✕


কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ পেলেও ট্রাম্পকে মোকাবিলায় কঠিন পরীক্ষায় ডেমোক্র্যাটরা

  • নিউজ ডেস্ক

    প্রকাশ :- ২০২৬-১১-০৫, | ১২:৫৯:৪৩ |

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে বড় জয়ের পর আগামী জানুয়ারিতে কংগ্রেসের উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ নিতে যাচ্ছে ডেমোক্র্যাট পার্টি। নির্বাচনী ফলের পর দলটির নেতাকর্মীদের মধ্যে উচ্ছ্বাস দেখা গেলেও ক্ষমতা কাজে লাগিয়ে প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করা সহজ হবে না। কারণ, হোয়াইট হাউসে প্রেসিডেন্ট হিসেবে বহাল থাকছেন রিপাবলিকান ডোনাল্ড ট্রাম্প।

ফলে আইন প্রণয়ন, ইরান যুদ্ধ বন্ধ এবং স্বাস্থ্যসেবাসহ বিভিন্ন নীতিতে দুই দলের মধ্যে নতুন করে সংঘাতের আশঙ্কা রয়েছে। ব্রিটিশ বার্তাসংস্থা বিবিসির এক প্রতিবেদনে এ সব তথ্য জানা যায়। 

মঙ্গলবার রাতে নির্বাচনে বড় জয়ের পর হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভসের ডেমোক্র্যাট নেতা হাকিম জেফরিস বলেন, ‘আজ থেকে আমেরিকার মহান প্রত্যাবর্তন শুরু হলো।’

নির্বাচনী প্রচারে ডেমোক্র্যাটরা দুর্নীতির তদন্ত, স্বাস্থ্যসেবা, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ও জ্বালানির দাম কমানো এবং ইরান যুদ্ধের লাগাম টানার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। এখন এসব প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হবে তাদের।

তবে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ পেলেই নিজেদের সব পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে পারবেন না ডেমোক্র্যাটরা। কারণ, কংগ্রেসে পাস হওয়া কোনো বিল ট্রাম্প অনুমোদন না করলে তা আইনে পরিণত হবে না।

ডেমোক্র্যাট সিনেটর ক্রিস কুনস নির্বাচনী বিজয়কে দলের জন্য জনসমর্থনের নিরঙ্কুশ ম্যান্ডেট হিসেবে বিবেচনা না করার পরামর্শ দিয়েছেন। বিবিসিকে তিনি বলেন, দলটি এখনো মানুষের কাছে যথেষ্ট জনপ্রিয় নয়। কম মজুরি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির মতো সমস্যার সমাধান করে জনগণের আস্থা অর্জন করতে হবে।


ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে তদন্তের সুযোগ

কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ পাওয়ায় ট্রাম্প প্রশাসনের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড তদন্তের সুযোগ তৈরি হয়েছে ডেমোক্র্যাটদের সামনে। প্রতিনিধি পরিষদের গুরুত্বপূর্ণ তদারকি কমিটির নেতৃত্ব দিতে যাচ্ছেন ক্যালিফোর্নিয়ার কংগ্রেসম্যান রবার্ট গার্সিয়া। নির্বাচনী ফল আসতে শুরু করার পর তিনি ট্রাম্প প্রশাসনকে উদ্দেশ্য করে বলেন, ‘আইনজীবী ঠিক করুন।’

গার্সিয়া জানিয়েছেন, ট্রাম্পের পরিবার, করপোরেট দুর্নীতি, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং অভিবাসন ও শুল্ক প্রয়োগকারী সংস্থার (আইসিই) কথিত ক্ষমতার অপব্যবহার এবং জেফরি এপস্টেইন-সংক্রান্ত নথি ব্যবস্থাপনা তদন্তের আওতায় আসতে পারে।

