✕


দেবীগঞ্জের জলপাইহাট

প্রতিদিন অর্ধকোটি টাকার বেচাকেনা, কর্মসংস্থান কয়েকশ মানুষের

  • নিউজ ডেস্ক

    প্রকাশ :- ২০২৬-১১-০৫, | ০২:০৪:১৬ |
পঞ্চগড়ের দেবীগঞ্জ উপজেলার দেবদারুতলা জলপাইয়ের হাটে জমতে শুরু করেছে মৌসুমি বেচাকেনা। উত্তরাঞ্চলের অন্যতম বৃহৎ এই পাইকারি বাজারে প্রতিদিন ১৪০ থেকে ২০০ টন পর্যন্ত জলপাই কেনাবেচা হয়। যার আনুমানিক বাজারমূল্য ৪০ থেকে ৫০ লাখ টাকা। হাট ঘিরে মৌসুমে কর্মসংস্থান হয়েছে কয়েকশ মানুষের। তবে এত বড় বাজারে জলপাই সংরক্ষণের জন্য নেই কোনো হিমাগার।

সরেজমিনে দেখা যায়, হাটজুড়ে ছোট-বড় স্তূপ করে রাখা হয়েছে জলপাই। কোথাও চলছে ওজন, কোথাও আকার অনুযায়ী বাছাই। পরে জলপাই পরিষ্কার করে বস্তাবন্দী করা হচ্ছে। এসব কাজে পুরুষদের পাশাপাশি অংশ নিচ্ছেন নারী শ্রমিকেরাও।

মৌসুমজুড়ে পঞ্চগড়ের বিভিন্ন এলাকা ছাড়াও পার্শ্ববর্তী দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও ও নীলফামারী জেলা থেকে কৃষক ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা জলপাই নিয়ে আসেন এই হাটে। ব্যাটারিচালিত ভ্যান, ইজিবাইক, নছিমনসহ বিভিন্ন যানবাহনে এসব জলপাই আনা হয়। কারও কাছে এই হাট নিজের গাছের ফল বিক্রির জায়গা, আবার কারও কাছে বছরের পর বছর ধরে জীবিকার উৎস।

এত বড় বাজার হলেও এখানে জলপাই সংরক্ষণের জন্য নেই কোনো হিমাগার। ফলে কেনাবেচার পর দ্রুত জলপাই পাঠিয়ে দিতে হয় বিভিন্ন গন্তব্যে। হাটের পরিধি বাড়ানো ও সংরক্ষণব্যবস্থা গড়ে তোলার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

দেবীগঞ্জ সদর ইউনিয়নের পূর্ব দেবীডুবা এলাকার কৃষক নজরুল ইসলাম এবার প্রথমবারের মতো নিজের গাছের জলপাই নিয়ে হাটে এসেছেন। তিনি বলেন, ‘একটি গাছে এবার প্রথম জলপাই ধরেছে। ১৬ টাকা কেজি দরে ৫৩ কেজি জলপাই বিক্রি করেছি। যে দাম পেয়েছি, তাতে আমি খুশি।’

পঞ্চগড় থেকে আসা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী মতিউর রহমান বলেন, ‘৮ বছর ধরে আমরা তিনজন মিলে বিভিন্ন গ্রাম থেকে জলপাই কিনে এই হাটে এনে বিক্রি করি। দিনশেষে জনপ্রতি এক হাজার থেকে ১২০০ টাকা পর্যন্ত লাভ থাকে।’

দীর্ঘদিন ধরে জলপাইয়ের ব্যবসা করছেন স্থানীয় পাইকার মো. বেলাল হোসেন। তিনি বলেন, ‘প্রতিদিন প্রায় ২৫ থেকে ৩০ টন জলপাই কেনাবেচা করি। এর কিছু প্রাণ কোম্পানিতে যায়। বাকিগুলো ঢাকা, বরিশাল, যশোরসহ দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন জেলায় পাঠানো হয়। এছাড়া দেবীগঞ্জের জলপাই দেশের বাইরেও যায়।’

