✕
নিউজ ডেস্ক
প্রকাশ :- ২০২৬-১০-২২, | ১২:৪০:০০ |ফ্রান্সের রাজপথ যখন কয়েক লাখ বিক্ষোভকারীর পদচারণায় উত্তাল এবং প্যারিসসহ দেশটির একাধিক নগরী আগুনের লেলিহান শিখা ও সংঘর্ষে লণ্ডভণ্ড, ঠিক তখনই ইউরোপজুড়ে এক নতুন বিদ্রোহের সলতে পাকানো হচ্ছে। রাজপথের এই রাজনৈতিক নাটক এখন পুরো ইউরোপ মহাদেশ জুড়ে এক বিশাল বিদ্রোহ ছড়িয়ে দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। গত সপ্তাহে আনুমানিক পাঁচ লাখ বিক্ষোভকারী ফ্রান্সের রাস্তায় নেমে আসার পর দেশটির পরিস্থিতি এখন চরম উত্তপ্ত।
এর মধ্যেই ফরাসি আন্দোলনকারীরা তাদের সমর্থকদের আগামী ২৪ অক্টোবর আবারও রাজপথে নেমে আসার ডাক দিয়েছে। এই নতুন আন্দোলনটির নামকরণ করা হয়েছে আক্ত দ্যু’। পরিকল্পনা অনুযায়ী ডিজিটাল মানচিত্র ব্যবহার করে পুরো অঞ্চলজুড়ে ইতোমধ্যে প্রায় ২১২টি ভিন্ন ভিন্ন স্থান নির্ধারণ করা হয়েছে। শুধু তা-ই নয়, আগামী ২০ নভেম্বর, শুক্রবার একটি সমন্বিত ইউরোপীয় যুব ধর্মঘটের যে আহ্বান জানানো হয়েছে, তাতে সাড়া দিচ্ছে কমিউনিস্ট, সোশ্যালিস্ট ও উগ্র-বামপন্থী সংগঠনগুলোর এক ক্রমবর্ধমান জোট।
ফক্স নিউজ ডিজিটালের একটি বিশেষ অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে যে, ইউরোপজুড়ে ছড়িয়ে পড়া এই বিক্ষোভ পরিচালনা, আয়োজন ও গতি প্রদান করার পেছনে কাজ করছে একটি বিশালাকার আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক। পূর্ববর্তী তথ্যে যেখানে ৫৪টি সংগঠনের নাম উঠে এসেছিল, সেখানে নতুন অনুসন্ধানে যুক্তরাষ্ট্রসহ মোট ৯টি দেশজুড়ে বিস্তৃত ১০১টি সংগঠনের সন্ধান পাওয়া গেছে, যা প্রতিনিয়ত প্রসারিত হচ্ছে। এই সংগঠনগুলোর একটি বড় অংশই বয়স্কদের দ্বারা পরিচালিত; এর মধ্যে মাত্র ৩৩টি সংগঠন মূলত শিক্ষার্থী বা তরুণদের দ্বারা চালিত হচ্ছে। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এই পুরো নেটওয়ার্কটি মূলত এক 'লাল-সবুজ' বা ‘রেড-গ্রিন’ অক্ষের প্রতিনিধিত্ব করছে। লাল রঙের প্রতীক দিয়ে বামপন্থী, কমিউনিস্ট ও সোশ্যালিস্ট দলগুলোকে বোঝানো হচ্ছে এবং সবুজ রঙের প্রতীক দিয়ে উগ্র-ইসলামপন্থী বা ইসলামিক সংগঠনগুলোকে নির্দেশ করে তাদের এই সমন্বিত অক্ষ গঠিত হয়েছে।
এই জোটের মধ্যে এমন সব সংগঠনও জড়িয়ে রয়েছে যারা সগর্বে 'অ্যান্টিফা' বা 'অ্যান্টি-ফ্যাসিস্ট' নাম ব্যবহার করে থাকে। যেমন আঙ্কুলেম অঞ্চলে 'অ্যাক্ট টু'-এর যে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা জারি করা হয়েছে, সেখানে 'অ্যাকশন অ্যান্টিফা সিক্সটিন' নামক একটি সংগঠন নিজেদের সুস্পষ্টভাবে প্রকাশ করেছে। আটলান্টিক মহাসাগরের অপর পাড়ে, যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে বসেই ‘ক্যাওস ইনকর্পোরেটেড’-এর মার্কিন ফ্র্যাঞ্চাইজির শীর্ষ নেতারা ইউরোপের এই অস্থিরতাকে আরও ছড়িয়ে দিতে কাজ করছেন। ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয় বার্কলের অধ্যাপক এবং 'স্টুডেন্টস ফর জাস্টিস ইন প্যালেস্টাইন' ও 'আমেরিকান মুসলিমস ফর প্যালেস্টাইন'-এর মতো ইসরায়েল-বিরোধী সংগঠনগুলোর প্রতিষ্ঠাতা হাতেম বাজিয়ান ফ্রান্সের সহিংস আন্দোলনের বিভিন্ন ভিডিও চিত্র সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দিচ্ছেন।
