ট্রাম্প-মাস্ক: শত্রু তুমি, বন্ধু তুমি

  • নিউজ ডেস্ক

    প্রকাশ :- ২০২৬-০৮-১৫, | ১৩:২৭:৩৩ |

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং বিশ্বের সবচেয়ে সম্পদশালী ইলন মাস্কের মধ্যকার সম্পর্কটি ব্রিটিশ আবহাওয়ার মতই আনপ্রেডিক্টেবল। এই ভালো, এই মন্দ। এই গলায় ভাব তো পরক্ষণেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ধুন্ধুমার যুদ্ধ। 

তবে আগামী নভেম্বরে মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের পক্ষে ১০০ মিলিয়ন ডলার খরচ করার ঘোষণা দিয়ে টেসলা ও স্পেসএক্স’এর মালিক ইলন মাস্ক আবার বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন। ট্রাম্প আর মাস্কের সম্পর্ক জোড়া লাগানোর পেছনে সবচেয়ে বড় অবদান মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের। 

শুক্রবার ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের এক প্রতিবেদনে ট্রাম্প-মাস্ক সম্পর্কের আদ্যোপান্ত ও জোড়া লাগার গল্প উঠে এসেছে।

ডোনাল্ড ট্রাস্পের সাথে ইলন মাস্কের সম্পর্কের বরফ গলার ইঙ্গিতটা আসে গত মে মাসে। যখন সবাইকে চমকে দিয়ে এয়ারফোর্স ওয়ানের বেইজিংগামী ফ্লাইটে চড়ে বসেন মাস্ক। ট্রাম্পের সাথে মাস্কের বছরব্যাপী যুদ্ধের পর বেইজিংগামী সেই ফ্লাইট যেন শান্তির বার্তা নিয়ে আসে। এই দুই ব্যক্তিকে আবার বেশ সৌহার্দ্যপূর্ণ অবস্থায় দেখা গেছে। 

ফ্লাইট চলাকালীন মাস্ক ট্রাম্পকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে নতুন কারখানা তৈরির পরিকল্পনার কথা জানান। ট্রাম্প সম্প্রতি দেখা একটি মহাকাশ উৎক্ষেপণের ভিডিও নিয়ে কথা বলেন এবং মাস্কের ছোট ছেলেদের একজনের সম্পর্কে খোঁজখবর নেন। মাস্ক ২০২৪ সালের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনী প্রচারণার সময় তার কাটানো মজার মুহূর্তগুলো নিয়ে হোয়াইট হাউসের উপদেষ্টাদের সাথেও গল্প করেন। এরপর মাস্ক জানান যে তিনি নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের সাহায্য করার পরিকল্পনা করছেন এবং কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে রিপাবলিকানদের সহায়তার উদ্দেশ্যে একটি ভোটার-টার্নআউট অভিযানের জন্য কমপক্ষে ১০০ মিলিয়ন ডলার ব্যয় করার ইচ্ছা পোষণ করছেন। তবে, এই মুহূর্তটি ছিল মূলত তাদের মধ্যকার সম্পর্ক জোড়া লাগাতে কয়েক মাসের চেষ্টারই একটি চূড়ান্ত রূপ।

২০২৪ সালের নির্বাচনী প্রচারণার সময় ট্রাম্প এবং মাস্কের মধ্যে এক অস্বাভাবিক ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়েছিল। ট্রাম্পকে হোয়াইট হাউসে ফিরিয়ে আনতে মাস্ক প্রায় ৩০০ মিলিয়ন ডলার খরচ করেছিলেন। ট্রাম্প দায়িত্ব নেওয়ার পর, মাস্ককে আরো কাছে টেনে নেন। দায়িত্ব দেন সরকারের দক্ষতা বিষয়ক বিভাগের। এ বিভাগের দায়িত্ব ছিল সরকারের অপচয় কমানো। কিন্তু এটা করতে গিয়েই অনেকের বিরাগভাজন হন মাস্ক। অনেকেই তার সম্পর্কে ট্রাম্পের কান ভারি করেন। মাস্কের আক্রমণাত্মক ও প্রথাগত নিয়মের বাইরে গিয়ে কাজ করার ধরণ ট্রাম্পের ক্যাবিনেট মন্ত্রীদের অসন্তুষ্ট করে তোলে। ক্যাবিনেট সদস্যরা অভিযোগ করেন যে, মাস্ক তাদের নিজস্ব মন্ত্রণালয় ও সংস্থাগুলোর কাজে অতিরিক্ত ও অনাকাঙ্ক্ষিত হস্তক্ষেপ করছেন। ভাঙ্গনের শুরুটা সেখান থেক হলেও গতবছরের জুনে এসে সবকিছু পুরোপুরি ভেঙে পড়ে।

