একসময় গতি আর দুর্দান্ত ড্রিবলিংয়ে প্রতিপক্ষকে নাস্তানাবুদ করতেন লিওনেল মেসি। কিন্তু বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বদলে গেছে তার খেলার ধরন। এখন আর আগের মতো পুরো মাঠজুড়ে দৌড়ান না আর্জেন্টাইন মহাতারকা। বরং কখন কোথায় দাঁড়াতে হবে, কখন গতি বাড়াতে হবে আর কখন সতীর্থদের দিয়ে কাজ করিয়ে নিতে হবে, সেই কৌশলেই হয়ে উঠেছেন আরও ভয়ংকর। মেসির দুই দশকের ক্যারিয়ারের এই বিবর্তন নিয়ে বিশ্লেষণ করেছেন স্প্যানিশ কনটেন্ট নির্মাতা ও ফুটবল বিশ্লেষক পেদ্রো সায়েজ।
সায়েজের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, পেশাদার ক্যারিয়ারের প্রায় ২০ বছরে মাঠে নিজের ভূমিকা পাঁচবার বদলেছেন মেসি। দলের কৌশলগত প্রয়োজনের পাশাপাশি শারীরিক শক্তির সর্বোত্তম ব্যবহার এবং অপ্রয়োজনীয় পরিশ্রম কমিয়ে আনার বিষয়টিও ছিল এই পরিবর্তনের পেছনে। এর ফলে গতি ও বিস্ফোরক শক্তির ওপর নির্ভরশীল এক উইঙ্গার থেকে ধীরে ধীরে পরিণত হয়েছেন মাঠের কৌশলী সংগঠকে।
বার্সেলোনার জার্সিতে ফ্রাঙ্ক রাইকার্ডের অধীনে মেসির শুরুটা ছিল ডান প্রান্তের উইঙ্গার হিসেবে। দুর্দান্ত গতি, ড্রিবলিং আর একের পর এক প্রতিপক্ষকে কাটিয়ে যাওয়ার ক্ষমতা ছিল তার খেলার প্রধান শক্তি। তখন বার্সেলোনায় রোনালদিনহো ও স্যামুয়েল ইতোদের মতো তারকা থাকায় দলের সব দায়িত্বও ছিল না তার কাঁধে।
ডানপ্রান্তে জায়গা পেয়ে একের পর এক আক্রমণ তৈরি করতেন মেসি। তবে বল হারানোর পর প্রতিপক্ষের কাছ থেকে বল কেড়ে নেয়ার জন্য অতিরিক্ত পরিশ্রম করানোর চেয়ে আক্রমণে তার সৃজনশীলতাকে কাজে লাগানোর দিকেই গুরুত্ব দেন।
মেসির খেলার ধরনে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন আসে ২০০৯ সালে, পেপ গার্দিওলার অধীনে। তাকে ডানপ্রান্ত থেকে সরিয়ে আক্রমণের কেন্দ্রে ‘ফলস নাইন’ হিসেবে খেলানোর সিদ্ধান্ত নেন বার্সেলোনা কোচ।
এই ভূমিকায় মেসি কখনো প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগের সামনে, কখনো মাঝমাঠে নেমে খেলতে শুরু করেন। এতে প্রতিপক্ষের সেন্টারব্যাকদের সামনে তৈরি হতো দ্বিধা, তাকে আটকাতে সামনে এগোবেন, নাকি রক্ষণভাগের অবস্থান ধরে রাখবেন?