প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেটের বিভিন্ন কমিটির তদন্তের ক্ষমতা রয়েছে। এ ক্ষমতা ব্যবহার করে প্রেসিডেন্ট ও তার ঘনিষ্ঠদের বিরুদ্ধে স্বার্থের সংঘাতসহ বিভিন্ন অভিযোগ খতিয়ে দেখতে পারবেন ডেমোক্র্যাটরা।

এ ছাড়া প্রেসিডেন্টের মন্ত্রিসভার সদস্য ও বিচারপতি নিয়োগ অনুমোদন কিংবা আটকে দেওয়ার ক্ষমতাও রয়েছে সিনেটের। ট্রাম্পের মেয়াদে সুপ্রিম কোর্টে কোনো পদ শূন্য হলে ডেমোক্র্যাটরা তার মনোনয়ন আটকে দিতে পারেন অথবা দ্বিদলীয় সমর্থন পেতে অপেক্ষাকৃত মধ্যপন্থী কাউকে মনোনয়ন দিতে চাপ সৃষ্টি করতে পারেন।


অভিশংসনের আলোচনা, তবে বাধা সিনেটে

ট্রাম্পকে অভিশংসনের উদ্যোগ নেওয়ার ক্ষমতাও রয়েছে ডেমোক্র্যাটদের নিয়ন্ত্রণে থাকা প্রতিনিধি পরিষদের। এর আগে প্রথম মেয়াদে ট্রাম্পকে দুবার অভিশংসন করেছিল হাউজ অব রিপ্রেজেন্টেটিভস। তবে দুইবারই সিনেটে ভোটাভুটিতে তিনি অভিযোগ থেকে অব্যাহতি পান।

যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্টকে অভিশংসনের মাধ্যমে পদ থেকে অপসারণ করতে সিনেটের দুই-তৃতীয়াংশ বা ৬৭ সদস্যের সমর্থন প্রয়োজন। ফলে ডেমোক্র্যাটদের একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকলেও ট্রাম্পকে চূড়ান্তভাবে অপসারণ করা কঠিন হবে।

এ নিয়ে ডেমোক্র্যাটদের মধ্যেও মতভেদ রয়েছে। দলের কেউ কেউ অভিশংসনের পক্ষে থাকলেও অন্যরা মনে করছেন, এতে রাজনৈতিক বিভাজন আরও বাড়তে পারে। ২০১৯ সালে প্রথম অভিশংসনের পর ট্রাম্প নিজেকে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হিসেবে তুলে ধরেছিলেন, যা পরবর্তী সময়ে তার রাজনৈতিক সমর্থন বাড়াতে ভূমিকা রেখেছিল।

ডেমোক্র্যাট নেতা জেফরিস এ বিষয়ে এখনো স্পষ্ট কোনো অবস্থান জানাননি। গত আগস্টে সিএনএনকে তিনি বলেছিলেন, অভিশংসনের সম্ভাবনা তারা নাকচও করেননি, আবার নিশ্চিতও করেননি।


আইন প্রণয়নে ট্রাম্পের ভেটো বড় বাধা

কংগ্রেসের উভয় কক্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় ডেমোক্র্যাটরা তুলনামূলক সহজে নিজেদের বিল পাস করাতে পারবেন। কিন্তু সেগুলো আইনে পরিণত করতে ট্রাম্পের অনুমোদন প্রয়োজন হবে।

প্রেসিডেন্ট কোনো বিলে ভেটো দিলে কংগ্রেসের উভয় কক্ষে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতায় সেটি বাতিল করতে হয়। ডেমোক্র্যাটদের এককভাবে সেই সংখ্যাগরিষ্ঠতা নেই।

মঙ্গলবার রাতে একের পর এক সিনেট আসনে রিপাবলিকানদের পরাজয়ের পর নিউইয়র্ক টাইমসকে ট্রাম্প বলেন, ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে কাজ করতে তিনি আগ্রহী এবং সমঝোতার পথ খুঁজবেন। তবে এর কয়েক মিনিট পরই নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে ‘ভেটো’ লেখা লাল রঙের নির্বাচনী টুপির ছবি প্রকাশ করেন তিনি।


