✕
নিউজ ডেস্ক
প্রকাশ :- ২০২৬-১০-২৩, | ১৩:০৮:২১ |বলিউডে একের পর এক তারকাকে নিশানা করার ছক কষছে অপরাধী চক্র। সম্প্রতি টাইগার শ্রফের গাড়িতে গুলির ঘটনার তদন্তে সামনে আসছে এমন কিছু তথ্য, যা নতুন করে উদ্বেগ বাড়িয়েছে বলিউড অঙ্গনে। তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, হামলাকারীরা প্রথমে সালমান খানের বাড়ির আশপাশে নজরদারি চালিয়েছিলেন। কিন্তু কড়া নিরাপত্তার কারণে পরিকল্পনা বদলে টাইগারকে নিশানা করা হয়। তবে তারা পরিকল্পনা বদলেছিলেন কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়।
শুধু সালমান নন, আমির খান ও রণবীর সিংয়ের বাড়ির আশপাশেও সন্দেহভাজনদের যাতায়াতের তথ্য পেয়েছে পুলিশ। এমনকি গুগলে তারকাদের বাড়ির ঠিকানা খুঁজে বের করার বিষয়টিও তদন্তে উঠে এসেছে।
গত ১৮ অক্টোবর মুম্বাইয়ের জুহু এলাকায় টাইগার শ্রফের গাড়ি লক্ষ্য করে গুলির ঘটনা ঘটে। ফুটবল খেলে ফেরার সময় অভিনেতার গাড়িতে হামলা চালায় মোটরসাইকেলে আসা দুর্বৃত্তরা। টাইগার অক্ষত থাকলেও তার গাড়িচালক ও এক অটোরিকশাচালক আহত হন। ঘটনার পর মোটরসাইকেলে পালিয়ে যায় হামলাকারীরা।
এ ঘটনায় তদন্তে নেমে মুম্বাই পুলিশ একাধিক রাজ্যে অভিযান চালায়। বৃহস্পতিবার পর্যন্ত ১০ জনকে গ্রেফতারের খবর পাওয়া যায়। তাদের মধ্যে সন্দেহভাজন তিন হামলাকারী রেহান আনসারি, ফুল সিং ও ঋত্বিককে ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত পুলিশি হেফাজতে পাঠানো হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রথম পছন্দ সালমান, পরে বদলে যায় পরিকল্পনা
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি ও ইন্ডিয়া টুডের প্রতিবেদন অনুযায়ী, মুম্বাইয়ে পৌঁছে সন্দেহভাজন ব্যক্তিরা প্রথমে সালমান খানের বান্দ্রার গ্যালাক্সি অ্যাপার্টমেন্টের আশপাশে গিয়েছিলেন। সেখানে পুলিশ ও সশস্ত্র নিরাপত্তারক্ষীদের উপস্থিতি দেখে তাঁরা অন্য কাউকে নিশানা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন কি না, তা খতিয়ে দেখছেন তদন্তকারীরা।
এরপর তাদের নজর পড়ে টাইগার শ্রফের ওপর। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত ভিডিও ও বিভিন্ন পোস্ট থেকে অভিনেতার নিয়মিত ফুটবল খেলার সময় এবং স্থান সম্পর্কে ধারণা নেওয়া হয়েছিল বলে তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।
‘টাইমস অব ইন্ডিয়া’র প্রতিবেদন অনুযায়ী, হামলার অন্তত ১০ দিন আগে থেকেই জুহুর ওই মাঠের আশপাশে নজরদারি চালানো হয়েছিল। ১১ অক্টোবরও সেখানে গিয়েছিলেন সন্দেহভাজন ব্যক্তিরা। কিন্তু সেদিন টাইগার মাঠে না আসায় হামলার পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হয়নি বলে ধারণা করা হচ্ছে। পরে ১৮ অক্টোবর তার গাড়িতে গুলি চালানো হয়। তবে সালমানই হামলাকারীদের মূল লক্ষ্য ছিলেন কি না, সে বিষয়ে এখনো নিশ্চিত কোনো বক্তব্য দেয়নি পুলিশ।
