সর্বনিম্ন এডিপি বাস্তবায়নের রেকর্ড

  • নিউজ ডেস্ক

    প্রকাশ :- ২০২৬-০৭-৩১, | ১২:৫১:৪৭ |
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের জেরে দেশের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে যে স্থবিরতা তৈরি হয়েছিল, তা এখনো কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়নি। বরং অন্তর্বর্তী সরকারের বিদায়ের পর নির্বাচিত সরকারের প্রথম অর্থবছরেই বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়ন নেমে এসেছে দেশের ইতিহাসের সর্বনিম্ন পর্যায়ে।

২০২৫-২৬ অর্থবছরে এডিপি বাস্তবায়নের হার দাঁড়িয়েছে মাত্র ৬৭.৫২ শতাংশ, যা গত দুই দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন এবং দেশের উন্নয়ন ব্যবস্থাপনায় এক নজিরবিহীন নেতিবাচক উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি) গতকাল বৃহস্পতিবার প্রকাশিত চূড়ান্ত প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরে সংশোধিত এডিপির আকার ছিল দুই লাখ আট হাজার ৯৩৫ কোটি ৫৩ লাখ টাকা। এর মধ্যে সরকারের নিজস্ব অর্থায়ন ছিল এক লাখ ২৮ হাজার কোটি টাকা, বৈদেশিক সহায়তা ৭২ হাজার কোটি টাকা এবং সংস্থার নিজস্ব অর্থায়ন আট হাজার ৯৩৬ কোটি টাকা।

অথচ অর্থবছর শেষে মোট ব্যয় হয়েছে মাত্র এক লাখ ৪১ হাজার ৭১ কোটি ৮০ লাখ টাকা। ফলে বরাদ্দের বড় একটি অংশ অব্যবহৃত থেকে গেছে।

পরিসংখ্যান বলছে, সদ্যঃসমাপ্ত অর্থবছরের বাস্তবায়ন হার শুধু আগের বছরের তুলনায় নয়, গত দুই দশকের যেকোনো সময়ের চেয়েও কম। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যেও এডিপি বাস্তবায়নের হার ছিল ৬৮.১৮ শতাংশ।

আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ অর্থবছর ২০২৩-২৪-এ এই হার ছিল ৮০.৬৩ শতাংশ। এর আগে ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৮৫.১৭ শতাংশ এবং ২০২১-২২ অর্থবছরে ৯২.৭৪ শতাংশ এডিপি বাস্তবায়িত হয়েছিল। এমনকি করোনা মহামারির সময়ও ২০১৯-২০ অর্থবছরে বাস্তবায়নের হার ছিল ৮০.৩৯ শতাংশ। আইএমইডির ওয়েব সাইট বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০০৪-০৫ অর্থবছর থেকে ২০২৩-২৪ পর্যন্ত কোনো অর্থবছরেই এডিপি বাস্তবায়ন ৮০ শতাংশের নিচে নামেনি। ফলে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের এই ফলাফল দেশের উন্নয়ন ইতিহাসে নতুন এক নেতিবাচক রেকর্ড তৈরি করেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর প্রকল্পগুলো পুনর্মূল্যায়ন, অগ্রাধিকার পুনর্নির্ধারণ এবং অনেক প্রকল্পের কার্যক্রম ধীর হয়ে যাওয়ায় উন্নয়ন ব্যয়ে বড় ধরনের প্রভাব পড়েছে। তবে নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরও বাস্তবায়নের গতি প্রত্যাশিতভাবে বাড়েনি। ফলে উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে স্থবিরতা আরো দীর্ঘায়িত হয়েছে।

আইএমইডির প্রতিবেদনে অর্থবছরের শেষ মাসে ব্যাপক অর্থ ব্যয়ের চিত্রও উঠে এসেছে। প্রথম ১১ মাসে ব্যয় হয়েছিল প্রায় এক লাখ ৭৬৩ কোটি ৬৯ লাখ টাকা। অথচ শুধু জুন মাসেই ব্যয় করা হয়েছে ৪০ হাজার ৩০৮ কোটি ১২ লাখ টাকা, যা মোট বরাদ্দের প্রায় ১৯.২৯ শতাংশ। অর্থনীতিবিদদের মতে, বছরের শুরুতে কাজের গতি কম রেখে শেষ মাসে তড়িঘড়ি করে অর্থ ব্যয়ের এই ‘জুন ক্লোজিং’ সংস্কৃতি দীর্ঘদিনের সমস্যা। এতে প্রকল্পের মান ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি অনিয়ম, অপচয় ও দুর্নীতির ঝুঁকিও বেড়ে যায়।

মন্ত্রণালয় ও বিভাগভিত্তিক বাস্তবায়নেও বড় বৈষম্য দেখা গেছে। সবচেয়ে খারাপ অবস্থায় রয়েছে সংসদ বিষয়ক সচিবালয়, যেখানে বাস্তবায়ন হয়েছে মাত্র ৭.৫০ শতাংশ। অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের বাস্তবায়ন হার ১৭.৪২ শতাংশ, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের ১৯.৪২ শতাংশ এবং নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের ২৯.৯০ শতাংশ। গুরুত্বপূর্ণ স্বাস্থ্য সেবা বিভাগও বরাদ্দের মাত্র ৩১.৯৪ শতাংশ বাস্তবায়ন করতে পেরেছে, যা জনস্বাস্থ্য খাতের জন্য উদ্বেগজনক।

অন্যদিকে কয়েকটি মন্ত্রণালয় তুলনামূলক ভালো দক্ষতা দেখিয়েছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সর্বোচ্চ ৯৯.৫৩ শতাংশ বাস্তবায়ন করেছে। এ ছাড়া সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ ৯১.৯৮ শতাংশ, পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় ৮৮.৭৭ শতাংশ এবং বিদ্যুৎ বিভাগ ৮৩.৭৩ শতাংশ বাস্তবায়ন হার অর্জন করেছে। টাকার অঙ্কে সবচেয়ে বেশি ব্যয় করেছে স্থানীয় সরকার বিভাগ। বিভাগটি ৩১ হাজার ৮১৪ কোটি ৮১ লাখ টাকা ব্যয় করেছে, যা উন্নয়ন ব্যয়ের সর্বোচ্চ অংশ। বিপরীতে সবচেয়ে কম অর্থ ব্যয় করেছে সংসদ বিষয়ক সচিবালয়। অর্থনীতিবিদ ও উন্নয়ন বিশ্লেষকদের মতে, এডিপির আকার বাড়ানোই উন্নয়নের একমাত্র সমাধান নয়। বরং প্রকল্প পরিকল্পনা, অনুমোদন, দরপত্র, বাস্তবায়ন ও তদারকির প্রতিটি ধাপে সুশাসন নিশ্চিত করতে হবে।

শেয়ার করুন



এ জাতীয় আরো খবর..