✕
নিউজ ডেস্ক
প্রকাশ :- ২০২৬-১০-২৯, | ১৩:৩০:১৯ |ইসরায়েলের সাধারণ নির্বাচনের আংশিক ফলাফলে এগিয়ে রয়েছেন দীর্ঘদিনের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। তবে প্রতিদ্বন্দ্বী গাদি আইজেনকোটের তুলনায় এগিয়ে থাকলেও পার্লামেন্টে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন থেকে পিছিয়ে রয়েছে তার জোট। ফলে দেশটিতে পরবর্তী সরকার গঠন নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। ব্রিটিশ বার্তাসংস্থা বিবিসির এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানা যায়।
বুধবার ৮৫ শতাংশ ভোট গণনা শেষে দেখা গেছে, নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টি এবং তাদের উগ্র ডানপন্থী ও অতি-রক্ষণশীল ইহুদি মিত্ররা পার্লামেন্টের ১২০টি আসনের মধ্যে ৫৩টি পেতে পারে। অন্যদিকে, সাবেক সামরিক প্রধান গাদি আইজেনকোটের ইয়াশার পার্টি এবং তার জোটের আরও তিনটি ইহুদি বিরোধী দল মিলিয়ে ৪৮টি আসন পেতে পারে।
সরকার গঠনের জন্য উভয় নেতাকেই এখন জোট সম্প্রসারণের চেষ্টা করতে হবে। এ ক্ষেত্রে আরব নেতৃত্বাধীন দলগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। দলগুলো সম্মিলিতভাবে রেকর্ড ১৯টি আসন পেতে যাচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে ইহুদি দলগুলোর মধ্যে মাত্র একটি ছাড়া বাকিরা আরব দলগুলোর সঙ্গে জোট গঠনে অনাগ্রহের কথা জানিয়েছে।
এখনো সেনাসদস্য, কূটনীতিক ও হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রোগীদেরসহ বিভিন্ন শ্রেণির ভোটারদের দেওয়া ৪ লাখ ৩০ হাজার থেকে ৪ লাখ ৮০ হাজার অনুপস্থিত ভোট গণনা বাকি রয়েছে। ফলে চূড়ান্ত ফলাফল পেতে আরও এক থেকে দুই দিন লাগতে পারে।
চূড়ান্ত ফল নিশ্চিত হওয়ার পর প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগ সব রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আলোচনা করবেন। এরপর যাকে সরকার গঠনের সবচেয়ে বেশি সম্ভাবনাময় মনে হবে, তাকে সরকার গঠনের দায়িত্ব দেবেন তিনি। পুরো প্রক্রিয়ায় কয়েক সপ্তাহ লেগে যেতে পারে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কেউ সরকার গঠনে ব্যর্থ হলে নতুন নির্বাচন আয়োজনের প্রয়োজন হতে পারে।
মঙ্গলবারের নির্বাচনে ৭৭ দশমিক ৭ শতাংশ ভোটার অংশ নিয়েছেন, যা দুই দশকেরও বেশি সময়ের মধ্যে দেশটির সর্বোচ্চ ভোটদানের হার। বুধবার জেরুজালেমে নিজের বাসভবনে এক বৈঠকে এই অংশগ্রহণের প্রশংসা করেন প্রেসিডেন্ট হারজগ। আগামী সপ্তাহে আনুষ্ঠানিক ফল পাওয়ার পর রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা শুরু করবেন বলেও জানান তিনি। একই সঙ্গে আরেকটি নির্বাচন এড়াতে সব পক্ষকে খোলা মন নিয়ে আলোচনায় বসার আহ্বান জানান।
নির্বাচনের প্রাথমিক বুথফেরত জরিপে আইজেনকোটের ‘চেঞ্জ ব্লক’ নেতানিয়াহুর জোটের চেয়ে এগিয়ে থাকার আভাস পাওয়া গিয়েছিল। তবে পরবর্তী সময়ে জরিপের হিসাব পরিবর্তিত হয়। শেষ পর্যন্ত ভোট গণনার অগ্রগতিতে নেতানিয়াহুর জোটের অবস্থান প্রত্যাশার চেয়ে ভালো দেখা যায়। যদিও আগের পার্লামেন্টে জোটটির নিয়ন্ত্রণে থাকা আসনের তুলনায় এবার তাদের আসন ১৫টি কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
আইজেনকোট নির্বাচনের পর দাবি করেন, জনগণ পরিবর্তনের পক্ষে রায় দিয়েছে। অন্যদিকে নেতানিয়াহু তার ডানপন্থী জোটের জয়কে বড় সাফল্য হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, ইসরায়েলের নিরাপত্তা বিপন্ন হতে পারে এমন কোনো আরব দলনির্ভর সরকার গঠন করা উচিত নয়।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের নেতৃত্বাধীন হামলার পর এটিই ইসরায়েলের প্রথম সাধারণ নির্বাচন। ওই হামলায় প্রায় ১ হাজার ২০০ জন নিহত এবং ২৫১ জন জিম্মি হয়েছিলেন। এরপর গাজা, লেবানন ও ইরানকে ঘিরে সংঘাত ও যুদ্ধ ইসরায়েলের রাজনীতিতে বড় প্রভাব ফেলেছে।
নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুগুলোর মধ্যে ছিল ৭ অক্টোবরের নিরাপত্তাব্যর্থতার জবাবদিহি, আঞ্চলিক যুদ্ধ পরিচালনা, অতি-রক্ষণশীল ইহুদি পুরুষদের সামরিক বাহিনীতে বাধ্যতামূলক নিয়োগ, বিচারব্যবস্থার সংস্কার এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইসরায়েলের অবস্থান।
ভোটারদের মধ্যেও নেতানিয়াহুর নেতৃত্ব নিয়ে মতভেদ স্পষ্ট হয়েছে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেটের বিরোধী দলকে ভোট দেওয়া কাফর সাবার বাসিন্দা আভিগাইল লেভিন নতুন নেতৃত্বের আশা করেছিলেন বলে জানান। তার মতে, ৭ অক্টোবরের হামলার সময় যারা ক্ষমতায় ছিলেন, তাদের আর ক্ষমতায় থাকা উচিত নয়।
অন্যদিকে, নেতানিয়াহুকে ভোট দেওয়া রামাত গানের বাসিন্দা গাল বলেন, প্রতিবেশীদের সঙ্গে শান্তিতে বসবাসের বিষয়ে তিনি আশাবাদী হতে পারছেন না। একই সঙ্গে আরব রাজনৈতিক দলগুলোর শক্তি বৃদ্ধি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি।
নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগও উঠেছে। বুধবার লিকুদ পার্টি দাবি করে, ঘুষ, হুমকি, সহিংসতা, জালিয়াতি এবং নিষিদ্ধ সফটওয়্যার ব্যবহার করে ভোটারদের প্রভাবিত করা হয়েছে। তবে দলটি অভিযোগের পক্ষে কোনো প্রমাণ দেয়নি। দেশটির কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিটি জানিয়েছে, নির্বাচনের পর্যালোচনার অংশ হিসেবে অভিযোগগুলো খতিয়ে দেখা হবে।
এদিকে, আরব নেতৃত্বাধীন ইউনাইটেড আরব লিস্ট ও জয়েন্ট লিস্টের আসন প্রায় দ্বিগুণ হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। ইসরায়েলের মোট জনসংখ্যার প্রায় এক-পঞ্চমাংশ আরব নাগরিক। তাদের মধ্যে অনেকে নিজেদের ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত ইসরায়েলি নাগরিক হিসেবে পরিচয় দেন।
আরব ভোটারদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধিকে ঐতিহাসিক বলে অভিহিত করেছেন হাইফার কাছের একটি গ্রামের বাসিন্দা মাহদি কাবাহা। জয়েন্ট লিস্টের নেতা ইউসেফ জাবারিনের মতে, উগ্র ডানপন্থী জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গভিরকে ক্ষমতা থেকে সরানোর আকাঙ্ক্ষাও আরব ভোটারদের উৎসাহিত করেছে।
অন্যদিকে, ইউনাইটেড আরব লিস্টের নেতা মানসুর আব্বাস আশা প্রকাশ করেছেন, চেঞ্জ ব্লক ও তার দল একসঙ্গে ৬১টি আসনের সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারবে। বামপন্থী ডেমোক্র্যাটস পার্টির নেতা ইয়ার গোলানও আইজেনকোটের জোটকে আরব দলগুলোর সঙ্গে অংশীদারত্বের ভিত্তিতে পরিবর্তনের সরকার গঠনের আহ্বান জানিয়েছেন।
তবে আরব দলগুলোর সঙ্গে জোট গঠনের বিষয়ে আইজেনকোটের আগের অবস্থান ও শর্ত রয়েছে। ইসরায়েলকে ইহুদি ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া এবং হামাসকে ধ্বংস করতে হবে এমন শর্তের কথা তিনি আগে উল্লেখ করেছেন। তার জোটের ডানপন্থী দলগুলোও আরব দলগুলোর সঙ্গে অংশীদারত্বের বিরোধিতা করছে।
জয়েন্ট লিস্টের নেতা জাবারিন বলেছেন, ইসরায়েলের বিরোধী দলগুলো যদি সত্যিকারের পরিবর্তন এবং উগ্র ডানপন্থী সরকারের বিকল্প চায়, তবে তাদের আরব দলগুলোর সঙ্গে আলোচনায় বসতে হবে।
সব মিলিয়ে, নির্বাচনে নেতানিয়াহুর জোট এগিয়ে থাকলেও সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পাওয়ায় ইসরায়েলের পরবর্তী সরকার কারা গঠন করবে, তা এখনো অনিশ্চিত। আরব দলগুলোর সমর্থন নেওয়া হবে কি না, সেই সিদ্ধান্তই সরকার গঠনের সমীকরণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।