এই জটিল ‘লাল-সবুজ’ আঁতাতের নতুন সমীকরণ উন্মোচন করতে গিয়ে বাজিয়ান গত ১৭ অক্টোবরের প্যারিস দাঙ্গা, ২০২৩ সালের ১৭ অক্টোবরে গাজার আল-আহলি হাসপাতালে ভয়াবহ বিস্ফোরণ এবং ১৯৬১ সালের ১৭ অক্টোবরে ফরাসি পুলিশের সাথে আলজেরীয় বিক্ষোভকারীদের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের মধ্যে একটি ঐতিহাসিক যোগসূত্র টানার চেষ্টা করেছেন।
ইউরোপের এই চলমান অস্থিরতাকে কমিউনিস্ট-বান্ধব এক বিশাল আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্কও প্রবল সহানুভূতি ও প্রচার জোগাচ্ছে। ব্রেকথ্রু নিউজ, কোডপিংক এবং পার্টি ফর সোশ্যালিজম অ্যান্ড লিবারেশন-এর মতো উগ্র-বামপন্থী প্ল্যাটফর্মগুলো এই প্রচারে নেতৃত্ব দিচ্ছে। এই মাধ্যমগুলোর নেপথ্যে রয়েছেন সাংহাইভিত্তিক মার্কিন প্রযুক্তি ধনকুবের নেভিল রয় সিংহাম, যিনি চীন ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের ‘নতুন বিশ্বব্যবস্থা’ ধারণার অনুসারী হিসেবে পরিচিত। ব্রেকথ্রু নিউজ তাদের একটি অনলাইন আলোচনার শিরোনাম দিয়েছে 'ইউরোপস ইউথ রাইজিং' বা ‘ইউরোপের যুব সমাজের অভ্যুত্থান’। এই মাধ্যমটির স্পষ্ট বার্তা, ইউরোপজুড়ে এখন বিদ্রোহের এক নতুন ঝড় বইছে।
ব্রেকথ্রু নিউজ তাদের এক বার্তায় জোর দিয়ে বলেছে, ফ্রান্সের শিক্ষার্থীদের তৈরি ব্যারিকেড, স্পেনের আবাসন সংকটবিরোধী ক্যাম্প, কিংবা জ্যারেড কুশনারের প্রকল্প থেকে নিজেদের উপকূল রক্ষায় আলবেনীয়দের প্রতিবাদ—সব মিলিয়ে জেন-জি বা নতুন প্রজন্ম এখন অর্থনৈতিক কঠোরতা, লাগামহীন বাড়িভাড়া এবং সরকারের অস্ত্র ও যুদ্ধের পেছনে অর্থ ঢালার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াচ্ছে। তারা প্যারিস, মাদ্রিদ, লিসবন থেকে শুরু করে তিরানা পর্যন্ত প্রতিবাদের আগুন ছড়িয়ে পড়ার কথা নিশ্চিত করেছে। এ বিষয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিতে ফ্রান্সভিত্তিক সাংবাদিক রাফায়েল কারুবি এই আলোচনার বিশেষ পর্বে যুক্ত হচ্ছেন।
ফ্রান্সের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি বিশ্লেষণে দেখা যায়, আন্দোলনকারীরা ‘১৭অক্টোবরজিলেজোনে ডট নেট’ নামক একটি ওয়েবসাইট ব্যবহার করে তাদের কৌশলগত সহায়তা, যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং জনবল প্রস্তুত করছে। অনলাইন রেকর্ড অনুযায়ী, গত ১৫ সেপ্টেম্বর কোনো এক অজ্ঞাতপরিচয় ব্যবহারকারী এই ডোমেইনটি নিবন্ধন করেছিলেন। ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ যখন রাজপথে কারফিউ জারি ও কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে আন্দোলন দমনের চেষ্টা করছেন, তখন আন্দোলনকারীরা ওয়েবসাইটে নতুন দাবি তুলে ধরেছে—‘ম্যাক্রোঁকে অবশ্যই পদত্যাগ করতে হবে এবং জনগণের জন্য পথ ছেড়ে দিতে হবে!’ শুধু ওয়েবসাইটই নয়, আন্দোলনকারীরা টেলিগ্রাম মেসেজিং চ্যানেলে বিশাল নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছে, যেখানে তারা নানা কৌশলগত বিবরণ এবং পেশাদারভাবে তৈরি গ্রাফিক্স শেয়ার করছে।
