নীতিমালার তোয়াক্কা না করায় চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপকূলজুড়ে গড়ে ওঠা ইয়ার্ডে একের পর এক ঘটছে মৃত্যুর ঘটনা। ইয়ার্ডে কোনো রকম নিরাপত্তাব্যবস্থা না থাকায় চরম ঝুঁকি নিয়ে কাজ করছেন এখানকার শ্রমিকেরা। দীর্ঘদিন ধরে এসব শিপ ইয়ার্ডে দুর্ঘটনায় শত শত শ্রমিক মারা যাওয়ায় সরকার এই শিল্পকে শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীনে একটি নীতিমালার আওতায় নিয়ে আসে। নীতিমালার শর্তসমূহে পরিবেশ ও শ্রমিকের নিরাপত্তার বিষয়ে জোর দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এসব ইয়ার্ডে নীতিমালার শর্ত পূরণ না করে কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ায় বিভিন্ন সময়ে ঘটছে এসব দুর্ঘটনা।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের (বিলস) তথ্যসূত্রে জানা গেছে, গত ১০ বছরে সীতাকুণ্ডের বিভিন্ন শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ডে নানা ধরনের দুর্ঘটনায় ১৪৯ জন নিহত হয়েছেন। এ সময় আহত হন প্রায় ৩০০ শ্রমিক। ২০১৫ সালে দুর্ঘটনায় মারা গেছেন ১৬ জন, ২০১৬ সালে ১৮ জন, ২০১৭ সালে ১৯ জন, ২০১৮ সালে ১৩ জন, ২০১৯ সালে ২৩ জন, ২০২০ সালে ১০ জন, ২০২১ সালে ১৩ জন, ২০২২ সালে ৭ জন, ২০২৩ সালে ৭ জন, ২০২৪ সালে ৭ জন এবং ২০২৫ সালে ৪ জন, ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে তিনজন নিহত হন।
সবশেষ গতকাল শুক্রবার সকাল ১০টার দিকে সীতাকুণ্ড উপজেলার ভাটিয়ারীর ফেরদৌস শিপ ইয়ার্ডে স্ক্র্যাপ জাহাজের গ্যাস সিলিন্ডার থেকে ছড়িয়ে পড়া বিষাক্ত গ্যাসে ৯ জন নিহত হয়েছেন। ভাটিয়ারি ইউনিয়নের স্টেশন রোড এলাকার ফেরদৌস স্টিল নামের একটি কারখানায় এ ঘটনা ঘটে। ফায়ার সার্ভিসের ধারণা, বিষাক্ত গ্যাস থেকে তাদের মৃত্যু হতে পারে। চট্টগ্রাম জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (বিশেষ শাখা) জুনায়েত কাউছার ৯ জন নিহতের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। এদিকে এ ঘটনায় শ্রমিকেরা অসুস্থ হয়ে পড়ার পর তাদের সময়মতো চিকিৎসা দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ সহকর্মীদের।
ফায়ার সার্ভিস ও হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, ইয়ার্ডসংলগ্ন সাগরে থাকা একটি জাহাজ কাটার সময় দুর্ঘটনার পর ছয়জনকে উদ্ধার করে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে পাঁচজনকে মৃত ঘোষণা করেন চিকিৎসকেরা। আহত একজনকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনিও মারা যান।
ফায়ার সার্ভিস চট্টগ্রামের কুমিরা স্টেশনের সিনিয়র স্টেশন কর্মকর্তা মো. মামুন বলেন, ফেরদৌস স্টিল শিপইয়ার্ড থেকে তিনটি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। পরে আরও তিনজনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। তিনি বলেন, জাহাজটি কাটার সময় সেখানে বিষাক্ত গ্যাস ছড়িয়ে পড়ে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে।
ইয়ার্ডের ম্যানেজার মো. ইউসুফ বলেন, একটি এলএনজি জাহাজ কাটা হচ্ছিল এবং জাহাজটি কাটার কাজ শেষ পর্যায়ে ছিল। তিনি বলেন, জাহাজের একটি অংশে তরল বর্জ্য দেখতে পেয়ে সেফটি অফিসারসহ কয়েকজন সেখানে গিয়েছিলেন। সেখানেই দুর্ঘটনা ঘটে।
সীতাকুণ্ড থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মো. আলমগীর জানান, হাসপাতালে ছয়জনের মরদেহ রাখা আছে। ঘটনাস্থল থেকে আরও দুজনের মরদেহ হাসপাতালে নেওয়া হয়। বিকেলে চট্টগ্রামের একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান আরেক শ্রমিক।
গত ১০ বছরে সীতাকুণ্ডের বিভিন্ন শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ডে নানা ধরনের দুর্ঘটনায় ১৪৯ জন নিহতের বিষয়টি নিশ্চিত করেন বিলসের চট্টগ্রাম সেন্টারের কো-অর্ডিনেটর ও জাহাজভাঙা শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন ফোরামের সদস্যসচিব ফজলুল কবির মিন্টু। তিনি বলেন, ওই জাহাজের ভেতরে জমে থাকা তরল বর্জ্য বা গ্যাসের উপস্থিতি পরীক্ষা না করে শ্রমিকদের প্রবেশের সুযোগ দেওয়া হয়েছিল, যা মালিকপক্ষের গাফিলতি। তাছাড়া বন্ধের দিন সেখানে কাজ চলছিল। বিষয়গুলো তদন্ত করে দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে।