বিরোধের মূল সূত্রপাত ঘটেছিল ট্রাম্প প্রশাসনের একটি বড় কর ও ব্যয় সংক্রান্ত প্রস্তাবিত বিলকে কেন্দ্র করে। ইলন মাস্ক এই বিলটির তীব্র বিরোধিতা করে এটিকে একটি ’ঘৃণ্য অপকর্ম’ বলে আখ্যায়িত করেন। মাস্কের দাবি ছিল, এই বিলের ফলে আমেরিকার ঋণ আরও ২ দশমিক ৪ ট্রিলিয়ন ডলার বেড়ে যাবে। ট্রাম্পের ওই নতুন বিলে বৈদ্যুতিক গাড়ির ক্রেতাদের জন্য দেওয়া সরকারি আর্থিক প্রণোদনা বা ট্যাক্স ক্রেডিট সুবিধা বাতিল করা হয়েছিল। টেসলা-র প্রধান হিসেবে মাস্ক এই সিদ্ধান্তে ক্ষুব্ধ হন। অন্যদিকে ট্রাম্প অভিযোগ করেন, মাস্ক মূলত নিজের ব্যবসায়িক স্বার্থে পুরো বিলটির বিরোধিতা করছেন।

এই বিল নিয়ে দ্বন্দ্বের কারণেই ট্রাম্পের সঙ্গ ছাড়েন মাস্ক। শুধু দূরে গিয়েই ক্ষান্ত হননি মাস্ক। পুরোনিা বন্ধু ট্রাম্পকে লক্ষ্য করে আক্রমণের তীর ছুঁড়তে থাকেন। মাস্ক তার এক্স (সাবেক টুইটার) প্ল্যাটফর্মের ২৪ কোটি অনুসারীর উদ্দেশ্যে বলেন, ‘এবার আসল পারমাণবিক বোমাটি ফাটানোর সময় এসেছে।’ তিনি দাবি করেন, জেফরি এপস্টাইনের তদন্ত ফাইলে ট্রাম্পের নাম রয়েছে এবং ঠিক এই কারণেই ফাইলগুলো এখনও জনসমক্ষে আনা হয়নি।

ট্রাম্পও বসে থাকার পাত্র নন। তিনি তার নিজের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম 'ট্রুথ সোশ্যাল'-এর মাধ্যমে এর জবাব দেন এবং মাস্কের সরকারি চুক্তি ও ভর্তুকি বাতিলের হুমকি দেন। হুমকির জববে মাস্ক ট্রাম্পকে উদ্দেশ্য করে লেখেন, তিনি পাশে না থাকলে এই রিপাবলিকান নেতা নির্বাচনেই হেরে যেতেন। মাস্ক ক্ষোভ প্রকাশ করে যোগ করেন, ’কী চরম অকৃতজ্ঞতা।’

