✕
নিউজ ডেস্ক
প্রকাশ :- ২০২৬-০৮-২০, | ১৪:০৩:০১ |বাংলাদেশের ড্রেসিংরুমে মুশফিকুর রহিমকে দেখা হয় শৃঙ্খলার প্রতীক হিসেবে। নিজের অভিজ্ঞতা দিয়ে সতীর্থদের পথ দেখান তিনি। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে চলমান দুই ম্যাচের টেস্ট সিরিজের দ্বিতীয় ম্যাচে ২২ আগস্ট ম্যাকেতে মাঠে নামবে বাংলাদেশ। সেই ম্যাচে মুশফিক আবারও একই ভূমিকা পালন করবেন বলে আশাবাদী দলটি।
বর্তমান টেস্ট দলের এক অভিজ্ঞ সদস্য মুশফিকের গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, 'মুশফিক ভাই যখন আর থাকবেন না, তখন কী হবে, আমি জানি না। তার মতো একজনকে আপনার প্রয়োজন। কারণ তিনি আমাদের মানসিক শক্তি জোগান।'
নিজের ক্যারিয়ারের নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে টেস্ট ক্রিকেটে ২১ বছর পূর্ণ করেছেন মুশফিক। নিজের মাঠে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে টেস্ট সিরিজ খেলা তাঁর প্রজন্মের অল্প কয়েকজন ক্রিকেটারের একজনও তিনি। দেশের অন্যতম দক্ষ ও কৌশলী ব্যাটসম্যান হিসেবে বিবেচিত মুশফিক এখন শুধু ব্যাট হাতে নয়, কঠিন পরিস্থিতিতে দলকে পথ দেখানোর জন্যও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
ডারউনে বাংলাদেশের ঐতিহাসিক জয়ে মুশফিক ৩৬ রান করেন। তবে তানজিদ হাসান তামিম শতরান করে ফেরার পর অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্তর সঙ্গে ৬৬ রানের গুরুত্বপূর্ণ জুটি গড়েন তিনি। শান্ত যখন শতরানের কাছাকাছি পৌঁছাচ্ছিলেন, তখন অপর প্রান্ত থেকে তাঁকে নিয়মিত সাহস জুগিয়েছেন মুশফিক। শেষ পর্যন্ত শান্ত ৮৪ রানে আউট হলেও মুশফিকের নেতৃত্বগুণ ছিল স্পষ্ট।
ব্যাট হাতে কিংবা মাঠে, বিপদের সময় দলকে পথ দেখানোর ক্ষেত্রে মুশফিকের ভূমিকা নতুন কিছু নয়। তবে একসময় ব্যাট হাতে ব্যর্থ হলে সাজঘরে তাঁর আবেগেরও প্রকাশ ঘটত। জাতীয় দলের সাবেক সতীর্থদের মতে, নিজের প্রত্যাশা অনুযায়ী খেলতে না পারলে তখন তাঁকে সামলানো কিছুটা কঠিন হয়ে উঠত।
সময়ের সঙ্গে বদলেছেন মুশফিকও। এখন ব্যক্তিগত হতাশা সামলে নিয়ে নিজের অভিজ্ঞতা ও শিক্ষা সতীর্থদের সঙ্গে ভাগ করে নিতেই বেশি আগ্রহী তিনি। টেস্টে বাংলাদেশের সর্বকালের সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক মুশফিক এই সংস্করণে দেশের হয়ে সবচেয়ে বেশি ম্যাচও খেলেছেন। ২০০৫ সালের মে মাসে লর্ডসে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে টেস্ট অভিষেক হয়েছিল তাঁর।
সাদা বলের আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে অবসর নেওয়া মুশফিক অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম টেস্ট জয়ের পর সতীর্থদের বেশি দূর চিন্তা না করে মাউন্ট মঙ্গানুইয়ের সাফল্যের ছক অনুসরণ করার পরামর্শ দিয়েছেন। ২০২২ সালে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ঐতিহাসিক টেস্ট জয়টি হয়েছিল সেই মাঠেই।
দ্বিতীয় টেস্টের আগে মুশফিক বলেন, 'মাউন্ট মঙ্গানুইয়ে আমাদের সবচেয়ে বড় জয়টির কথা যদি ভুল না করে থাকি, তখন আমাদের একটাই লক্ষ্য ছিল—একটি করে সেশন জেতা।'
তিনি আরও বলেন, 'আমরা সেটিকে এক দিনের ম্যাচের মতো করে নিয়েছিলাম। সেদিন আমাদের জিততেই হতো। তিনটি সেশনের মধ্যে অন্তত দুটি জিততে হতো। এবারও আমরা বিষয়টিকে এভাবে ভাগ করে নিতে পারি।'
বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের প্রকাশ করা এক ভিডিও বার্তায় মুশফিক সতীর্থদের ফলাফল কিংবা প্রতিপক্ষের বড় নাম নিয়ে না ভেবে নিজেদের প্রক্রিয়ার ওপর আস্থা রাখার আহ্বান জানান।
তিনি বলেন, 'আমরা যখনই সেখানে যাই, প্রতিদ্বন্দ্বিতা করি। কন্ডিশন কী, পিচ কেমন, সেটা গুরুত্বপূর্ণ নয়। তারাও মানুষ। তাই শুধু মনে রাখবেন, নিজেদের প্রক্রিয়া ঠিক রাখলে এবং মহান আল্লাহর ওপর বিশ্বাস রাখলে ফলাফল নিজেই আপনাদের পক্ষে আসবে।'
ডারউনের জয় উদযাপন করলেও পরের ম্যাচে কীভাবে একই সাফল্য আবার অর্জন করা যায়, সেটিই এখন মূল ভাবনা বলে মনে করেন মুশফিক।
তিনি বলেন, 'উন্নতির কোনো শেষ নেই। ডারউনের জয় উপভোগ করতে পারেন। কিন্তু এরপর প্রশ্ন হলো, কীভাবে আমরা আবার এটি করতে পারি? একটাই সূত্র—প্রতিদিন, প্রতিটি দিন একইভাবে কাজ করে যাওয়া।'
বাংলাদেশের সাজঘরে গত কয়েক বছরে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে বলেও মনে করেন এই অভিজ্ঞ ক্রিকেটার। তাঁর মতে, ব্যক্তিগতভাবে নিজেদের উন্নতি করার মানসিকতা থেকেই দলের ফলাফলে ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে।
মুশফিক বলেন, 'এই দলের কাছ থেকে, বিশেষ করে টেস্ট দলের কাছ থেকে আমি দারুণ কিছু স্মৃতি পেয়েছি। আমি সত্যিই গর্বিত। গত চার-পাঁচ বছরে সবচেয়ে বড় যে পরিবর্তন দেখেছি, তা হলো প্রত্যেকে ব্যক্তিগতভাবে নিজের উন্নতি করতে চায়। এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ।'
তিনি আরও বলেন, 'একজন খেলোয়াড় যদি নিজের খেলার দুই শতাংশও উন্নতি করতে পারে এবং সবাই যখন একটি দল হিসেবে একসঙ্গে নিজেদের সেরাটা দিতে পারে, তখন সেটির প্রভাব এমন ফলাফলে পড়ে। এটাই আমাকে সবচেয়ে বেশি আনন্দ দেয়।'
নিজের সময়ের সঙ্গে বর্তমান দলের পার্থক্য তুলে ধরে মুশফিক বলেন, '১৫-২০ বছর আগে আমি যখন দলে ছিলাম, তখন কিছু খেলোয়াড় শুধু নিজেদের ওপর বিশ্বাস রাখত, পুরো দলের ওপর নয়। কিন্তু এখন আমি এই ১৫-১৬ জনের দলের মধ্যে আট-নয়জনকে ম্যাচ জেতাতে সক্ষম খেলোয়াড় হিসেবে দেখতে পাচ্ছি।'
দলের মধ্যে একে অন্যের সাফল্যে আনন্দ ভাগ করে নেওয়ার সংস্কৃতি গড়ে তোলার ওপরও জোর দেন তিনি।
মুশফিক বলেন, 'কেউ যখন খুব ভালো করে, তার সাফল্যে আনন্দিত হওয়া এবং সেই আনন্দ ভাগ করে নেওয়া, আবার কেউ ভালো করতে না পারলে তাকে বলা, ইনশাআল্লাহ, পরের দিনটা তোমার হবে—এটাই আমরা গড়ে তুলতে চাই। একজন ব্যক্তি হিসেবে আপনি কতটা অর্জন করলেন, সেটি আমার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নয়। একটি দল হিসেবে আপনি কতটা অর্জন করলেন, সেটিই আমার কাছে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।'
ডারউনের ঐতিহাসিক জয়ের পর এবার আবারও বিবর্ণ সবুজ টেস্ট টুপি মাথায় মাঠে নামবেন মুশফিক। ব্যাট হাতে তাঁর কাছ থেকে থাকবে বড় প্রত্যাশা। তবে তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হবে সতীর্থদের সঠিক পথে রাখা এবং ডারউনের সাফল্যে অতিরিক্ত আত্মতুষ্টিতে না ভেসে যাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করা। কারণ মুশফিক এখন শুধু একজন অভিজ্ঞ ব্যাটসম্যান নন, সবকিছু দেখে আসা একজন নেতাও।