সর্বশেষ :

ট্রাম্পের যুদ্ধ হুমকির থেকে ইরানের বার্তায় বেশি নজর ওয়াল স্ট্রিটের

  • নিউজ ডেস্ক

    প্রকাশ :- ২০২৬-০৬-২৫, | ১৮:৪৩:০০ |
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গত ২৪ ঘণ্টায় দুবার ইরানের বিরুদ্ধে ফের যুদ্ধ শুরু করার হুমকি দিয়েছেন।

সাধারণ পরিস্থিতিতে এমন বক্তব্য বিশ্ববাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি করতে পারত। বিশেষ করে তেলের বাজারে এর প্রভাব পড়ার কথা ছিল সবচেয়ে বেশি। কিন্তু বাস্তবে ঘটেছে উল্টো ঘটনা।

ট্রাম্পের মন্তব্যের পরও আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৮১ ডলার থেকে কমে ৭৯ ডলারে নেমে এসেছে। বিশ্লেষকদের মতে, বিনিয়োগকারী ও ব্যবসায়ীরা এখন রাজনৈতিক বক্তব্যের চেয়ে কূটনৈতিক আলোচনার অগ্রগতিকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন। খবর ফরচুন।

ওয়াল স্ট্রিটের বিশ্লেষকদের সাম্প্রতিক মূল্যায়নেও একই চিত্র দেখা গেছে। তারা ট্রাম্পের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্ট বা যুদ্ধের হুমকির চেয়ে বেশি প্রাধান্য দেনইরানি কর্মকর্তাদের বক্তব্য ও মধ্যস্থতাকারীদের কাছ থেকে আসা তথ্যকে।

বাজারের ধারণা, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আলোচনা ইতিবাচক দিকে এগোবে। ফলে নতুন করে বড় ধরনের সংঘাত শুরু হওয়ার আশঙ্কা আপাতত কমেছে।

উল্লেখ্য, ইরান যুদ্ধের স্থায়ী অবসানের সমাধান খুঁজতে সুইজারল্যান্ডে অনুষ্ঠিত উচ্চ পর্যায়ের যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনা গতকাল শেষ হয়েছে। তবে চলতি সপ্তাহের বাকি সময়জুড়ে কারিগরি পর্যায়ের আলোচনা চলবে। একই সঙ্গে লেবাননের সংঘাত মোকাবেলায় একটি ডি-কনফ্লিকশন সেল বা সংঘাত নিরসন সমন্বয়ক ইউনিট গঠনে সম্মত হয়েছে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র।

বাজারে এখন সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে এ আলোচনার বাস্তব ফলাফল। আলোচনাটি ৬০ দিনের একটি কূটনৈতিক প্রক্রিয়ার সূচনা, যার লক্ষ্য ইরান যুদ্ধের স্থায়ী অবসান ঘটানো। কিন্তু লেবাননের সংঘাত এখনো প্রধান অচলাবস্থার একটি কারণ হিসেবে রয়ে গেছে।

আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে আলোচনায় অগ্রগতির ইঙ্গিত দেয়া হয়। কোথাও একে ‘উৎসাহব্যঞ্জক অগ্রগতি’ বলা হয়েছে, আবার কোথাও ‘গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, বিনিয়োগকারীরা বিশ্বাস করতে শুরু করেছেন যে উভয় পক্ষই উত্তেজনা কমাতে আগ্রহী। তাই তারা যুদ্ধের হুমকির চেয়ে আলোচনার অগ্রগতিকেই ভবিষ্যৎ পরিস্থিতির ভালো নির্দেশক হিসেবে দেখছেন।

আলোচনায় এরই মধ্যে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে অগ্রগতির কথা জানা গেছে।

এর মধ্যে অন্যতম হলো হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল নিরাপদ রাখার জন্য একটি যোগাযোগ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জলপথটি দিয়ে বৈশ্বিক তেল সরবরাহের বড় অংশ পরিবহন করা হয়।

এছাড়া লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ ও ইসরায়েলের মধ্যে সংঘর্ষ কমানোর লক্ষ্যে একটি সমন্বয় কাঠামো বা ‘ডি-কনফ্লিকশন সেল’ গঠনের বিষয়েও আলোচনা হয়েছে।

বাজারের দৃষ্টিতে এসব পদক্ষেপ গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এগুলো বাস্তবায়ন হলে মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত আরো বিস্তৃত হওয়ার ঝুঁকি কমবে।

বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি নিয়ে উদ্বেগ দীর্ঘদিন ধরেই তেলবাজারের বড় একটি বিষয়। বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল এ জলপথ দিয়ে পরিবহন করা হয়। ফলে সেখানে কোনো ধরনের বিঘ্ন ঘটলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম দ্রুত বেড়ে যায়।

ওয়াল স্ট্রিটের অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন, বাজার এখন রাজনৈতিক বক্তব্যের চেয়ে বাস্তব পরিস্থিতিকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। কয়েক বছর আগেও ট্রাম্পের এমন বক্তব্য তেলের দাম হঠাৎ বাড়িয়ে দিতে পারত। কিন্তু বর্তমানে ব্যবসায়ীরা অপেক্ষা করছেন মাঠ পর্যায়ের তথ্য ও কূটনৈতিক আলোচনার ফলাফলের জন্য।

তেলের বাজারে স্থিতিশীলতা বজায় থাকার পেছনে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে চীনের ভূমিকা উঠে এসেছে। বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধ চলাকালেও তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের ওপরে দীর্ঘ সময় অবস্থান করেনি। এর অন্যতম কারণ চীনের আমদানি কমে যাওয়া।

আর্থিক প্রতিষ্ঠান এলপিএল ফাইন্যান্সিয়ালের বিশ্লেষক জেফরি রোচের তথ্যানুযায়ী, গত মাসে চীনের অপরিশোধিত তেল আমদানি দৈনিক ৬৭ লাখ ব্যারেলে নেমে এসেছে। এটি ২০২৫ সালের গড় আমদানির তুলনায় প্রায় ৪০ শতাংশ কম।

অর্থাৎ দৈনিক প্রায় ৪০ লাখ ব্যারেল তেলের চাহিদা কমেছে। এ পরিমাণ জার্মানি ও ফ্রান্সের সম্মিলিত তেল ব্যবহারের সমান।

বিশ্লেষকদের মতে, চীনের এ আমদানি হ্রাস বৈশ্বিক বাজারে চাহিদার ওপর চাপ সৃষ্টি করেছে। ফলে মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা থাকা সত্ত্বেও তেলের দাম নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।

শেয়ারবাজারেও একই ধরনের সতর্ক অবস্থান দেখা গেছে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, আর্থিক বাজার সবসময় রাজনৈতিক বক্তব্যের সরাসরি প্রতিক্রিয়া জানায় না। বাজার মূলত মূল্যায়ন করে বাস্তবে কী ঘটছে ও ভবিষ্যতে কী ঘটতে পারে।

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে আলোচনায় অগ্রগতি অব্যাহত থাকলে বৈশ্বিক অর্থনীতি আরো স্থিতিশীল পরিবেশে ফিরতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

ডাচ ব্যাংক আইএনজির অর্থনীতিবিদ কারস্টেন ব্রজেস্কি মনে করেন, আলোচনার ইতিবাচক ফল এলে বিশ্ব অর্থনীতি ধীরে ধীরে পুনরুদ্ধারের পথে এগোতে পারে। একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতির চাপ কমে আসা এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর সুদহার কমানোর সুযোগও তৈরি হতে পারে।

শেয়ার করুন



এ জাতীয় আরো খবর..