✕

সর্বশেষ :
হরমুজে ইরানের নতুন চাল, বিপাকে যুক্তরাষ্ট্র ও উপসাগরীয় দেশগুলো সুপ্রিম কোর্টের ছুটির সংস্কৃতি বিচার ব্যবস্থায় প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছে : অ্যাটর্নি জেনারেল পাবনায় হাসপাতালে প্রসবের পর দুই নবজাতকের মৃত্যু, অবহেলার অভিযোগ জুলাই গণঅভ্যুত্থানের স্মৃতি সংরক্ষণে শিল্পীদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে : সংস্কৃতিমন্ত্রী বিনিয়োগ ও ব্লু ইকোনমি নিয়ে নেদারল্যান্ডসের সঙ্গে ফলপ্রসূ আলোচনা: মাহ্দী আমিন আন্দোলনের মাঝেই যন্তর মন্তরে বিক্ষোভ নিষিদ্ধ করল দিল্লি পুলিশ হুতিদের হামলায় আতঙ্কিত সৌদি যুবরাজ, বাংকারে আশ্রয়ের খবর লালমনিরহাটে স্কুলছাত্রীকে ধর্ষণ মামলায় আসামির যাবজ্জীবন অনিয়মিত অভিবাসন রোধে একযোগে কাজ করতে সম্মত বাংলাদেশ ও ইইউ তাজমিনের পোশাক ও মোবাইল পরীক্ষার জন্য যাচ্ছে সিআইডিতে

তুরস্কের বাজারে বাংলাদেশের পাটের চাহিদা: কাজে লাগাতে হবে যত্নের সাথে

লেখক: মো. মুখলেছুর রহমান, অর্থনীতিবিদ, আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও মানবাধিকার কর্মী

  • নিউজ ডেস্ক

    প্রকাশ :- ২০২৬-১০-০৩, | ১৩:২৯:৪৩ |
বাংলাদেশের পাট ও পাটজাত পণ্যের আন্তর্জাতিক বাজারে নতুন সম্ভাবনার একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে উঠেছে তুরস্ক। পাটের কাঁচামাল উৎপাদন ও ঐতিহ্যগত ব্যবহারের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের পরিচিতি দীর্ঘদিনের।কিন্তু শুধু কাঁচা পাট বা প্রচলিত পাটজাত পণ্য রপ্তানির মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে উচ্চমূল্যের পাটপণ্য উৎপাদন ও বৈচিত্র্যময় বাজার অনুসন্ধান করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ বাংলাদেশের জুট ইয়ার্ন বা পাটের সুতা তুরস্কের বাজারে ইতিমধ্যেই বেশ চাহিদাসম্পন্ন পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেছে। 

বিশ্বব্যাংকের World Integrated Trade Solution (WITS)-এ প্রকাশিত UN Comtrade-এর ২০২৪ সালের তথ্য বলছে, তুরস্ক ওই বছর জুট বা অন্যান্য টেক্সটাইল বাস্ট ফাইবারের একক সুতা (HS 530710) আমদানি করেছে প্রায় ১১৭.৩৫ মিলিয়ন ডলারের। এর মধ্যে বাংলাদেশ থেকেই এসেছে প্রায় ১১৭.২৪ মিলিয়ন ডলারের পণ্য—অর্থাৎ এই শ্রেণির আমদানির প্রায় ৯৯.৯ শতাংশ। 

একই বছর মাল্টিপল বা ক্যাবলড জুট ইয়ার্ন (HS 530720) আমদানির পরিমাণ ছিল প্রায় ১১.৯২ মিলিয়ন ডলার। এখানেও বাংলাদেশের সরবরাহ ছিল প্রায় ১১.১২ মিলিয়ন ডলার, অর্থাৎ প্রায় ৯৩ শতাংশ। 

দুটি শ্রেণি একত্রে বিবেচনা করলে ২০২৪ সালে তুরস্কের জুট ইয়ার্ন আমদানি দাঁড়ায় প্রায় ১২৯.২৬ মিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে বাংলাদেশ থেকে এসেছে প্রায় ১২৮.৩৭ মিলিয়ন ডলার, অর্থাৎ প্রায় ৯৯.৩ শতাংশ। 