গুগলে খোঁজ, এরপর তারকাদের বাড়ির আশপাশে ঘোরাঘুরি
তদন্তে সবচেয়ে উদ্বেগজনক যে তথ্যটি সামনে এসেছে, তা হলো-সন্দেহভাজন ব্যক্তিরা গুগলে তারকাদের বাড়ির ঠিকানা খুঁজতেন। এরপর অটোরিকশা কিংবা মোটরসাইকেলে সংশ্লিষ্ট এলাকাগুলোতে যেতেন বলে তদন্তকারীদের ধারণা।
‘দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, সালমান ছাড়াও আমির খান ও রণবীর সিংয়ের বাড়ির আশপাশে তাদের যাতায়াতের তথ্য পাওয়া গেছে। এসব তারকাকে হামলার লক্ষ্য হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছিল, নাকি অন্য কোনো কারণে তাঁদের বাড়ির আশপাশে গিয়েছিলেন সন্দেহভাজনরা তা যাচাই করছে পুলিশ।
এই তথ্য সামনে আসার পর বলিউডের তারকাদের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। তবে একাধিক তারকার বাড়ির আশপাশে সন্দেহভাজনদের যাতায়াতের তথ্য পাওয়া গেলেও তাদের সবাইকে আক্রমণের পরিকল্পনা ছিল, এমনটা এখনো নিশ্চিত নয়।
অস্ত্র ও অর্থের জোগানদাতা কারা
হামলার নেপথ্যে অস্ত্র সরবরাহ ও অর্থ লেনদেনের একটি চক্রের সন্ধান পাওয়ার কথা জানিয়েছে পুলিশ। ‘দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, অমৃতসর থেকে সংগ্রহ করা একটি আগ্নেয়াস্ত্র দিল্লিতে নেওয়া হয়। পরে রাধা ভার্মা ও ববিতা রাও নামের দুই নারী সেটি মুম্বাইয়ে পৌঁছে দেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
তদন্তকারীদের দাবি, অস্ত্র সরবরাহের পুরো প্রক্রিয়ায় জড়িত ব্যক্তিদের মধ্যে যোগাযোগ সীমিত রাখার চেষ্টা করা হয়েছিল, যাতে কেউ অন্যদের পরিচয় জানতে না পারেন। অর্থের উৎসও খতিয়ে দেখছেন তদন্তকারীরা।
‘টাইমস অব ইন্ডিয়া’র প্রতিবেদন অনুযায়ী, হামলাকারী ও তাদের সহযোগীদের কাছে প্রায় দুই লাখ রুপি পৌঁছানোর তথ্য পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ২৫ হাজার রুপিতে একটি পুরোনো মোটরসাইকেল কেনা হয়েছিল বলে পুলিশের দাবি।
অর্থের কিছু অংশ ডিজিটাল লেনদেনের মাধ্যমে পাঠানো হয় বলেও জানা গেছে। হামলায় ব্যবহৃত অস্ত্র ফেলে দেওয়া হয়েছে বলে সন্দেহ করছে পুলিশ। সেগুলো উদ্ধারের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মুঠোফোন ও যোগাযোগের তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা চলছে।
বিষ্ণোই গ্যাংয়ের যোগসূত্র নিয়ে তদন্ত
এই ঘটনার সঙ্গে লরেন্স বিষ্ণোই গ্যাংয়ের কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা-ও খতিয়ে দেখছে পুলিশ। অনিল পণ্ডিত নামের এক ব্যক্তির সম্ভাব্য ভূমিকা তদন্তের আওতায় এসেছে। তার সঙ্গে বিষ্ণোই গ্যাংয়ের যোগাযোগ রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এ ছাড়া গ্যাংটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হিসেবে পরিচিত শুভম লোঙ্কারের নামও আলোচনায় এসেছে।
