✕
নিউজ ডেস্ক
প্রকাশ :- ২০২৬-০৮-১৫, | ২২:০৩:১৮ |আজকের দিনে পশ্চিমা বিশ্বে চীনের অর্থনৈতিক অগ্রগতি, সামরিক সক্ষমতা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মতো প্রযুক্তির ব্যাপক চর্চা ও গবেষণা হলেও দেশটির প্রাচীন সভ্যতা, ইতিহাস এবং সাংস্কৃতিক শেকড় নিয়ে অধ্যয়নের যথেষ্ট অভাব রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র এবং চীনের মধ্যকার কৌশলগত ও ভূ-রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা যখন দিন দিন তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে, ঠিক তখনই সাংস্কৃতিক বোঝাপড়ার এই ঘাটতি বেইজিংয়ের প্রকৃত উদ্দেশ্য বুঝতে বড় ধরনের ভুল বোঝাবুঝির ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে।
গত ১৪ মে বেইজিংয়ে অনুষ্ঠিত এক শীর্ষ সম্মেলনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠকে চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং বিখ্যাত 'থুসিডিডিস ট্র্যাপ' বা এমন এক পরিস্থিতি এড়ানো যায় কি না তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন, যেখানে একটি উদীয়মান শক্তি এবং একটি প্রতিষ্ঠিত শক্তির মধ্যে দ্বন্দ্ব শেষ পর্যন্ত যুদ্ধের রূপ নেয়। এই ধরনের কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক আলোচনা থেকে স্পষ্ট বোঝা যায় যে, দুই দেশের বর্তমান সম্পর্কের মাঝে গভীর কৌশলগত উদ্বেগ কাজ করছে। আজ গোটা বিশ্ব চীনের কারখানা, পেটেন্ট, এআই মডেল, বাণিজ্য প্রবাহ এবং বিশাল সব অবকাঠামো প্রকল্প নিয়ে গবেষণা করছে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশ চীনের শিল্প নীতি ও প্রযুক্তিগত উৎকর্ষের অনুকরণ করতে চাইছে। কিন্তু এর বিপরীতে চীনের ভাষা, ইতিহাস, দর্শন এবং সাংস্কৃতিক কাঠামোর গভীর চর্চা কাঙ্ক্ষিত মানে পৌঁছাতে পারেনি।
সাংস্কৃতিক সাক্ষরতার এই ভারসাম্যের অভাব বিশ্ব রাজনীতির জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। চীন কীভাবে উৎপাদন করে, কীভাবে অর্থায়ন করে এবং বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতা করে, বিশ্ব তা জানলেও যে ঐতিহাসিক ও নৈতিক কাঠামোর মধ্য দিয়ে চীনে জাতীয় নবজাগরণ, কর্তৃত্ব, বাধ্যবাধকতা এবং অবমাননার মতো বিষয়গুলো নিয়ে বিতর্ক হয়, সে সম্পর্কে পর্যাপ্ত ধারণা রাখছে না।
বর্তমান এই পরিস্থিতির একটি বড় প্রমাণ পাওয়া যায় শিক্ষাঙ্গনে। যুক্তরাষ্ট্রের কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে চাইনিজ ভাষা অধ্যয়নে শিক্ষার্থী ভর্তির হার উল্লেখযোগ্যহারে হ্রাস পেয়েছে। ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা এবং নিরাপত্তা সংক্রান্ত উদ্বেগের কারণে যেখানে চীন বিশেষজ্ঞদের গুরুত্ব সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন, ঠিক সেখানেই সেই বিশেষজ্ঞ তৈরির পথগুলো সংকুচিত হয়ে আসছে।
সাংস্কৃতিক বোঝাপড়ার অর্থ এই নয় যে চীনের সরকারের সব নীতি বা দাবি অন্ধভাবে মেনে নিতে হবে। বরং এর অর্থ হলো এই উপলব্ধি তৈরি করা যে, বেইজিংয়ের যেকোনো নীতি বা বক্তব্য সম্পূর্ণ ভিন্ন কিছু ঐতিহাসিক স্মৃতি এবং নৈতিক শব্দচয়নের মাধ্যমে ব্যাখ্যা করা হয়ে থাকে। পশ্চিমা রাজনৈতিক দর্শনে যেখানে সাধারণত ব্যক্তিস্বাধীনতা এবং সরকারের ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণের বিষয়টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়, সেখানে চীনা রাজনৈতিক দর্শনে সামাজিক শৃঙ্খলা, সমষ্টিগত কল্যাণ এবং পারস্পরিক সম্পর্কের বাধ্যবাধকতার ওপর বেশি জোর দেওয়া হয়।