সামনে একের পর এক কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়েছে। আগামী ২৪ অক্টোবরের 'অ্যাক্ট টু'-এর পর তারা ৩১ অক্টোবরের জন্য পরিকল্পনা করেছে 'অ্যাক্ট থ্রি'। এই পর্বে পুরো ফ্রান্সজুড়ে ইয়েলো ভেস্ট বা ‘হলুদ কায়া’ পরিহিত বিক্ষোভকারীরা রাস্তা ও মোড় গোলচত্বরগুলো অচল করে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। পরবর্তীতে আগামী ৫ নভেম্বর এবং ১৪ নভেম্বরেও একাধিক আন্দোলনের সূচি রয়েছে। ক্ষেত্রবিশেষে এই আন্দোলনের পরিকল্পনা আরও দীর্ঘমেয়াদী করা হয়েছে; এমনকি ২০২৭ সালের ৩ এপ্রিল 'নয়েজি স্প্রিং' এবং ২৭ মে 'ডে অ্যাগেইনস্ট অ্যাগ্রোকেমিস্ট্রি' শিরোনামে আন্দোলন ডাকার পরিকল্পনা পাওয়া গেছে, যার ভৌগোলিক অবস্থান হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে ‘পুরো ফ্রান্সজুড়ে’।
আগামী ২০ নভেম্বরের আন্তর্জাতিক আন্দোলনের জন্য উগ্র-বামপন্থী সংগঠনগুলো তাদের নিজস্ব ওয়েবসাইটে 'আন্তর্জাতিক যুব ধর্মঘট'-এর জোরালো ডাক দিয়েছে। সেখানে সরাসরি বিক্ষোভ, ওয়াকআউট, সমাবেশ, ঘেরাও ও স্থান দখলের মতো কঠোর পদক্ষেপের আহ্বান জানানো হয়েছে। আন্দোলনকারীদের ম্যানিফেস্টো বা ইশতেহারে স্পষ্ট ভাষায় বলা হয়েছে, শ্রমিকদের শোষণ, জলবায়ু বিপর্যয় এবং যুদ্ধ কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং এগুলো পুঁজিবাদী ব্যবস্থারই মূল নির্যাস। এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে তারা জানিয়েছে, সামরিকীকরণ, নতুন করে অস্ত্র প্রতিযোগিতা, অর্থনৈতিক কঠোরতা এবং সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে তাদের লড়াই কোনো পৃথক বিষয় নয়; বরং এই অর্থ ব্যবস্থার বিরুদ্ধে লড়াই করতে হলে পুরো ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন আনতে হবে।
যুক্তরাজ্যভিত্তিক সংগঠন 'সোশ্যালিস্ট স্টুডেন্টস', যারা নিজেদের সমাজতান্ত্রিক পরিবর্তনের লড়াই হিসেবে দাবি করে, তারা জানিয়েছে যে ইউরোপের অন্তত ৩০টি যুব ও শিক্ষার্থী সংগঠনের সাথে সমন্বয় করে তারা আগামী ২০ নভেম্বরের এই আন্তর্জাতিক ধর্মঘটে অংশ নেবে। সোশ্যালিস্ট স্টুডেন্টসের একটি বিশেষ বিজ্ঞপ্তিতে তরুণদের এই সমাজতান্ত্রিক পরিবর্তনের আন্দোলনে যোগ দেওয়ার উদাত্ত আহ্বান জানানো হয়েছে। তাদের মতে, মার্ক্সবাদের ওপর ভিত্তি করেই সমাজতন্ত্রের এই লড়াই এবং তরুণ ও শ্রমিকদের এই যুদ্ধক্ষেত্রে সক্রিয়ভাবে লড়াই চালিয়ে যেতে হবে। অনলাইন রেকর্ড অনুযায়ী, 'ইউথস্ট্রাইক ডট অর্গ' ডোমেইনটি গত ২ আগস্ট এক অজ্ঞাত ব্যক্তি নিবন্ধিত করেন। ফরাসি উচ্চবিদ্যালয় ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বর্তমানে যখন ক্লাসরুমের অপ্রতুলতা, শিক্ষক সংকট ও অবকাঠামোগত জরাজীর্ণতার অভিযোগে রাজপথে নেমেছে, তখন সেখানে ফিলিস্তিনি পতাকা ও ব্যানার হাতে নিয়ে আন্দোলনকে রাজনৈতিক রূপ দেওয়ার নানা চিত্রও দেখা গেছে।
সূত্র: ফক্স নিউজ