ঘটনাটি খুবই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা বলে মন্তব্য করে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, এ ঘটনায় তদন্ত কমিটি হতে যাচ্ছে। কমিটির রিপোর্টের পরিপ্রেক্ষিতে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এখানে কারো পক্ষে-বিপক্ষে কিছু নেই। সরকারের দায়িত্ব তদন্তে সঠিক তথ্য বের করে আনা। শুক্রবার বিকেলে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিহতদের স্বজনদের সান্ত্বনা ও আহত শ্রমিকের চিকিৎসার খোঁজ নিতে এসে তিনি এসব মন্তব্য করেন।
জাহাজ গ্যাসমুক্ত না করায় দুর্ঘটনা : ফায়ার সার্ভিস চট্টগ্রামের সহকারী পরিচালক তৌফিকুল ইসলাম বলেন, ফেরদৌস স্টিল শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ড ও রিসাইক্লিং কারখানায় যে জাহাজটি কাটা হচ্ছে, সেটি এলএনজি পরিবহন করত। এ ধরনের জাহাজ আগে গ্যাসমুক্ত করে তারপর কাটতে হয়। কিছু কিছু ট্যাংকে ফ্লোরিন, কার্বন মনোক্সাইড, কার্বন ডাই-অক্সাইড থাকতে পারে। এগুলো খুবই বিষাক্ত। কারখানা কর্তৃপক্ষ ট্যাংক গ্যাসমুক্ত না করে কাটার কারণে এ দুর্ঘটনা ঘটেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। কারখানার নিরাপত্তাব্যবস্থাও ছিল খুবই দুর্বল।
জাহাজ কাটার আগে গ্যাসমুক্ত করা হয়েছে কি না, সেটি দেখভাল করেন বিস্ফোরক অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা। এমন প্রশ্নের জবাবে বিস্ফোরক অধিদপ্তর চট্টগ্রামের পরিদর্শক এস এম সাখাওয়াত হোসেন বলেন, জাহাজটি এলএনজি পরিবাহী। মূলত কার্গো গ্যাস ট্যাংক গ্যাসমুক্ত কি না, তারা বিষয়টি দেখেছেন। এ ছাড়া ইঞ্জিনকক্ষে তেল রয়েছে এমন ট্যাংকগুলো গ্যাসমুক্ত আছে কি না, তা দেখার দায়িত্ব রয়েছে তাদের। তবে এর বাইরে ছোট ছোট কিছু চেম্বার ট্যাংক থাকে, যেগুলোতে হাইড্রোজেন সালফাইড, অ্যামোনিয়া, কার্বন ডাই-অক্সাইড, কার্বন মনোক্সাইড ইত্যাদি গ্যাস রাখা হয়। সেগুলো থেকে ঘটনাটি ঘটেছে কি না, বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
নিরাপত্তা ত্রুটির অভিযোগে মামলা হয়েছিল ফেরদৌস স্টিলের বিরুদ্ধে : একাধিকবার তাগিদ দেওয়ার পরও পেশাগত নিরাপত্তা নিশ্চিত না করার অভিযোগে গত ১৫ জুলাই সীতাকুণ্ডের ‘ফেরদৌস করপোরেশন লিমিটেডের’ বিরুদ্ধে শ্রম আদালতে মামলা করেছিল কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর (ডিআইএফই)। কিন্তু এর পরেও নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত না করে শিপইয়ার্ডের কাজ চালানোর একপর্যায়ে গতকাল বিষাক্ত গ্যাস ছড়িয়ে ৯ জন শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে।
ডিআইএফইয়ের এক তাৎক্ষণিক প্রতিবেদনে বলা হয়, ইয়ার্ডে নোঙর করা এলএনজি পরিবহন করা একটি পুরোনো জাহাজের ভেতরে স্ক্র্যাপ কাটিংয়ের কাজ করছিলেন শ্রমিকেরা। কাজ চলাকালে হঠাৎ জাহাজের ভেতরে গ্যাস লিকেজ হয়ে অতিরিক্ত কার্বন মনোক্সাইড ছড়িয়ে পড়ে। এতে অক্সিজেনের অভাবে তীব্র শ্বাসকষ্ট ও অনেক শ্রমিক অচেতন হয়ে পড়েন। পরে মারা যান তারা।
একাধিক নোটিশ ও মামলা : প্রতিবেদন সূত্রে জানা গেছে, ডিআইএফই চট্টগ্রাম কার্যালয় থেকে কারখানাটি আগে একাধিকবার পরিদর্শন করে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছিল। চট্টগ্রাম কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের উপমহাপরিদর্শক মোহাম্মদ মাহবুবুল হাসান বলেন, নিয়মিত পরিদর্শনের অংশ হিসেবে ওই শিপইইয়ার্ডে গিয়ে কিছু ব্যত্যয় দেখতে পান কর্মকর্তারা। এরপর এ বছরের ২ ফেব্রুয়ারি ফেরদৌস স্টিলকে একটি নোটিশ দেওয়া হয়। এরপর কয়েক দফা তাগিদ দেওয়ার পরও কারখানা কর্তৃপক্ষ নির্দেশনা বাস্তবায়ন না করায় গত ১৫ জুলাই চট্টগ্রাম শ্রম আদালতে কারখানাটির বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়। পরিদর্শক মো. সাহেদ পারভেজ তালুকদার বাদী হয়ে মামলাটি করেছিলেন।
এ জাতীয় আরো খবর..