✕
নিউজ ডেস্ক
প্রকাশ :- ২০২৬-০৭-৩০, | ১৯:২৩:২৪ |পূর্ব কঙ্গোতে দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে প্রাণঘাতী ইবোলা ভাইরাসের প্রার্দুভাব। গেল এক সপ্তাহে দেশটিতে ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে ১,৫০০-এরও বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় গৃহীত পদক্ষেপের পরও ভাইরাসটির সংক্রমণ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে।
সরকারের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার পর্যন্ত মোট ৩,৪৪২ জন আক্রান্ত এবং ১,৫২১ জনের মৃত্যুর বিষয়টি নথিভুক্ত করা হয়েছে। গত ১৫মে এই প্রাদুর্ভাবের ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল। এর জন্য দায়ী করা হচ্ছে ‘বুন্দিবুগিও’ ভাইরাসকে, যার বিরুদ্ধে লড়াই করার মতো কোনো অনুমোদিত টিকা বা চিকিৎসা পদ্ধতি এখনো নেই।
সরকারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ৭৯৭ জন রোগী আইসোলেশনে বা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন এবং ৬১৫ জন রোগী সুস্থ হয়ে উঠেছেন। তবে আক্রান্ত ব্যক্তিদের সংস্পর্শে আসা অন্যদের শনাক্ত ও পর্যবেক্ষণের (কন্টাক্ট ট্রেসিং) কার্যক্রম এখনো ধীরগতিতে চলছে; সারাদেশে শনাক্ত হওয়া সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের মধ্যে মাত্র ৭৮ শতাংশকে পর্যবেক্ষণের আওতায় আনা সম্ভব হয়েছে। অথচ স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের মতে, রোগের সংক্রমণ রোধ করতে হলে এই হার অন্তত ৯৫ শতাংশ হওয়া প্রয়োজন।
ওই অঞ্চলে সশস্ত্র সংঘাত ও অবৈধ খনি খনন কার্যক্রমের ফলে সৃষ্ট বাস্তুচ্যুতির কারণে, সংক্রমিত ব্যক্তিদের সংস্পর্শে আসা হাজার হাজার মানুষকে খুঁজে বের করা বা তাদের ওপর নজর রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। এই প্রাদুর্ভাবটি মূলত পূর্ব কঙ্গোর প্রত্যন্ত ইতুরী প্রদেশে সীমাবদ্ধ। যেখানে মোট আক্রান্তের প্রায় ৯০ শতাংশ ঘটনা ঘটেছে। তবে দেশটির অন্যতম বড় শহর কিসাঙ্গানিসহ আরও পাঁচটি প্রদেশেও এর উপস্থিতি নিশ্চিত হওয়া গেছে। জুনের মাঝামাঝি সময়ে শেষ রোগী সুস্থ হয়ে হাসপাতাল ছাড়ার পর, প্রতিবেশী দেশ উগান্ডা মঙ্গলবার নিজেদের ইবোলামুক্ত ঘোষণা করেছে।
ইবোলা একটি বিরল কিন্তু অত্যন্ত সংক্রামক রোগ; বমি, রক্ত বা বীর্যের মতো শারীরিক তরলের সংস্পর্শে এটি ছড়াতে পারে। এই রোগে আক্রান্ত হলে শারীরিক অবস্থা গুরুতর হয়ে ওঠে এবং প্রায়শই তা প্রাণঘাতী হয়। পূর্ববর্তী যেকোনো প্রাদুর্ভাবের তুলনায় এবারের প্রাদুর্ভাবে মৃত্যুর হার ও গতি অনেক বেশি। এর আগে ২০১৪-২০১৬ সালের প্রাদুর্ভাবে ২৮ হাজার মানুষ আক্রান্ত হয়েছিল এবং ১১ হাজারের বেশি মানুষ মারা গিয়েছিল। সেই সময় মৃতের সংখ্যা ১ হাজারে পৌঁছাতে প্রায় আট মাস সময় লেগেছিল।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানিয়েছে, বিশ্বজুড়ে এই রোগ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি কম। কারণ ইবোলা বাতাসের মাধ্যমে নয়, বরং শারীরিক তরলের সরাসরি সংস্পর্শে ছড়ায়; ফলে শ্বাসতন্ত্রের ভাইরাসের তুলনায় এটি ছড়িয়ে পড়া অনেক কঠিন। সংস্থাটি আরও জানায়, আক্রান্ত অঞ্চলের বাইরে যেসব রোগী শনাক্ত হয়েছে, তাদের দ্রুত চিহ্নিত ও বিচ্ছিন্ন করা সম্ভব হয়েছে, যার ফলে রোগটির সংক্রমণ হার কমিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে। তবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, কঙ্গোর ভেতরে এই রোগ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি এখনো বেশি।
