কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক জেসন আরডের মরদেহ উদ্ধার

  • নিউজ ডেস্ক

    প্রকাশ :- ২০২৬-০৮-১৫, | ০৯:৫৯:১৮ |

রচনাচুরির (প্লেজিয়ারিজম) অভিযোগের জেরে বিতর্কের কেন্দ্রে থাকা কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক জেসন আরডের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। শুক্রবার দক্ষিণ লন্ডনের ব্যাটারসিতে একটি ঠিকানা থেকে তাকে অচেতন অবস্থায় উদ্ধার করে পুলিশ।

যুক্তরাজ্যের মেট্রোপলিটন পুলিশ জানিয়েছে, তার মৃত্যু অপ্রত্যাশিত হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। তবে এ মুহূর্তে এটিকে সন্দেহজনক মৃত্যু বলে মনে করা হচ্ছে না।

৪১ বছর বয়সী আরডে সম্প্রতি কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান ও শিক্ষা বিভাগের অধ্যাপকের পদ থেকে পদত্যাগ করেছিলেন। তার বিরুদ্ধে গবেষণাকর্মে প্লেজিয়ারিজমের অভিযোগ ওঠার পাশাপাশি তার কিছু অর্জন নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছিল। তবে তিনি এসব অভিযোগ অস্বীকার করেন।

এক বিবৃতিতে আরডের পরিবার বলেছে, ‘এই অসাধারণ বাবা, সঙ্গী, ভাই, চাচা ও সন্তানকে হারিয়ে আমরা গভীরভাবে শোকাহত ও হতবাক।’

পরিবার আরও বলেছে, ‘ভুল তথ্য ছড়ানোর এই প্রচারণা জেসনের জন্য অত্যন্ত কঠিন হয়ে উঠেছিল। তিনি ছিলেন একজন কোমল মনের মানুষ এবং সবসময় সবার মধ্যে ভালো কিছু দেখতে চাইতেন।’

পদত্যাগের আগে ব্যাপক চাপের কথা জানিয়েছিলেন

কেমব্রিজের অধ্যাপক পদ থেকে পদত্যাগের সময় আরডে বলেছিলেন, তাকে ঘিরে চলা বিতর্ক ও প্রকাশ্য সমালোচনা তার ওপর ‘অসহনীয়’ ব্যক্তিগত চাপ তৈরি করেছে।

তিনি বলেছিলেন, একাডেমিক জীবনে সমালোচনা স্বাভাবিক হলেও তার ক্ষেত্রে বিষয়টি ‘শিক্ষাগত মতপার্থক্যের অনেক বাইরে’ চলে গেছে। অভিযোগ, নানা জল্পনা ও প্রকাশ্য মন্তব্য তার এবং তার প্রিয়জনদের ওপর গভীর প্রভাব ফেলেছে বলেও জানিয়েছিলেন তিনি।

তবে পদত্যাগকে নিজের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ মেনে নেয়া হিসেবে বিবেচনা না করার আহ্বান জানিয়েছিলেন আরডে।

কীভাবে শুরু হয় বিতর্ক?

আরডেকে ঘিরে বিতর্কের সূত্রপাত হয় কেমব্রিজের আরেক সাবেক শিক্ষাবিদ নাথান কোফনাসের অভিযোগের পর। কোফনাস নিজেকে ‘রেস রিয়ালিস্ট’ হিসেবে পরিচয় দেন এবং ২০২৪ সালে কেমব্রিজ থেকে চাকরিচ্যুত হন। তিনি আরডের বিভিন্ন গবেষণাকর্মে একাধিক প্লেজিয়ারিজমের ঘটনা খুঁজে পাওয়ার দাবি করেন।

আরডে অবশ্য প্লেজিয়ারিজমের অভিযোগ অস্বীকার করেন। তবে তার আগের একাডেমিক কাজের কিছু ভুলের কথা স্বীকার করে তিনি জানান, অটিজমের কারণে তথ্য বোঝার ক্ষেত্রে তিনি কখনো কখনো অনুকরণের ওপর নির্ভর করতেন।