উক্তচিত্র পর্যালোচনা করলে বোঝা যায় যে,“Turkey বছরে প্রায় ১২৯ million ডলারের Jute Yarn আমদানি করে, Bangladesh থেকেই যায় 90%+”—এই বক্তব্যের মূল তথ্য ২০২৪ সালের UN Comtrade তথ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। বরং নির্দিষ্ট HS 5307-এর এই দুই উপশ্রেণি ধরে বাংলাদেশের অংশ ৯৯ শতাংশেরও বেশি। 

একক বাজারে এত বেশি নির্ভরতা: সুযোগের পাশাপাশি ঝুঁকিপূর্ণও।

তুরস্কের জুট ইয়ার্ন বাজারে বাংলাদেশের এমন শক্ত অবস্থান নিঃসন্দেহে একটি বড় বাণিজ্যিক অর্জন। তুরস্কের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও বাংলাদেশ থেকে আমদানির প্রধান পণ্যের তালিকায় jute yarns & twine-এর কথা উল্লেখ করেছে। অর্থাৎ এটি দুই দেশের বাণিজ্য সম্পর্কের একটি প্রতিষ্ঠিত খাত। 

তবে একটি বাজারে অত্যধিক নির্ভরতা যেমন সুযোগ সৃষ্টি করে, তেমনি ঝুঁকিও তৈরি করে। তুরস্কে বাংলাদেশের পাটসুতার অবস্থান শক্তিশালী হলেও আন্তর্জাতিক বাজারে দীর্ঘমেয়াদি অবস্থান নিশ্চিত করতে হলে শুধু একটি দেশের ওপর নির্ভর করা যথেষ্ট নয়। একই পণ্যকে চীন, ভারত, মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ, উত্তর আফ্রিকা এবং অন্যান্য সম্ভাবনাময় বাজারে আরও সম্প্রসারণ করতে হবে।

বিশেষ করে ২০২৪ সালে বাংলাদেশ থেকে তুরস্কে একক জুট ইয়ার্নের রপ্তানি যেমন ১১৭.২৪ মিলিয়ন ডলার ছিল, একই পণ্যের ক্ষেত্রে চীনে রপ্তানি ছিল প্রায় ৬৮.৪৭ মিলিয়ন ডলার, ভারতে ৩১.০৪ মিলিয়ন ডলার এবং উজবেকিস্তানে ২৩.৩৭ মিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ তুরস্ক গুরুত্বপূর্ণ বাজার হলেও বাংলাদেশ ইতিমধ্যে একাধিক দেশে জুট ইয়ার্ন রপ্তানি করা শুরু করেছে।

কাঁচামাল থেকে মূল্য সংযোজিত পণ্যে রূপান্তর।

বাংলাদেশের পাট খাতের সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা শুধু বেশি পরিমাণ পাট উৎপাদনে নয়; বরং পাটকে কতটা মূল্য সংযোজিত পণ্যে রূপান্তর করা যায়, তার ওপরও বহুলাংশে নির্ভরশীল।

পাটের সুতা, জুট ফেব্রিক, কার্পেট, ব্যাগ, হোম-ডেকর, জিওটেক্সটাইল, কম্পোজিট, পরিবেশবান্ধব প্যাকেজিং এবং অন্যান্য বহুমুখী পণ্য আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের পাটের নিত্য নতুন পরিচয় তৈরি করতে পারে। কাঁচা পাটের তুলনায় এসব পণ্যে দেশীয় শ্রম, প্রযুক্তি, নকশা ও শিল্প-উদ্যোক্তার অংশগ্রহণ বেশি হওয়ায় রপ্তানি আয়ে মূল্য সংযোজনের সুযোগও বৃদ্ধি পায়।