বর্তমান প্রাদুর্ভাবের দ্রুত বিস্তারের পাশাপাশি জনমনে উদ্বেগও বাড়ছে। কারণ আক্রান্ত প্রদেশগুলোর অনেক এলাকায় পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়েছে; এছাড়া ক্ষুব্ধ স্থানীয় বাসিন্দা ও বিদ্রোহীদের হামলার আশঙ্কায় নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের কারণে সাম্প্রতিক দিনগুলোতে অনেক স্বাস্থ্যকর্মী ও উদ্ধারকারী দল সেসব এলাকা থেকে সরে এসেছে।
প্রাণঘাতী এই ভাইরাসটির অস্তিত্ব নিয়ে ভুল তথ্য প্রচার এবং প্রাদুর্ভাব রোধে প্রথাগত শেষকৃত্য অনুষ্ঠানের ওপর বিধিনিষেধ আরোপের ফলে স্থানীয় বাসিন্দাদের একাংশ ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছে এবং স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রগুলোতে হামলার ঘটনা ঘটেছে।
ইতুরীর নিয়াকুন্দে স্বাস্থ্য এলাকায় ইবোলা মোকাবিলায় সহায়তাকারী আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো গত ১৫ জুলাই একটি হাসপাতাল ও চিকিৎসা কেন্দ্রে হামলার ঘটনার পর সাময়িকভাবে কার্যক্রম স্থগিত করেছিল। একজন রোগীর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে ওই হামলার সূত্রপাত হয়েছিল।
কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, আফ্রিকা সিডিসি, সামারিটানস পার্স ও মার্সি কর্পস-এর মতো সহায়তা প্রদানকারী সংস্থাগুলোর সরে আসার ফলে রোগ পর্যবেক্ষণ, আক্রান্তের সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের শনাক্তকরণ (কন্ট্যাক্ট ট্রেসিং) এবং প্রয়োজনীয় সামগ্রী সরবরাহের কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে।
ওই স্বাস্থ্য অঞ্চলের প্রধান চিকিৎসা কর্মকর্তা ডা. ডেজিরে দুয়াবো জানান, প্রয়োজনীয় সামগ্রী, সরঞ্জাম ও পরিচালনগত সহায়তার বড় অংশই এই সহযোগী সংস্থাগুলো সরবরাহ করেছিল। তিনি সতর্ক করে বলেন, বর্তমানে অবশিষ্ট সামান্য মজুদও ‘প্রায় ফুরিয়ে এসেছে’।
গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্রের ন্যাশনাল পাবলিক হেলথ ইনস্টিটিউটের ইবোলা মোকাবিলা কার্যক্রমের ইনসিডেন্ট ম্যানেজার পিয়ের আকিলিমালি বলেন, নিয়াকুন্ডের মতো হামলার ঘটনাগুলো স্বাস্থ্যকর্মীদের মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি করছে এবং তাদের দায়িত্ব পালনে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
তিনি বলেন, তারা একদিকে যেমন সংক্রমণের ঝুঁকির মধ্যে কাজ করছেন, তেমনি তাদের ব্যক্তিগত নিরাপত্তার ঝুঁকিও রয়েছে। অন্যদিকে স্থানীয় স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নিরাপত্তা পরিস্থিতি এখন স্থিতিশীল হয়েছে এবং তারা সহযোগী সংস্থাগুলোকে ফিরে আসার আহ্বান জানাচ্ছেন; এদিকে আফ্রিকা সিডিসি জানিয়েছে, আগামী সপ্তাহেই তাদের দলগুলোকে পুনরায় কাজে মোতায়েন করা সম্ভব হতে পারে।
সূত্র: অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস।