সিফিলিস, রুবেলা কিংবা সাইটোমেগোভাইরাসের মতো জন্মগত সংক্রমণ নিয়ে যেসব শিশু জন্ম নেয়, তাদের পরবর্তী জীবনে অটিজম বা বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিবন্ধকতার শিকার হওয়ার ঝুঁকি কয়েক গুণ বেশি থাকে। সম্প্রতি একটি নতুন গবেষণায় এই চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ পেয়েছে, যা চিকিৎসাবিজ্ঞান ও জনস্বাস্থ্য মহলে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, গর্ভাবস্থায় যেসব শিশু এই ধরনের সংক্রমণের শিকার হয়, সংক্রমণের ঝুঁকিতে না থাকা শিশুদের তুলনায় তাদের অটিজমে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা প্রায় তিন গুণ বেশি। অন্যদিকে, বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিবন্ধকতার শিকার হওয়ার ঝুঁকি সাধারণ শিশুদের তুলনায় সাত গুণেরও বেশি। গবেষকদের মতে, গর্ভাবস্থায় ভ্রূণের শরীরে ছড়িয়ে পড়া নির্দিষ্ট কিছু সংক্রমণ মস্তিষ্কের স্বাভাবিক বিকাশের ওপর দীর্ঘমেয়াদি ও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
টর্চ (TORCH) নামে পরিচিত এই সংক্রমণগুলোর মধ্যে রয়েছে সিফিলিস, রুবেলা, টক্সোপ্লাসমোসিস, সাইটোমেগোভাইরাস এবং হার্পিসভাইরাস। অনেক সাধারণ সংক্রমণের বিপরীতে এই রোগজীবাণুগুলো প্ল্যাসেন্টা ভেদ করে সরাসরি ভ্রূণকে আক্রান্ত করতে পারে। এর ফলে গর্ভপাত, মৃত সন্তান প্রসব এবং গর্ভাবস্থায় বিভিন্ন জটিলতার ঝুঁকি মারাত্মকভাবে বেড়ে যায়।
সুইডেনের ক্যারোলিনস্কা ইনস্টিটিউটের গ্লোবাল পাবলিক হেলথ বিভাগের গবেষক রেনে গার্ডনার জানিয়েছেন, জন্মগত এই সংক্রমণগুলো বিরল হলেও এর বেশ কিছু প্রতিরোধযোগ্য উপায় রয়েছে। জনস্বাস্থ্যের দিক থেকে বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন তিনি।
১৯৮৭ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে সুইডেনে জন্ম নেওয়া প্রায় ৩৭ লাখ মানুষকে এই গবেষণার অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। এর মধ্যে ৯৭৫ জনের জন্মগত টর্চ সংক্রমণ ধরা পড়েছিল। পরবর্তী জীবন বা শিক্ষাজীবনে এই সংক্রমণের কোনো দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়ে কি না, তা জানতে গবেষকরা অংশগ্রহণকারীদের প্রায় তিন দশক ধরে পর্যবেক্ষণ করেন।
যদিও সামগ্রিক জনসংখ্যার তুলনায় অটিজমের সামগ্রিক ঘটনায় এই সংক্রমণগুলোর হার খুবই কম, তবে যেসব শিশু এর শিকার হয় তাদের ক্ষেত্রে অটিজম ও বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিবন্ধকতার ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়। গবেষকদের মতে, জন্মগত টর্চ সংক্রমণ নিয়ে জন্ম নেওয়া প্রতি পাঁচ শিশুর একজনের মধ্যে পরবর্তীতে অটিজম দেখা দিতে পারে।
শুধু অটিজম বা প্রতিবন্ধকতায় আক্রান্ত হওয়াই নয়, এই ধরনের সংক্রমণ শিশুদের পড়ালেখার ফলাফলের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। গবেষণায় দেখা গেছে, টর্চ সংক্রমণ থাকা ৪২০ জনের মধ্যে কোনো ধরনের অটিজম বা বুদ্ধিবৃত্তিক সমস্যা না থাকলেও তারা বিদ্যালয়ে বেশ খারাপ ফলাফল করেছে।
বিশ্বজুড়ে টর্চ সংক্রমণের প্রাদুর্ভাব ও ধরন ভিন্ন হয়ে থাকে। এর মধ্যে সবচেয়ে প্রচলিত হলো জন্মগত সাইটোমেগোভাইরাস (সিএমভি), যা প্রতি ১৫০ জন নবজাতকের মধ্যে প্রায় একজনের শরীরে দেখা যায়। স্বল্প ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে এর প্রকোপ আরও অনেক বেশি বলে জানা গেছে।
ঝুঁকি কমানোর উপায় কী?
গবেষকদের মতে, বিশেষ করে যেসব এলাকায় সংক্রমণের হার বেশি, সেখানে রোগ প্রতিরোধের কৌশলগুলোকে আরও জোরদার করা জরুরি। এই সংক্রমণগুলো রোধ করতে ব্যাপকভিত্তিক টিকাদান কর্মসূচি তৈরি, তা বাস্তবায়ন এবং চালু রাখা জনস্বাস্থ্য রক্ষায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করা হয়েছে গবেষণায়।
এ ছাড়া সুইডেনের মতো বর্তমান স্বাস্থ্যব্যবস্থায় অনেক সময়ই উপসর্গহীন বা অ্যাসিম্পটোম্যাটিক কেসগুলো এড়িয়ে যায়, কারণ নবজাতকদের ক্ষেত্রে সার্বিকভাবে টর্চের স্ক্রিনিং সব জায়গায় চালু নেই। এই ধরনের সুপ্ত বা লুকানো সংক্রমণগুলো সঠিকভাবে শনাক্ত করতে আরও উন্নত ও কার্যকর কৌশল গ্রহণের তাগিদ দিয়েছেন গবেষকরা।
সূত্র: ইউরো নিউজ
এ জাতীয় আরো খবর..