চট্টগ্রাম থেকে আসা ব্যবসায়ী আব্দুল কাদের বলেন, ‘এই বাজার থেকে প্রতিদিন ৮ থেকে ১০ টন জলপাই কিনি। আমার মতো চট্টগ্রামের আরও পাইকার আছেন, যারা ১০ থেকে ১৫ টন করে জলপাই কেনেন। এসব জলপাই বিভিন্ন কোম্পানিতে সরবরাহের পাশাপাশি দেশের অন্যান্য জেলাতেও পাঠানো হয়।’

জলপাইয়ের এই হাট ঘিরে মৌসুমে কর্মসংস্থান হয়েছে কয়েকশ মানুষের। প্রতিদিন প্রায় ২০০ থেকে ২৫০ জন শ্রমিক বিভিন্ন পাইকারের হয়ে জলপাই কেনা, বাছাই, পরিষ্কার ও ট্রাকে বোঝাইয়ের কাজ করেন। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক নারী শ্রমিকও রয়েছেন।

মৌসুমি শ্রমিক সাব্বির ইসলাম বলেন, ‘এবার নতুন করে কাজ করছি। আমার মহাজন প্রতিদিন ২০ থেকে ২৫ টন জলপাই কেনেন। আমি জলপাই বাছাইয়ের কাজ করি।’

হাটে ৩০ সদস্যের একটি নারী শ্রমিক দলকে জলপাই বাছাই ও বোঁটা ছাড়ানোর কাজ করতে দেখা গেছে। তাদের একজন সাবিত্রী দাস বলেন, ‘সকাল ৮টায় আসি, বিকেল ৫টায় যাই। আমাদের কাজ জলপাই বাছাই করা ও বোঁটা ছাড়ানো। সারাদিন কাজ করে ৩০০ টাকা পাই।’

উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেবীগঞ্জ উপজেলায় ৩ হেক্টর জমিতে জলপাই চাষ হয়। স্থানীয় উৎপাদন কম হলেও পঞ্চগড় ছাড়াও পার্শ্ববর্তী দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও ও নীলফামারী জেলা থেকে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা জলপাই নিয়ে আসেন এই হাটে।

হাটের ইজারাদার কাদেরী কিবরিয়া রানা বলেন, ‘এই হাটে প্রতিদিন ১৪০ থেকে ২০০ টন জলপাই কেনাবেচা হয়। সংরক্ষণাগার বা হিমাগার না থাকায় প্রতিদিনের জলপাই সেদিনই দেশের বিভিন্ন স্থানে পাঠাতে হয়। সরকারিভাবে হিমাগার স্থাপন এবং আশপাশের অবৈধ স্থাপনা সরানো হলে হাটটির পরিসর বাড়বে এবং এটি আরও পরিচিতি পাবে।’

দেবীগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মো. নাঈম মোর্শেদ বলেন, দেবীগঞ্জ উপজেলার দেবদারুতলা উত্তরবঙ্গের বৃহত্তম জলপাইয়ের হাট। প্রতিবছর অক্টোবর থেকে জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত এখানে জলপাই কেনাবেচা চলে। এখানকার যোগাযোগব্যবস্থা ভালো হওয়ায় দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পাইকারেরা এই হাটে জলপাই কিনতে আসেন। দেবীগঞ্জ তথা পঞ্চগড়ের অর্থনীতিতে হাটটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

দেবীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ইন্দ্রজিত সাহা বলেন, ‘উত্তরবঙ্গের সর্ববৃহৎ জলপাইয়ের এই হাট সম্প্রসারণের জন্য এখানে থাকা অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের উদ্যোগ নেয়া হবে। এছাড়া এখানে জলপাই উৎপাদন হয়। তাই ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে একটি হিমাগার স্থাপনের বিষয়ে কৃষি মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠাব।’

সংশ্লিষ্টদের মতে, হাটের পরিধি সম্প্রসারণ ও আধুনিক সংরক্ষণব্যবস্থা গড়ে তোলা গেলে কৃষক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, পাইকার ও শ্রমিকদের জন্য নতুন সম্ভাবনা তৈরি হবে। এতে দেবীগঞ্জের জলপাই বাজারের পরিচিতি আরও বাড়ার পাশাপাশি স্থানীয় অর্থনীতিও উপকৃত হবে।

শেয়ার করুন



এ জাতীয় আরো খবর..