হোয়াইট হাউস প্রকাশ্যে এই মুখোমুখি সংঘাতকে একটি ’দুর্ভাগ্যজনক ঘটনা’ হিসেবে উড়িয়ে দিয়েছিল। তবে পর্দার আড়ালে, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা এই সম্পর্কটিকে পুরোপুরি ভেঙে যাওয়ার হাত থেকে রক্ষা করার জন্য ইতিমধ্যেই চেষ্টা চালাচ্ছিলেন। প্রকাশ্য বিরোধের ঠিক একদিন পর, ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এবং হোয়াইট হাউসের চিফ অব স্টাফ সুজি ওয়াইলস মাস্কের সাথে যোগাযোগ করেন। এর পরের সপ্তাহে মাস্ক ট্রাম্পকে ফোন করেন এবং পরবর্তীতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পোস্ট করে জানান যে তিনি তার কিছু মন্তব্যের জন্য অনুতপ্ত এবং স্বীকার করেন যে তিনি কিছুটা বাড়াবাড়ি করে ফেলেছেন। কিন্তু ট্রাম্প গতবছরের সেপ্টেম্বরে বলেছিলেন, তিনি মাস্ককে এখনই তার ঘনিষ্ঠ মহলে ফিরিয়ে নিতে প্রস্তুত নন। তারপরও ভ্যান্স যোগাযোগের মাধ্যমগুলো সচল রাখার কাজ চালিয়ে যান। তিনি মাস্ক এবং তার সহযোগীদের সাথে যোগাযোগ বজায় রেখেছিলেন এবং বিশ্বাস করতেন যে মাস্কের মতো একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্বকে এভাবে সহজেই বাদ দেওয়া যায় না।

মার্কিন সরকারের সাথে স্পেসএক্স-এর বড় বড় চুক্তি রয়েছে, যার মধ্যে পেন্টাগন এবং নাসার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত কিছু কাজও অন্তর্ভুক্ত। এই বিরোধের সময়, মাস্ক এমনকি আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনের মিশনগুলোতে সহায়তা বন্ধ করে দেওয়ারও হুমকি দিয়েছিলেন, যা নাসার মধ্যে আশঙ্কার সৃষ্টি করেছিল। ট্রাম্প-মাস্কের বিরোধের পর চালু হওয়া স্পেসএক্স চুক্তির একটি সরকারি পর্যালোচনায় দেখা গেছে যে, সেগুলোর বেশিরভাগই প্রতিরক্ষা বিভাগ এবং নাসার জন্য অত্যন্ত জরুরি ছিল। এরপর থেকে, স্পেসএক্স মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থার সাথে আরও গভীরভাবে জড়িয়ে পড়েছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই প্রক্রিয়ায় ভ্যান্স আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। গত গ্রীষ্মের শেষের দিকে মাস্ক একটি নতুন রাজনৈতিক দল গঠনের পরিকল্পনা ত্যাগ করেন, যার আংশিক কারণ ছিল তিনি ভ্যান্সের সাথে তার সম্পর্কটি বজায় রাখতে চেয়েছিলেন।

রক্ষণশীল অ্যাক্টিভিস্ট চার্লি কার্কও ট্রাম্প এবং মাস্ককে আবার একত্রিত করার চেষ্টা করছিলেন। কার্কের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিরা জানিয়েছেন যে, ট্রাম্প ও মাস্কের মধ্যকার বিরোধ যখন প্রকাশ্য রূপ নেয়, তখন তিনি মাস্কের সাথে যোগাযোগ রাখছিলেন। পরবর্তীতে সেপ্টেম্বর মাসে কার্ককে গুলি করে হত্যা করা হয়। অ্যারিজোনার একটি ফুটবল স্টেডিয়ামে কার্কের স্মরণসভায় ট্রাম্প এবং মাস্কের দেখা হয়ে যায়। সেখানে মাস্ককে ট্রাম্পের স্টেডিয়াম বক্সের দিকে হেঁটে যেতে দেখা যায় এবং তিনি ট্রাম্পের সাথে কথাও বলেন। 

মাস্ক যখন বিদায় নিচ্ছিলেন, তখন ট্রাম্প তার কনুইতে আলতো চাপ দেন। সেদিন রাতে মাস্ক ট্রাম্পের সাথে কথা বলার একটি ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পোস্ট করেন। ছবির ক্যাপশনে তিনি লিখেছিলেন: ‘চার্লির জন্য।’