স্বাস্থ্যসেবা ও ইসরায়েল ইস্যুতে মতবিরোধ

স্বাস্থ্যসেবা খাতে রিপাবলিকানদের করা বড় ধরনের কাটছাঁট বাতিল করতে চান ডেমোক্র্যাটরা। বিশেষ করে স্বল্প আয়ের মানুষের জন্য স্বাস্থ্যসেবা কর্মসূচি মেডিকেইডে বরাদ্দ কমানো এবং ওবামাকেয়ার মার্কেটপ্লেসের কর-সুবিধা নিয়ে নতুন করে উদ্যোগ নিতে চান তারা।

জেফরিস জানিয়েছেন, মেডিকেইডে কাটছাঁট প্রত্যাহার এবং সাশ্রয়ী স্বাস্থ্যসেবা আইনের কর-সুবিধা বাড়ানো তাদের অন্যতম অগ্রাধিকার।

তবে ইসরায়েলকে সামরিক সহায়তা দেওয়ার বিষয়টি ডেমোক্র্যাটদের মধ্যেই মতবিরোধ তৈরি করতে পারে। মধ্যবর্তী নির্বাচনের প্রচারে দলের একাংশ ইসরায়েলকে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সহায়তা সীমিত করার পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। মিশিগান থেকে নির্বাচিত হতে যাওয়া আবদুল এল-সাঈদসহ কয়েকজন নতুন আইনপ্রণেতা এ ধরনের প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তবে দলের নেতৃত্বের সঙ্গে তাদের মতবিরোধ দেখা দিতে পারে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই খাতের নিয়ন্ত্রণ, জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো এবং ইরান যুদ্ধের লাগাম টানার মতো বিষয়েও দুই দলের মধ্যে সমঝোতা কঠিন হতে পারে।


ইরান যুদ্ধ বন্ধে কংগ্রেসের ক্ষমতা কতটুকু?

ইরান যুদ্ধ বন্ধে ট্রাম্পের ক্ষমতা সীমিত করার চেষ্টা আগেও করেছে কংগ্রেসের উভয় দলের কিছু সদস্য। গত জুনে প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট দুই কক্ষেই ইরানের সঙ্গে শত্রুতা বন্ধের প্রস্তাব পাস হয়েছিল। কিন্তু ট্রাম্প কার্যত সেটি উপেক্ষা করে যুদ্ধ চালিয়ে যান।

হোয়াইট হাউসের দাবি, যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার বিষয়ে প্রেসিডেন্টের বিস্তৃত সাংবিধানিক ক্ষমতা রয়েছে। তবে কংগ্রেস সরাসরি কীভাবে প্রেসিডেন্টকে যুদ্ধ বন্ধে বাধ্য করতে পারে, তা এখনো আইনি বিতর্কের বিষয়।

ব্রুকিংস ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ ফেলো স্কট অ্যান্ডারসনের মতে, এ বিষয়ে কংগ্রেস আদালতের শরণাপন্ন হতে পারে এবং বিচার বিভাগের মাধ্যমে বিষয়টির আইনি ব্যাখ্যা চাইতে পারে।

এদিকে, নির্বাচনের আগে পরিচালিত এক গ্যালাপ জরিপে দেখা গেছে, কংগ্রেসের কার্যক্রমে সন্তুষ্ট মাত্র ১৪ শতাংশ নিবন্ধিত ভোটার। ফলে ডেমোক্র্যাটদের সামনে শুধু ট্রাম্পের বিরোধিতা নয়, বরং আইন প্রণয়ন ও জনজীবনের সমস্যার সমাধানে কার্যকর ভূমিকা রাখার চাপও থাকবে।

বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের নেতৃত্বাধীন হোয়াইট হাউস এবং ডেমোক্র্যাট নিয়ন্ত্রিত কংগ্রেসের মধ্যে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব আগামী দুই বছর যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে অচলাবস্থা আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। 

শেয়ার করুন



এ জাতীয় আরো খবর..