তিনি এক সাক্ষাৎকারে অভিযোগের তীব্রতা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, একাডেমিক বিষয় নিয়ে বিতর্ক হওয়া স্বাভাবিক; কিন্তু তাকে মিথ্যাবাদী বা কল্পনাপ্রবণ ব্যক্তি হিসেবে উপস্থাপন করা ‘গ্রহণযোগ্য নয়’।

কেমব্রিজে তদন্ত চলছিল

আরডের পিএইচডি প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান লিভারপুল জন মুরস ইউনিভার্সিটি (LJMU) তার থিসিসে প্লেজিয়ারিজমের অভিযোগ তদন্ত করে। বিশ্ববিদ্যালয়টি জানিয়েছিল, আরডে প্লেজিয়ারিজম করেছেন—এমন সিদ্ধান্তে তারা পৌঁছায়নি।

তবে আরডের নিয়োগ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন ওঠার পর কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় চলতি সপ্তাহে তার নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে একটি স্বাধীন তদন্তের ঘোষণা দেয়।

কেমব্রিজের উপাচার্য অধ্যাপক ডেবোরা প্রেন্টিস বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়জুড়ে এবং এর বাইরেও আরডের নিয়োগ নিয়ে যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, তা তিনি বুঝতে পারছেন। তদন্তটি ‘পূর্ণাঙ্গ, স্বচ্ছ ও স্বাধীনভাবে’ পরিচালিত হবে বলেও জানান তিনি।

কেমব্রিজের প্রথম সারির কৃষ্ণাঙ্গ অধ্যাপকদের একজন

২০২৩ সালে মাত্র ৩৭ বছর বয়সে কেমব্রিজে অধ্যাপক হিসেবে নিয়োগ পেয়ে আরডে বিশ্ববিদ্যালয়টির অন্যতম কনিষ্ঠ কৃষ্ণাঙ্গ অধ্যাপক হন। তার নিয়োগ সে সময় ব্রিটিশ একাডেমিয়ায় বৈচিত্র্যের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসেবে প্রশংসিত হয়েছিল। যুক্তরাজ্যের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে মোট অধ্যাপকদের মাত্র প্রায় ১ শতাংশ কৃষ্ণাঙ্গ—ফলে আরডের মতো নিয়োগকে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে দেখা হয়েছিল। তবে তার মৃত্যুর পর কেমব্রিজকে এখন তার নিয়োগ প্রক্রিয়া এবং একজন অধ্যাপকের প্রতি বিশ্ববিদ্যালয়ের দায়িত্ব ও সহায়তার বিষয়েও কঠিন প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হবে।

বন্ধুর দাবি, মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিলেন আরডে

আরডের বন্ধু ও ব্ল্যাক স্টাডিজের অধ্যাপক কেহিন্ডে অ্যান্ড্রুজ বিবিসিকে বলেন, কেমব্রিজ থেকে পদত্যাগের পর আরডে খুবই ভেঙে পড়েছিলেন।

তার ভাষ্য অনুযায়ী, আরডে ‘খুবই বিপর্যস্ত’ ছিলেন, বাড়ি থেকে বের হওয়াও প্রায় বন্ধ করে দিয়েছিলেন এবং অনেক ওজন হারিয়েছিলেন।

অ্যান্ড্রুজ বলেন, এ ঘটনা কৃষ্ণাঙ্গ শিক্ষাবিদদের ওপর একাডেমিয়ায় কী ধরনের চাপ তৈরি হয়, সে বিষয়ে ‘সতর্কবার্তা’ হিসেবে কাজ করা উচিত। তথ্যসূত্র: বিবিসি

শেয়ার করুন



এ জাতীয় আরো খবর..