মাস্কের সাথে ট্রাম্পের বিরোধের পেছনে বড় কারণ হিসেবে মানা হয় ট্রাম্পের সহযোগী সার্জিও গোরকে। কাজ করতে গিয়ে গোরের সাথে মাস্কের বারবার লাগছিল। ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের শুরুর দিকের এক বৈঠকে প্রেসিডেন্ট অভিযোগ করেছিলেন যে,  দক্ষতা সংস্থার বিভিন্ন উদ্যোগ বাস্তবায়নে অত্যন্ত ধীরগতিতে এগোচ্ছে। মাস্ক এর জন্য দায়ী করেন গোরকে, যিনি প্রশাসনের নিয়োগগুলো যাচাই-বাছাইয়ের দায়িত্বে ছিলেন। প্রতিবেদনটিতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, এর প্রেক্ষিতে ট্রাম্প পরবর্তীতে গোরকে বেশ তিরস্কার করেন। গত আগস্টে ট্রাম্প গোরকে ভারতে মার্কিন রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিযুক্ত করেন, যা তাকে ওয়াশিংটন থেকে হাজার হাজার মাইল দূরে নিয়ে যায়। সম্পর্ক জোড়া লাগানোর ক্ষেত্রে এই বদলিও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

এরপর নভেম্বরে ট্রাম্প তার আগের সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসেন এবং মাস্কের ঘনিষ্ঠ সহযোগী জ্যারেড আইজ্যাকম্যানকে পুনরায় নাসার প্রধান হিসেবে নিযুক্ত করেন। এর আগে জুন মাসে মাস্ক ও ট্রাম্পের মধ্যকার বিরোধ যখন চরম পর্যায়ে ছিল, তখন আইজ্যাকম্যানকে এই পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। গত নভেম্বরে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের জন্য ট্রাম্পের দেওয়া একটি নৈশভোজে যোগ দিতে মাস্ক পুনরায় হোয়াইট হাউসে যান। ট্রাম্পও ইদানিং জনসমক্ষে মাস্কের প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়েছেন। মাস্ক বিশ্বের প্রথম ট্রিলিওনিয়ার হওয়ার পর প্রেসিডেন্ট তাকে একটি অভিনন্দন বার্তাও পাঠিয়েছিলেন।

বর্তমানে মাস্ক এবং ট্রাম্পের মধ্যে আবারও মাসে প্রায় একবার করে কথা হচ্ছে। তারা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, চীন এবং বিশ্বের বড় বড় ঘটনাবলী নিয়ে আলোচনা করছেন। তবে ব্যক্তিগতভাবে ট্রাম্প তার সহযোগীদের বলেছেন যে, তাদের সম্পর্কটি এই বিরোধের আগের মতো আর কখনোই ততটা ঘনিষ্ঠ হবে বলে তিনি আশা করেন না। আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনের জন্য মাস্ক 'আমেরিকা প্যাক'-এ অনুদান দেওয়ার পরিকল্পনা করছেন। নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের পক্ষে ১০০ মিলিয়ন ডলার ব্যয়ের ঘোষণা দিলেও মাস্ক বলছেন, গত নির্বাচনে তার যে অত্যন্ত দৃশ্যমান ভূমিকা ছিল কিংবা দক্ষতা সংস্থায় তার যে বিশৃঙ্খল কার্যকাল ছিল, ভোটারদের এবার তেমন কিছুর পুনরাবৃত্তি আশা করা উচিত নয়।

গত বছর 'দ্য ইকোনমিস্ট'-কে মাস্ক বলেছিলেন, ’আমার মনে হয় আমি রাজনীতির সাথে একটু বেশিই জড়িয়ে পড়েছিলাম। সত্যি বলতে, আবেগের বশে গা ভাসিয়ে দিয়েছিলাম।’

ট্রাম্প এবং মাস্ক দুইজনের কথাতেই পরিস্কার সম্পর্কটা হয়তো আর আগের মত উষ্ণ হবে না, তবে একটা কাজের সম্পর্ক গড়ে তোলার ক্ষেত্রে পর্দার আড়ালের সমঝোতাকারীদের চেষ্টা বিফলে যায়নি।

শেয়ার করুন



এ জাতীয় আরো খবর..