মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ার ফলে বিশ্ব বাণিজ্যে বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে।
প্রণালিটি বন্ধ থাকায় ১ হাজার ২০০টির বেশি পণ্যবাহী জাহাজ এখনো আটকে রয়েছে সেখানে। এসব জাহাজে থাকা পণ্যের মোট মূল্য প্রায় ১২৫ বিলিয়ন বা ১২ হাজার ৫০০ কোটি ডলার। বীমা প্রতিষ্ঠান অ্যালিয়াঞ্জ প্রকাশিত গতকালের প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে আসে। খবর ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস।
প্রতিষ্ঠানটি বলছে, বিশ্বের বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ড কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথের ওপর কতটা নির্ভরশীল, হরমুজ সংকট তা আবারো সামনে এনেছে।
ইরানে হামলার পর ফেব্রুয়ারিতে হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ হয়ে যায়। এরপর টানা ১০০ দিনের বেশি সময় ধরে উপসাগরীয় অঞ্চলে বহু জাহাজ আটকে থাকে। সাম্প্রতিক সময়ে কিছু জাহাজ চলাচল শুরু করলেও পরিস্থিতি এখনো পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি।
অ্যালিয়াঞ্জের মতে, প্রায় চার মাস ধরে হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকা বৈশ্বিক সামুদ্রিক বাণিজ্যের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে।
প্রতিষ্ঠানটির মেরিন আন্ডাররাইটিং বিভাগের প্রধান জাস্টাস হাইনরিশ বলেন, ‘এ ঘটনার পর সামুদ্রিক বীমা খাতে ঝুঁকি মূল্যায়নের ধারণা বদলে গেছে। আগে এমন পরিস্থিতিকে কেবল সম্ভাব্য দুর্যোগ হিসেবে বিবেচনা করা হতো। এখন সেটি বাস্তবে দেখা গেছে। ফলে গুরুত্বপূর্ণ নৌপথগুলোর ঝুঁকি নতুনভাবে মূল্যায়ন করা হবে।’
বিশ্ব জ্বালানি বাণিজ্যের জন্য হরমুজ প্রণালি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সংঘাত শুরুর আগে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১৩৫টি জাহাজ এ পথ দিয়ে চলাচল করত। বিশ্বের মোট তেল ও গ্যাসের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পরিবহন করা হয় প্রণালিটি দিয়ে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, হরমুজ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা দেখা দেয়। অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের ওপরে উঠে যায়। এতে বিশ্বজুড়ে বেড়ে যায় পরিবহন ব্যয় ও জ্বালানি খরচ।
আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থার (আইএমও) তথ্যানুযায়ী, সংঘাত চলাকালে ৪০টির বেশি জাহাজ ক্ষেপণাস্ত্র হামলার শিকার হয়েছে। নিহত হয়েছেন অন্তত ১৪ জন নাবিক। ক্ষতিগ্রস্ত জাহাজগুলোর বেশির ভাগই ছিল তেলবাহী ট্যাংকার।
তবে সাম্প্রতিক সময়ে কিছুটা স্বস্তির ইঙ্গিত দেখা গেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি অস্থায়ী শান্তি চুক্তির পর ধীরে ধীরে জাহাজ চলাচল বাড়তে শুরু করেছে।
শিপিং তথ্য সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান লয়েডস লিস্ট ইন্টেলিজেন্সের তথ্যানুযায়ী, ২১ জুন পর্যন্ত এক সপ্তাহে উপসাগর থেকে বের হওয়া জাহাজের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৬৯। আগের সপ্তাহে এ সংখ্যা ছিল ২৪। সংঘাত শুরুর পর এটিই সবচেয়ে বেশি সাপ্তাহিক চলাচল।
তবে পরিবহন ও সরবরাহ খাতের প্রতিষ্ঠানগুলো মনে করছে, আগের অবস্থায় পুরোপুরি ফিরে যেতে সময় লাগবে। অনেক কোম্পানি এরই মধ্যে বিকল্প রুট ব্যবহারের পরিকল্পনা করছে। কেউ ওমান উপসাগরমুখী বন্দর ব্যবহার করছে। কেউ লোহিত সাগর হয়ে পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তুলছে।
বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ পণ্য পরিবহন ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান কুইনে প্লাস নাগেলের সি লজিস্টিকস বিভাগের নির্বাহী ভাইস প্রেসিডেন্ট মাইকেল অ্যালডওয়েল বলেন, ‘এখনো প্রায় তিন লাখ টিইইউ কনটেইনার উপসাগরীয় অঞ্চলে আটকে আছে।’ আন্তর্জাতিক কনটেইনার পরিবহনে টিইইউ একটি মানদণ্ড হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
তিনি বলেন, ‘বিকল্প হিসেবে ব্যবহৃত স্থলপথগুলো এখন ব্যাপক চাপের মধ্যে রয়েছে। ফলে সরবরাহ ব্যবস্থা স্বাভাবিক করতে সময় লাগতে পারে।’
অন্যদিকে অ্যালিয়াঞ্জের মেরিন রিস্ক কনসালটিং বিভাগের প্রধান রাহুল খান্না জানান, সংঘাত চলাকালে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত জাহাজগুলোর জন্য এরই মধ্যে বীমা দাবি জমা পড়তে শুরু করেছে।
তিনি বলেন, ‘ওষুধ, হিমায়িত খাদ্য ও তাপমাত্রা সংবেদনশীল অন্যান্য পণ্যের ক্ষয়ক্ষতি নিয়েও নতুন দাবি আসতে পারে। দীর্ঘ সময় আটকে থাকার কারণে এসব পণ্যের একটি অংশ নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।’
সংকটটি নাবিকদের জন্যও বড় উদ্বেগ তৈরি করেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, বর্তমানে প্রায় ২০ হাজার নাবিক উপসাগরীয় অঞ্চলে থাকা জাহাজে অবস্থান করছেন। তাদের অনেকেই দীর্ঘ সময় ধরে জাহাজে আটকে আছেন।
আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক খাতে আরেকটি সমস্যা হলো বেতন না দেয়া বা প্রয়োজনীয় সহায়তা ছাড়াই নাবিকদের কাজে রাখার ঘটনা। ২০২৫ সালে এ ধরনের ঘটনার সংখ্যা রেকর্ড ছাড়িয়েছে।
অ্যালিয়াঞ্জের প্রতিবেদনে বলা হয়, সামুদ্রিক খাত ভবিষ্যতে দক্ষ নাবিক নিয়োগ ও ধরে রাখার ক্ষেত্রে আরো বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে। কারণ একদিকে স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ছে, অন্যদিকে পরিবেশবান্ধব জাহাজ ও সবুজ জ্বালানির দিকে রূপান্তর চলছে। এসব কারণে দক্ষ জনবলের চাহিদা বাড়ছে।
এদিকে আইএমও জানিয়েছে, বর্তমানে প্রায় ১১ হাজার নাবিক উপসাগরীয় অঞ্চল ত্যাগ করতে চান। তাদের নিরাপদে সরিয়ে নিতে ওমানের সহযোগিতায় একটি বিশেষ করিডোর চালু করা হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ সংকট শুধু একটি আঞ্চলিক সংঘাতের প্রভাব নয়। এটি দেখিয়ে দিয়েছে, বিশ্বের বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা এখনো কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথের ওপর অত্যন্ত নির্ভরশীল।
এসব পথের যেকোনো একটি দীর্ঘ সময়ের জন্য অচল হয়ে গেলে তার প্রভাব বিশ্ব অর্থনীতির প্রায় সব খাতেই পড়ে।
এ জাতীয় আরো খবর..