✕


পারিবারিক ঐক্যেই কমেছে ভারতের দারিদ্র্য, ধুঁকছে অন্যরা

  • নিউজ ডেস্ক

    প্রকাশ :- ২০২৬-১১-০৫, | ১৫:২১:৫৬ |

ভারতের দারিদ্র্য হ্রাসের পেছনে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, নারীদের শ্রমবাজারে অংশগ্রহণ এবং সরকারি সামাজিক সহায়তার পাশাপাশি পারিবারিক ব্যবস্থারও বিশেষ অবদান রয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। একাধিক উপার্জনক্ষম সদস্যের আয় এবং পরিবারের মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা দেশটির অর্থনীতিকে এগিয়ে নিতে সহায়তা করেছে।

বিশ্বব্যাংকের ২০২৬ সালের অক্টোবরের ‘ইন্ডিয়া পভার্টি অ্যান্ড ইকুইটি ব্রিফ’ শীর্ষক প্রতিবেদনে ভারতে দারিদ্র্য হ্রাসের উল্লেখযোগ্য চিত্র উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১১ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে নিম্নমধ্যম আয়ের দেশগুলোর জন্য নির্ধারিত দারিদ্র্যসীমার (দৈনিক ৪.২০ ডলার, ২০২১ সালের ক্রয়ক্ষমতার সমতা অনুযায়ী) নিচে বসবাসকারী মানুষের হার ৫৭ দশমিক ৭ শতাংশ থেকে কমে ১৬ দশমিক ১ শতাংশে নেমেছে। অর্থাৎ, এ সময়ে প্রায় ৪৯ কোটি ৬০ লাখ মানুষ এ দারিদ্র্যসীমার ওপরে উঠে এসেছেন। অন্যদিকে, দৈনিক ৩ ডলারের চরম দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাসকারী মানুষের হার ২৭ দশমিক ১ শতাংশ থেকে কমে দাঁড়িয়েছে ২ দশমিক ৬ শতাংশে।

এই পরিসংখ্যানের পেছনের কারণগুলো নীতিনির্ধারক ও সমাজের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে।

বিশ্বব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, ২০১৭ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে ভারতে নতুন করে প্রায় ১৩ কোটি ৪০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে, যা কর্মক্ষম জনসংখ্যা বৃদ্ধির হারের প্রায় দ্বিগুণ। এসব নতুন কর্মীর একটি বড় অংশ গ্রামীণ এলাকার নারী। পাশাপাশি সরকারি খাদ্য ভর্তুকি ও সামাজিক সহায়তা কর্মসূচি পরিবারগুলোর অন্যান্য চাহিদা মেটানোর সুযোগ বাড়িয়েছে।

ভারতের দারিদ্র্য হ্রাসে পরিবারের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। একই পরিবারের একাধিক সদস্যের উপার্জন এবং রান্নাঘর পর্যন্ত সরকারি সামাজিক সহায়তা পৌঁছে যাওয়ায় পরিবারগুলোর আর্থিক সক্ষমতা বেড়েছে। প্রচলিত অর্থনৈতিক বিশ্লেষণে সাধারণত একজন ব্যক্তির শ্রম ও আয়কে গুরুত্ব দেওয়া হয়। তবে ভারতের অভিজ্ঞতায় পারিবারিক সহযোগিতার বিষয়টিও বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে।

মূলত ভারতের দারিদ্র্য হ্রাসের গল্পকে পারিবারিক রূপান্তরের গল্প হিসেবেও দেখা হচ্ছে। যেখানে জাপান, চীন ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দেশগুলো দুর্বল হয়ে পড়া পারিবারিক কাঠামো পুনর্গঠনে এখন বিপুল অর্থ ব্যয় করছে। অন্যদিকে, ভারতের পারিবারিক ব্যবস্থা এখনো অনেকাংশে টিকে রয়েছে। জাতীয় স্বয়ংসেবক সংঘের (আরএসএস) অর্থনৈতিক চিন্তাভাবনার কেন্দ্রেও পরিবার গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। সংঘের মতে, সমাজ ও অর্থনীতির মূল একক শুধু ব্যক্তি নয়, বরং ‘কুটুম্ব’ বা পরিবার।

অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিবার

পশ্চিমা অর্থনীতিতে পারিবারিক ব্যবস্থার গুরুত্ব স্বীকৃতি পেয়েছে তুলনামূলকভাবে দেরিতে। ১৯৯২ সালে গ্যারি বেকার অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার পাওয়ার পর রয়্যাল সুইডিশ একাডেমি তার গবেষণার একটি দিক তুলে ধরে। সেখানে পরিবারকে একটি ‘ছোট কারখানা’ হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়, যা সময় ও বাজার থেকে কেনা পণ্য ব্যবহার করে পরিবারের সদস্যদের বিভিন্ন সেবা দিয়ে থাকে। পশ্চিমা অর্থনীতিবিদদের কাছে এটি নতুন চিন্তা হলেও ভারতীয় পরিবারের কাছে এমন ব্যবস্থা দীর্ঘদিনের পরিচিত জীবনযাত্রার অংশ।

আরএসএসের অন্যতম শীর্ষ তাত্ত্বিক দাত্তোপান্ত থেংড়ি এই পার্থক্য তুলে ধরে বলেছিলেন, ‘পশ্চিম তৈরি করেছে ব্যক্তিকেন্দ্রিক কাঠামো, আর ভারতের কেন্দ্রবিন্দুতে সব সময় ছিল পরিবার।’ তার মতে, পরিবার এমন একটি সেতু, যা ব্যক্তিকে সমাজ ও সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত করে। তাই সংঘের দৃষ্টিতে শক্তিশালী অর্থনীতির ভিত্তি গড়ে ওঠে পারিবারিক কাঠামোর ওপর।

কিছু পরিসংখ্যানও এ ধারণার পক্ষে তুলে ধরা হয়। পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ম্যাককিন্সের হিসাব অনুযায়ী, ভারতের মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) পারিবারিক ব্যবসার অবদান ৭৫ শতাংশের বেশি। অন্যদিকে, মরগান স্ট্যানলির ২০২৫ সালের হিসাব অনুযায়ী, ভারতীয় পরিবারগুলোর কাছে প্রায় ৩৪ হাজার ৬০০ টন সোনা রয়েছে, যার মূল্য দেশটির জিডিপির প্রায় ৮৮ দশমিক ৮ শতাংশের সমান। ভারতীয় পরিবারের কাছে এই সোনা শুধু অলংকার নয়; এটি সঞ্চয়, আর্থিক নিরাপত্তা এবং প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে সম্পদ হস্তান্তরের একটি মাধ্যম।

আরএসএস প্রধান মোহন ভাগবত ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে কলকাতায় দেওয়া এক বক্তব্যে একই বিষয় তুলে ধরে বলেন, ‘আমাদের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয় পরিবারের মাধ্যমে, দেশের সঞ্চয়ও হয় পরিবারে। আমাদের সোনা পরিবারগুলোর হাতেই রয়েছে।’

ভারতের নিজস্ব সামাজিক নিরাপত্তাব্যবস্থা

পরিবারকে ভারতের নিজস্ব সামাজিক সুরক্ষাব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ‘ইন্টারন্যাশনাল জার্নাল অব সোসিওলজি অ্যান্ড সোশ্যাল পলিসি’তে প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, ভারতে প্রায় ৮৫ শতাংশ প্রবীণ তাদের সন্তানদের সঙ্গে বসবাস করেন। মাত্র ২ শতাংশ প্রবীণ একা থাকেন। গবেষণায় আরও দেখা গেছে, সন্তান ও জীবনসঙ্গীর সঙ্গে বড় পরিবারে বসবাসকারী প্রবীণরা বিষণ্নতা বা মানসিক অবসাদ থেকে তুলনামূলকভাবে বেশি সুরক্ষিত থাকেন।

একটি ভারতীয় পরিবার যে সেবা ও নিরাপত্তা অনেক ক্ষেত্রে বিনা খরচে দিয়ে থাকে, বিশ্বের বহু দেশ সেই সেবা নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রীয় কল্যাণ তহবিল থেকে বিপুল অর্থ ব্যয় করছে।

পারিবারিক কাঠামো ভাঙনে অন্যান্য দেশের খেসারত

পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর দিকে তাকালে ভিন্ন চিত্র দেখা যায়। জাপানে ২০২৫ সালে জন্মহার ইতিহাসের সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। দেশটিতে জন্মের তুলনায় মৃত্যুর সংখ্যা অনেক বেশি। চীনেও টানা চার বছর ধরে জনসংখ্যা কমছে এবং জন্মহার উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে।

দক্ষিণ কোরিয়ার পরিস্থিতিও উদ্বেগজনক। ২০২২ সালের তথ্য অনুযায়ী, দেশটির নবদম্পতিদের প্রায় ৪৬ দশমিক ৪ শতাংশের কোনো সন্তান ছিল না। এ ধরনের জীবনযাপনকে ‘ডাবল ইনকাম, নো কিডস’ বা ডিঙ্ক মডেল বলা হয়। সাময়িকভাবে এ ব্যবস্থায় দম্পতিদের আয় বাড়লেও দীর্ঘ মেয়াদে অর্থনীতি ও পারিবারিক সুরক্ষাব্যবস্থার ওপর চাপ তৈরি হতে পারে। ভবিষ্যতে দেশটিতে শ্রমিকের সংকট বাড়ার পাশাপাশি প্রবীণদের দেখভালের সুযোগও কমে আসার আশঙ্কা রয়েছে।

পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে জাপানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ফুমিও কিশিদা পার্লামেন্টে বলেছিলেন, ‘জাপান এমন এক দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে সমাজ হিসেবে টিকে থাকাই চ্যালেঞ্জিং হয়ে পড়েছে।’ জনসংখ্যাবিদদের মতে, যুদ্ধ বা প্রাকৃতিক দুর্যোগের মতো বাহ্যিক কারণ ছাড়াও মানুষের বিয়ে ও পরিবার গঠনসংক্রান্ত ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের কারণে বিভিন্ন দেশে জনসংখ্যা কমছে।

পরিবার পুনরুদ্ধারের চড়া মূল্য

পারিবারিক কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়ার পর তা পুনরুদ্ধারে বিপুল অর্থ ব্যয় করছে বিভিন্ন দেশ। দক্ষিণ কোরিয়া শিশু সহায়তা ও এ-সংক্রান্ত বিভিন্ন প্রকল্পে ২০০৬ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে প্রায় ২৭০ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করেছে। তবে এত ব্যয়ের পরও দেশটির প্রজনন হার বাড়েনি। জাপান ও চীনও প্রতিবছর শত শত কোটি ডলারের প্রণোদনা ঘোষণা করছে।

তবে শুধু আর্থিক প্রণোদনা দিয়ে পারিবারিক ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয় বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, কোনো দেশের জন্মহার একবার অত্যন্ত নিচে নেমে গেলে তা আবার বাড়ানো কঠিন হয়ে পড়ে।

ভারতের সুযোগ: পারিবারিক ব্যবস্থা রক্ষা

বৈশ্বিক পরিস্থিতি থেকে শিক্ষা নিয়ে আরএসএস প্রধান মোহন ভাগবত ভারতীয় দম্পতিদের পারিবারিক কাঠামো ধরে রাখার আহ্বান জানিয়েছেন। সংঘের ‘পঞ্চ পরিবর্তন’ কর্মসূচির অন্যতম প্রধান স্তম্ভ হিসেবে পরিবারকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া ‘কুটুম্ব প্রবোধ’ বা পরিবার সচেতনতা নামে তাদের একটি পৃথক শাখা রয়েছে, যা সমাজে পারিবারিক মূল্যবোধ জোরদারে কাজ করে।

জাতীয় সমৃদ্ধির ভিত্তি পরিবার

ভারতের দারিদ্র্য হ্রাসের সাফল্যে কর্মসংস্থান, নারীদের অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ ও সরকারি সামাজিক সহায়তার পাশাপাশি পারিবারিক সহযোগিতার ভূমিকাও আলোচনায় এসেছে। পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো যখন দুর্বল হয়ে পড়া পারিবারিক কাঠামো পুনর্গঠনে বিপুল অর্থ ব্যয় করছে, তখন ভারতের বিদ্যমান পারিবারিক ব্যবস্থাকে একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক ও অর্থনৈতিক সম্পদ হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে।

শেয়ার করুন



এ জাতীয় আরো খবর..