টাইগারের গাড়িতে গুলির ঘটনার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে একটি অডিও বার্তা। সেখানে নিজেকে অনিল পণ্ডিত পরিচয় দেওয়া এক ব্যক্তি হামলার দায় স্বীকার করেন বলে দাবি করা হয়। একইসঙ্গে সালমানের সঙ্গে কাজ করা ব্যক্তিদেরও হুমকি দেওয়া হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে অডিও বার্তাটির সত্যতা ও বক্তার পরিচয় স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। ফলে এ ঘটনার সঙ্গে বিষ্ণোই গ্যাংয়ের সংশ্লিষ্টতা এখনো তদন্তের বিষয়।
সালমানের বাড়িতে বাড়তি নিরাপত্তা
নতুন তথ্য সামনে আসার পর সালমান খানের নিরাপত্তা আরও জোরদার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে এনডিটিভি। তার গ্যালাক্সি অ্যাপার্টমেন্টের বাইরে অত্যাধুনিক সাবমেশিনগানসহ বিশেষ কমান্ডো মোতায়েন করা হয়েছে। বাড়ির আশপাশেও বাড়ানো হয়েছে নজরদারি।
সালমান আগে থেকেই ওয়াই-প্লাস নিরাপত্তা পান। তার চলাচলের সময় সশস্ত্র পুলিশ সদস্যরা সঙ্গে থাকেন। কোনো অনুষ্ঠানে অংশ নিলে সংশ্লিষ্ট এলাকার পুলিশও বাড়তি নিরাপত্তার ব্যবস্থা করে।
এর আগেও, একাধিকবার হুমকির মুখে পড়েছেন এই অভিনেতা। ২০২৪ সালের ১৪ এপ্রিল বান্দ্রায় তাঁর বাড়ির বাইরে গুলি চালানো হয়। একই বছরের ১২ অক্টোবর মুম্বাইয়ে গুলিতে নিহত হন সালমানের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত মহারাষ্ট্রের সাবেক মন্ত্রী বাবা সিদ্দিকি। এসব ঘটনায় বিষ্ণোই গ্যাংয়ের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ উঠেছিল।
বলিউডজুড়ে আতঙ্ক
টাইগার শ্রফের গাড়িতে গুলির ঘটনার আগেও চলচ্চিত্র নির্মাতা রোহিত শেঠির বাড়িতে গুলিবর্ষণ এবং অভিনেতা রণবীর সিংকে চাঁদা চেয়ে হুমকি দেওয়ার অভিযোগ সামনে এসেছিল। এবার একাধিক তারকার বাড়ির আশপাশে সন্দেহভাজনদের যাতায়াতের তথ্য পাওয়ায় উদ্বেগ আরও বেড়েছে।
অভিনেতা মনোজ বাজপেয়ীও এ পরিস্থিতি নিয়ে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। তার মতে, চলচ্চিত্রজগৎ দীর্ঘদিন ধরেই অপরাধী চক্রের সহজ লক্ষ্য হয়ে রয়েছে। তবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিচ্ছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
টাইগার শ্রফের গাড়িতে গুলি চালানো কি কেবল একটি বিচ্ছিন্ন হামলা, নাকি এর পেছনে রয়েছে বলিউডের একাধিক তারকাকে ঘিরে আরও বড় কোনো পরিকল্পনা? অস্ত্রের উৎস, অর্থের লেনদেন, সন্দেহভাজনদের যোগাযোগ এবং তারকাদের বাড়ির আশপাশে তাদের যাতায়াতের কারণ অনুসন্ধান করে সেই উত্তর খুঁজছে মুম্বাই পুলিশ।
সূত্র: টাইমস অব ইন্ডিয়া, দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস, এনডিটিভি, ইন্ডিয়া টুডে