বিশ্বব্যাপী পরিবেশবান্ধব ও প্রাকৃতিক বস্তুর চাহিদা বাড়ার প্রেক্ষাপটে পাট বাংলাদেশের জন্য একটি কৌশলগত রপ্তানি সম্পদ হতে পারে। তবে সেই সম্ভাবনা কাজে লাগাতে হলে প্রচলিত পণ্য ও প্রচলিত বাজারের ওপর নির্ভর না করে গবেষণা, পণ্যের মানোন্নয়ন, আধুনিক প্রযুক্তি, আন্তর্জাতিক মাননির্ভর সার্টিফিকেশন এবং বাজারভিত্তিক পণ্য উন্নয়নে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে।

তুরস্কের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য আরও বৃদ্ধির সুযোগ

তুরস্ক শুধু একটি বড় ক্রেতা নয়; এটি ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য ও আশপাশের বাজারের সঙ্গে সংযুক্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক কেন্দ্রস্থল। ফলে তুরস্কের সঙ্গে বাংলাদেশের পাটবাণিজ্যকে শুধু দ্বিপক্ষীয় আমদানি-রপ্তানির মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে বৃহত্তর আঞ্চলিক বাজারে প্রবেশের সুযোগ হিসেবেও বিবেচনার দাবি রাখে।

এ ক্ষেত্রে সরকারি প্রতিষ্ঠান, রপ্তানিকারক, পাটকল, ব্যবসায়ী সংগঠন এবং কূটনৈতিক মিশনের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা বহুলাংশে বৃদ্ধি পেয়েছে। 

তুরস্কের আমদানিকারক ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর চাহিদা, ভবিষ্যৎ পণ্যের ধরন এবং আন্তর্জাতিক বাজারের পরিবর্তন সম্পর্কে নিয়মিত তথ্য সংগ্রহ করে বাংলাদেশের উৎপাদকদের কাছে পৌঁছে দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

একই সঙ্গে মান বজায় রাখা, সময়মতো সরবরাহ নিশ্চিত করা, প্রতিযোগিতামূলক মূল্য নির্ধারণ এবং দীর্ঘমেয়াদি বাণিজ্যিক সম্পর্ক রক্ষায় বাংলাদেশের রপ্তানিকারকদের আরও মনোযোগী হতে হবে। দীর্ঘ প্রচেষ্টায় একটি বাজারে ইতিবাচক অবস্থান তৈরি করা খুব সহজ বিষয় নয়; কিন্তু অযত্ন অবহেলায় তা নষ্ট হলে সেটাকে পুনরুদ্ধার করা শুধু কঠিন নয় ক্ষেত্রবিশেষে অসম্ভবও বটে।

তুরস্কের জুট ইয়ার্ন বাজারে বাংলাদেশের প্রায় একচেটিয়া অবস্থান নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক বাণিজ্যিক বাস্তবতা। কিন্তু এটিকে শুধু সাফল্যের গল্প হিসেবে প্রচার করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। বরং এই বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান কীভাবে দীর্ঘস্থায়ী করা যায় এবং একই ধরনের অবস্থান অন্য দেশগুলোর বাজারেও কীভাবে তৈরি করা যায়—সেটিই হওয়া উচিত নীতিনির্ধারকদের মূল দায়িত্ব।

পাট বাংলাদেশের ঐতিহ্য, কিন্তু এর ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে আধুনিক প্রযুক্তি, বহুমুখী ব্যবহার ও উচ্চমূল্যের রপ্তানিনির্ভর শিল্পে পরিণত করার ওপর। তুরস্কের বাজারে বাংলাদেশের জুট ইয়ার্নের শক্ত অবস্থান দেখিয়ে দিচ্ছে—সঠিক পণ্য, সঠিক মান ও সঠিক বাজারে পৌঁছাতে পারলে বাংলাদেশের পাট এখনও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

তাই এখন প্রয়োজন শুধু “সোনালি আঁশের” অতীতকে স্মরণ করা নয়; পাটকে আধুনিক শিল্প ও রপ্তানি অর্থনীতির শক্তিশালী ভিত্তিতে পরিণত করার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করা।

শেয়ার করুন



এ জাতীয় আরো খবর..