জাভি হার্নান্দেজ ও আন্দ্রেস ইনিয়েস্তার নিয়ন্ত্রিত পাসিং ফুটবলের মধ্যে মেসি পেয়ে যান নিজের খেলা সাজানোর আদর্শ পরিবেশ। প্রতিটি মুহূর্তে দৌড়ানোর বদলে প্রতিপক্ষের দুর্বলতা পর্যবেক্ষণ করে সঠিক সময়ে গতি বাড়ানোই হয়ে ওঠে তার প্রধান কৌশল।
২০১৪ সালে লুইস এনরিকের দায়িত্ব নেয়ার পর বার্সেলোনার আক্রমণভাগে গড়ে ওঠে মেসি, নেইমার ও লুইস সুয়ারেজের ঐতিহাসিক ‘এমএসএন’ ত্রয়ী। এই সময়ে মেসির ওপর থেকে রক্ষণাত্মক দায়িত্ব আরও কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন মাঝমাঠের খেলোয়াড়েরা। বিশেষ করে ডানপ্রান্তে ক্রোয়েশিয়ান মিডফিল্ডার ইভান রাকিতিচকে বাড়তি দায়িত্ব নিতে দেখা যায়।
ফলে মেসি আক্রমণ সাজানো, সতীর্থদের গোলের সুযোগ তৈরি এবং নিজে গোল করার দিকে বেশি মনোযোগ দিতে পারেন। বল পুনরুদ্ধার ও রক্ষণ সামলানোর বাড়তি কাজ সতীর্থরা করায় আক্রমণে শক্তি সঞ্চয় করে রাখার সুযোগ পান আর্জেন্টাইন তারকা।
২০১৭ সালে আর্নেস্তো ভালভার্দে বার্সেলোনার দায়িত্ব নেয়ার পর মেসির খেলার ধরনে আরও একটি পরিবর্তন আসে। নেইমার দল ছাড়ার পর নতুন আক্রমণাত্মক কাঠামোয় মেসিকে অনেকটা স্বাধীন ভূমিকা দেয়া হয়। প্রতিপক্ষের বিল্ডআপের সময় নিয়মিত প্রেসিংয়ে অংশ নেয়ার পরিবর্তে তাকে আক্রমণভাগে নিজের অবস্থান ও শক্তি ব্যবহারের স্বাধীনতা দেয়া হয়।
এই সময়ই মাঠে মেসির হেঁটে বেড়ানোর দৃশ্য নিয়ে আলোচনা বাড়তে থাকে। বাইরে থেকে অনেকের কাছে সেটি নিষ্ক্রিয়তা মনে হলেও বিশ্লেষকদের মতে, এর পেছনে ছিল প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগ পর্যবেক্ষণের কৌশল। বলের বাইরে থাকাকালে তিনি প্রতিপক্ষের অবস্থান, ফাঁকা জায়গা ও দুর্বলতা বোঝার চেষ্টা করতেন। এরপর সুযোগ বুঝে হঠাৎ গতি বাড়িয়ে আক্রমণে জড়াতেন।
মেসির এই বিবর্তনের শেষ ধাপ পূর্ণতা পায় লিওনেল স্কালোনির অধীনে আর্জেন্টিনা জাতীয় দলে। দলের কৌশল সাজানোর সময় কোচিং স্টাফ বুঝতে পেরেছিল, মেসির সেরাটা পেতে হলে তাকে ঘিরে এমন একটি দল গড়তে হবে, যারা মাঠজুড়ে পরিশ্রমের বড় অংশ সামলাবে। রদ্রিগো দি পল, এনজো ফার্নান্দেজ ও অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টারদের মতো মিডফিল্ডাররা দৌড়ানো, প্রেসিং ও বল পুনরুদ্ধারের দায়িত্ব পালন করেন। এতে মেসি নিজের শক্তি ব্যয় করতে পারেন আক্রমণ সাজানো, নিখুঁত পাস দেয়া এবং গোলের সুযোগ কাজে লাগানোর কাজে।
এর সুফল দেখা যায় ২০২২ কাতার বিশ্বকাপেও। আর্জেন্টিনাকে বিশ্বকাপ জেতাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন মেসি। বয়স বাড়লেও প্রতিযোগিতামূলক ফুটবলে তার প্রভাব ধরে রাখার পেছনে এই কৌশলগত পরিবর্তন বড় ভূমিকা রেখেছে।
মেসির এই যাত্রা দেখিয়েছে, ফুটবলে সব সময় বেশি দৌড়ানোই শ্রেষ্ঠত্বের মাপকাঠি নয়। কখন দৌড়াতে হবে, কোথায় জায়গা নিতে হবে এবং কীভাবে সতীর্থদের কাজে লাগাতে হবে; সেই বুদ্ধিমত্তাও একজন খেলোয়াড়কে দীর্ঘদিন বিশ্বসেরাদের কাতারে রাখতে পারে।
এ জাতীয় আরো খবর..