এছাড়া ঐতিহাসিক স্মৃতির বিষয়টিও এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। উনবিংশ এবং বিংশ শতাব্দীর শুরুতে পশ্চিমা ও জাপানি সাম্রাজ্যবাদের কারণে চীনকে ইতিহাসের এক চরম দুর্দিন ও অবমাননার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছিল। আধুনিক চীনের শিক্ষাব্যবস্থায় এই ইতিহাস গুরুত্বের সঙ্গে পড়ানো হয়, অথচ পশ্চিমা সাধারণ মানুষের অনেকেই আফিম যুদ্ধ বা নান্দনিক ইতিহাসের অন্যান্য ঘটনা সম্পর্কে প্রায় অজ্ঞ। এর ফলে এক পক্ষ যাকে সমসাময়িক সাধারণ নীতি বলে মনে করে, অন্য পক্ষ তাকে জাতীয় দুর্বলতা ও বিদেশি আগ্রাসনের দীর্ঘ ইতিহাসের চশমা দিয়ে অবলোকন করে।
চীনকে সঠিকভাবে বুঝতে হলে তাকে কেবল এককভাবে একটি শাসক দল বা নির্দিষ্ট কোনো শাসনব্যবস্থার মধ্যে সীমিত করে দেখার মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। চীনা সমাজ বা সভ্যতা কেবল কমিউনিস্ট পার্টি বা শুধুমাত্র কনফুসীয়বাদের গণ্ডিতে আটকে নেই। কনফুসীয়বাদ, তাওবাদ, বৌদ্ধধর্ম, আইনি দর্শন, মার্ক্সবাদ, জাতীয়তাবাদ এবং আধুনিক পুঁজিবাদী ধারার এক দীর্ঘ সংমিশ্রণে চীনা সমাজ গড়ে উঠেছে। এই ঐতিহ্যগুলোর পারস্পরিক দ্বন্দ্ব ও মেলবন্ধনই আজকের চীনকে তৈরি করেছে। দর্শন ছাড়াও সাহিত্য, সিনেমা এবং শিল্পের বিভিন্ন মাধ্যম চীনের মানুষের অভ্যন্তরীণ অভিজ্ঞতা ও জীবনযাত্রাকে এমনভাবে ফুটিয়ে তোলে যা কেবল সরকারি বিবৃতি বা অর্থনৈতিক পরিসংখ্যান দিয়ে কখনো পরিমাপ করা সম্ভব নয়।
তবে এই দূরত্ব ঘোচানোর ক্ষেত্রে পশ্চিমা প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থারও কিছুটা দায় রয়েছে। বিশ্বজুড়ে চীনা দর্শনকে এখনও প্রায়ই কেবল আঞ্চলিক অধ্যয়নের একটি ক্ষুদ্র গণ্ডির মধ্যে আটকে রাখা হয়, অথচ একে দর্শনের বৈশ্বিক উত্তরাধিকারের অংশ হিসেবে বিবেচনা করা উচিত।
পাশাপাশি, জাতীয়তাবাদী রাজনীতির চর্চাও উভয় প্রান্তে মানুষের স্বাভাবিক কৌতূহল ও সাংস্কৃতিক জ্ঞান অর্জনের পথকে রুদ্ধ করে দিচ্ছে। এই ব্যবধান দূর করতে হলে কেবল আনুষ্ঠানিক সাংস্কৃতিক বিনিময়ের উদযাপনে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না, বরং শিক্ষাঙ্গনগুলোতে উন্নত ভাষা শিক্ষণ এবং চীনা ইতিহাস ও দর্শনের প্রসার ঘটাতে হবে।
কেবল সামরিক সংযম বা ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্ট হটলাইনের মাধ্যমে বড় ধরনের সংঘাত এড়ানো সম্ভব নয়। একটি সফল ভূ-রাজনৈতিক সহাবস্থানের জন্য প্রয়োজন চীন বা যুক্তরাষ্ট্র উভয়েরই সেই ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক দৃষ্টিভঙ্গিগুলো বোঝা, যার মাধ্যমে একে অপরের জাতীয় উদ্দেশ্য এবং ক্ষমতার পরিমাপ করে থাকে। পশ্চিমাবিশ্ব এতদিন কেবল চীন কী করতে পারে বা তার সক্ষমতা কতখানি তা মাপতেই নিজেদের সমস্ত শক্তি বিনিয়োগ করেছে। এখন সময় এসেছে চীন ঠিক কী ভাবছে এবং তাদের এই চিন্তার পেছনের মূল দার্শনিক ভিত্তি কী, তা গভীরভাবে অনুধাবন করার।
সূত্র: এশিয়া টাইমস