শান্তিরক্ষী বাহিনী বনাম দুর্ধর্ষ মিলিশিয়া

সাত নেপালি সেনা উদ্ধারের শ্বাসরুদ্ধকর অভিযান

  • নিউজ ডেস্ক

    প্রকাশ :- ২০২৬-০৬-২৩, | ১০:৫৬:৫১ |

জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী বাহিনী যুদ্ধবিধ্বস্ত অঞ্চলে শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রতীক হিসেবে পরিচিত। কিন্তু ২০০৬ সালে আফ্রিকার দেশ কঙ্গোর ইতুরি অঞ্চলে সেই শান্তিরক্ষীরাই মুখোমুখি হয়েছিলেন এক ভয়ংকর সশস্ত্র মিলিশিয়া গোষ্ঠীর। মাত্র কয়েক ঘণ্টার প্রস্তুতিতে শুরু হওয়া একটি অভিযান পরিণত হয় জীবন-মৃত্যুর লড়াইয়ে। সেই অভিযানে একজন সেনা নিহত হন, কয়েকজন আহত হন এবং সাতজন নেপালি শান্তিরক্ষী সেনা মিলিশিয়াদের হাতে বন্দি হয়ে পড়েন।

নিউজ ২৪ ডিজিটালের বিশেষ আয়োজন ‘অপারেশন হোস্টেজ রেসকিউ’ অনুষ্ঠানে সেই অভিযানের বিস্তারিত তুলে ধরেন অবসরপ্রাপ্ত জেনারেল মাহবুব হায়দার খান এবং জেনারেল ঝংকার বাহাদুর কাদায়েত। তাঁদের বক্তব্যে উঠে আসে অভিযানের পরিকল্পনা, ভুল তথ্য, আকস্মিক হামলা এবং দীর্ঘ আলোচনার মাধ্যমে সাত সেনাকে উদ্ধারের রোমাঞ্চকর কাহিনি।

জেনারেল মাহবুব জানান, ২০০৬ সালের ২৭ মে সন্ধ্যায় কঙ্গোর কিসানগনি ডিভিশন হেডকোয়ার্টার থেকে তাঁকে নির্দেশ দেওয়া হয় এফএনআই নেতা পিটার করিমকে আটক করার জন্য অভিযান পরিচালনা করতে। কিন্তু এত বড় অভিযানের জন্য প্রয়োজনীয় গোয়েন্দা তথ্য, প্রস্তুতি ও পরিকল্পনার সময় দেওয়া হয়নি। সাধারণত কোনো অভিযানের আগে শত্রুর অবস্থান, অস্ত্র, জনবল ও সক্ষমতা যাচাই করে প্রস্তুতি নিতে হয়। কিন্তু এবার দ্রুত অভিযান চালানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।

ঊর্ধ্বতন কমান্ডার কয়েক ঘণ্টার মধ্যে অভিযান শুরু করতে চাপ দেন। জেনারেল মাহবুবের ভাষায়, পরিস্থিতি বিবেচনা করে তিনি নেপালি ব্যাটালিয়ন কমান্ডার কর্নেল ঝংকারকে দ্রুত প্রস্তুতি নিতে বলেন। একই সঙ্গে প্রয়োজনীয় তথ্য, অস্ত্র, জনবল ও বিমান সহায়তা প্রস্তুত রাখার নির্দেশ দেন।
জেনারেল ঝংকার জানান, আদেশ পাওয়ার পর তিনি বুঝতে পারেন অভিযানটি অত্যন্ত তাড়াহুড়ার মধ্যে পরিচালনা করতে হবে। তিনি ব্রিগেড সদর দপ্তরে সময় চাইলেও উচ্চতর নির্দেশের কারণে অভিযান বাতিল করা সম্ভব হয়নি।

রাতের মধ্যেই চারটি অবস্থান থেকে সৈন্য সমাবেশ করা হয়। ভোর ৪টার দিকে সেনারা মুভ করার জন্য প্রস্তুত হন। কঙ্গোর জাতীয় সেনাবাহিনীর সদস্যদের সঙ্গে সমন্বয় করেই অভিযান শুরু করা হয়। জেনারেল মাহবুব বলেন, স্বল্প সময়ের মধ্যে সৈন্য, অস্ত্র ও গোলাবারুদ প্রস্তুত করে ফাতাকি এলাকায় নিয়ে যাওয়া ছিল অত্যন্ত কঠিন কাজ। তিনি কর্নেল ঝংকার ও তাঁর দলের এই প্রস্তুতির প্রশংসা করেন।

২৮ মে ভোর ৬টায় অপারেশন শুরু হয় এবং এফএআরডিসি (কঙ্গোলিজ ন্যাশনাল আর্মি)-কে গাইড হিসেবে নিয়ে নেপব্যাটের ১৫০ জনের একটি টহল দল সামনের দিকে এগোতে থাকে। সকাল সাড়ে ৭টার দিকে টার্গেট এলাকায় পৌঁছানোর আগেই ডেড গ্রাউন্ড পার হওয়ার সময় মিলিশিয়া গ্রুপ তাদের ওপর তীব্র ফায়ার ওপেন করে। গোয়েন্দা তথ্যে তিন-চারজনের কথা বলা হলেও সেখানে প্রায় ৪০০ মিলিশিয়া সুপরিকল্পিতভাবে অতর্কিত হামলা চালায়। হামলার ভয়াবহতা দেখে শুরুর দিকেই কঙ্গোলিজ আর্মি রণে ভঙ্গ দিয়ে এলোমেলোভাবে পেছন দিকে পালিয়ে যায়। যুদ্ধ চলাকালে জ্ঞান বাহাদুর অধিকারী নামের একজন সাহসী রেডিও অপারেটর সার্জেন্ট নিহত হন এবং তিনজন সেনা আহত হন। টহল দলের সামনের অংশটি মূল বাহিনী থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় এবং সাতজন সেনাকে মিলিশিয়ারা জিম্মি করে নিয়ে যায়।

জেনারেল ঝংকার জানান, এটি ছিল একটি পরিকল্পিত অ্যামবুশ। কঙ্গোর সরকারি বাহিনীর সদস্যরা প্রথম ধাক্কায়ই পিছু হটে যায়। ফলে নেপালি সেনারা কঠিন পরিস্থিতিতে পড়ে যায়। তিনজন সেনা আহত হন এবং সামনের একটি দল মূল বাহিনী থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। জেনারেল মাহবুব জানান, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে জাতিসংঘের আক্রমণকারী হেলিকপ্টার মোতায়েন করা হয়। দীর্ঘ সময় ধরে মিলিশিয়াদের অবস্থানে হামলা চালানো হলেও রাত নেমে আসায় কার্যকর অভিযান চালানো কঠিন হয়ে পড়ে।

তিনি বলেন, সাত সেনাকে উদ্ধারের জন্য সরাসরি বড় ধরনের আক্রমণ চালানো হলে বন্দিদের জীবন আরো ঝুঁকিতে পড়তে পারত। তাই তাঁরা অন্য কৌশল গ্রহণ করেন হামলার পর প্রথম কয়েক দিন নিখোঁজ সেনারা বেঁচে আছেন কি না তা কারো জানা ছিল না। পরে নানা মহলের প্রচেষ্টায় যোগাযোগের পথ উন্মুক্ত হয়। স্থানীয় কোয়ানি নামের এক কমিউনিটি লিডার এবং একজন যাজকের সাহায্যে মিলিশিয়াদের সঙ্গে ধীরে ধীরে যোগাযোগ স্থাপন করা হয় । 

প্রায় ১১ দিন পর বিদ্রোহী কমান্ডার পিটার করিমের সঙ্গে যোগাযোগ করে নিশ্চিত হওয়া যায় যে সেনারা বেঁচে আছেন। দীর্ঘ ৪২ দিন পর ব্যাপক দর-কষাকষির মাধ্যমে এই সংকটের একটি সমাধান আসে। এই উদ্ধার আলোচনায় কিনশাসা থেকে শুরু করে রাষ্ট্রপতির উপদেষ্টা, ইউএনডিপি, ফোর্স কমান্ডার এবং লেন্দু সম্প্রদায়ের সংসদ সদস্যরাও কার্যকর ভূমিকা পালন করেন। অবশেষে সব প্রচেষ্টার পর এক গভীর জঙ্গলের ক্যাম্পে বিদ্রোহী নেতা কমিউনিটি লিডারের মাধ্যমে জিম্মি সাত সেনাকে জেনারেল ঝংকারের হাতে তুলে দেয় এবং তাঁরা নিরাপদে ব্যারাকে ফিরে আসেন।

জেনারেল ঝংকার বলেন, পুরো অভিযানের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল সৈন্যদের মনোবল ধরে রাখা। একদিকে যুদ্ধ পরিস্থিতি, অন্যদিকে বন্দি সেনাদের পরিবারের উদ্বেগ— সবকিছু সামলে অভিযান পরিচালনা করতে হয়েছে। তিনি জানান, উচ্চ পর্যায় থেকেও বন্দিদের উদ্ধারে সামরিক অভিযান চালানোর চাপ ছিল। কিন্তু তিনি মনে করেছিলেন, সরাসরি হামলা করলে বন্দিদের জীবন ঝুঁকিতে পড়বে। তাই আলোচনার পথেই সফলতা আসে।

শেয়ার করুন



এ জাতীয় আরো খবর..