির্দেশ দিন এবং অজ্ঞদের এড়িয়ে চলুন।’ (সুরা আরাফ: ১৯৯)
পুরস্কার: ‘যে ক্ষমা করে দেয় এবং আপস-নিষ্পত্তি করে, তার পুরস্কার আল্লাহর জিম্মায়।’ (সুরা শুরা: ৪০)
হাদিসের আলোকে ক্ষমার মর্যাদা
রাসুলুল্লাহ (স.) ক্ষমার মাধ্যমে সম্মান ও মর্যাদা বৃদ্ধির সুসংবাদ দিয়েছেন।
মর্যাদা বৃদ্ধি: আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, নবীজি (স.) বলেন- ‘সদকা করলে সম্পদ কমে না। আর বান্দা যখন অন্যকে ক্ষমা করে দেয়, আল্লাহ তার সম্মান ও মর্যাদা বৃদ্ধি করে দেন।’ (সহিহ মুসলিম: ২৫৮৮)
আল্লাহর ক্ষমা লাভ: নবীজি বলেন- ‘তোমরা দয়া করো, তোমাদের প্রতি দয়া করা হবে। তোমরা ক্ষমা করো, তোমাদেরও ক্ষমা করা হবে।’ (মুসনাদে আহমদ)
সিরাতের পাতায় ক্ষমার অবিস্মরণীয় দৃষ্টান্ত
নবীজি (স.) ছিলেন ক্ষমার মূর্তপ্রতীক। ব্যক্তিগত কোনো কষ্টের প্রতিশোধ তিনি কখনো নেননি।
বেদুইনের ধৃষ্টতা: আনাস (রা.) বলেন, একবার এক বেদুইন নবীজির চাদর ধরে সজোরে টান দিল, যার ফলে তাঁর কাঁধে দাগ বসে গেল। লোকটি কর্কশস্বরে সম্পদ চাইল। নবীজি (স.) রাগ না করে বরং মুচকি হাসলেন এবং তাকে কিছু দেওয়ার নির্দেশ দিলেন। (সহিহ বুখারি: ৩১৪৯)
মক্কা বিজয়: যারা ১৩ বছর ধরে তাঁকে নির্যাতন করেছিল, মক্কা বিজয়ের পর তাদের হাতের মুঠোয় পেয়েও তিনি বলেছিলেন- ‘আজ তোমাদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ নেই। যাও, তোমরা মুক্ত।’
ক্ষমাশীলতার মনস্তাত্ত্বিক ও সামাজিক সুফল
১. সম্পর্ক রক্ষা: সংসারে বা বন্ধুত্বে মান-অভিমান স্বাভাবিক। ক্ষমা না থাকলে সম্পর্ক টেকে না।
২. মানসিক প্রশান্তি: মনের ভেতর ক্ষোভ পুষে রাখলে মানসিক চাপ বাড়ে। ক্ষমা মনকে হালকা করে।
৩. সামাজিক সম্প্রীতি: কেউ বারবার খারাপ আচরণ করার পরও যদি তাকে ক্ষমা করা হয়, তবে একসময় সে লজ্জিত হয়ে নিজেকে শুধরে নেয়। আল্লাহ বলেন, ‘মন্দকে ভালো দিয়ে প্রতিহত করো, দেখবে তোমার চরম শত্রুও অন্তরঙ্গ বন্ধু হয়ে গেছে।’ (সুরা হা-মিম সাজদাহ: ৩৪)
আল্লাহ ক্ষমাশীল এবং তিনি ক্ষমা করতে পছন্দ করেন। জুলুমের প্রতিশোধ নেওয়ার ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও তিনি বান্দাকে ছাড় দেন। আমাদের উচিত নবীজি (স.)-এর আদর্শে উজ্জীবিত হয়ে ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজে ক্ষমার চর্চা করা। আজকের স্লোগান হোক- ‘প্রতিশোধ নয়, ক্ষমাই হোক সমাধানের পথ।’
এ জাতীয় আরো খবর..