✕
নিউজ ডেস্ক
প্রকাশ :- ২০২৬-০৭-৩০, | ১৯:১৮:৫৮ |ভারতে বলা হয়- ‘ভয়ের পরেই জয়’। কিন্তু পাকিস্তানে হয়তো গল্পটা অন্য রকম- ‘বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে আছে জিপ (নিরাপত্তা বাহিনীর গাড়ি)’।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) প্রকাশিত এক পাকিস্তানি তরুণীর ভিডিওতে উচ্চারিত এই কথাগুলো দেশটির বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতার একটি কঠিন চিত্র তুলে ধরেছে।
ভিডিওটির ভাষ্য অনুযায়ী, রাষ্ট্রের সমালোচনা বা ভিন্নমত প্রকাশের সামান্য চেষ্টা করলেও নিরাপত্তা বাহিনীর কঠোর পদক্ষেপের মুখে পড়তে হয়। অনেক ক্ষেত্রেই আন্দোলনকারীরা নিখোঁজ হয়ে যান।
বিশ্লেষকদের মতে, ভিন্নমত দমনের এই প্রবণতার সবচেয়ে বড় মূল্য দীর্ঘদিন ধরে দিচ্ছে বেলুচিস্তান। সেখানে বহু তরুণের গুম হওয়ার অভিযোগ রয়েছে। সম্প্রতি জোরপূর্বক গুমের বিরুদ্ধে শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের নেতৃত্ব দেওয়া মানবাধিকারকর্মী ডা. মাহরাং বেলুচকে কোয়েটার একটি সন্ত্রাসবিরোধী আদালত যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছেন।
এমন পরিস্থিতিতে পাকিস্তান-নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের রাজনৈতিক অস্থিরতা নতুন করে আন্তর্জাতিক মনোযোগ আকর্ষণ করছে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, বিষয়টি শুধু কাশ্মীরের নয়; এটি পাকিস্তানের ভেতরে গণতান্ত্রিক অধিকার ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার প্রশ্নও সামনে নিয়ে এসেছে।
সাম্প্রতিক সময়ে পাকিস্তান-নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীর থেকে প্রকাশিত বিভিন্ন ছবি ও ভিডিওতে দেখা গেছে, রক্তাক্ত সড়ক, গুলিবিদ্ধ আন্দোলনকারী, নিখোঁজ স্বজনদের খুঁজে বেড়ানো পরিবার এবং বেসামরিক মানুষের মুখোমুখি সশস্ত্র নিরাপত্তা বাহিনী।
এসব দৃশ্য পাকিস্তানের দীর্ঘদিনের সেই আন্তর্জাতিক অবস্থানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে মন্তব্য করছেন সমালোচকরা, যেখানে ইসলামাবাদ নিজেকে জম্মু ও কাশ্মীরের জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষাকারী হিসেবে তুলে ধরে।
যদিও সহিংসতায় হতাহতের প্রকৃত সংখ্যা নিয়ে বিভিন্ন পক্ষের ভিন্ন ভিন্ন দাবি রয়েছে, তবে দমন-পীড়ন যে ব্যাপক আকার ধারণ করেছে, সে বিষয়ে পর্যবেক্ষকদের মধ্যে তেমন দ্বিমত নেই।
বর্তমান সংকটের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে জয়েন্ট আওয়ামি অ্যাকশন কমিটি (জেএএসি), যা বিভিন্ন নাগরিক সংগঠন ও অধিকারকর্মীদের একটি জোট।
পাকিস্তান সরকার সন্ত্রাসবিরোধী আইনে সংগঠনটিকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে। গত কয়েক সপ্তাহ ধরে রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব, প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা এবং নির্বাচন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে সংগঠনটির নেতৃত্বে বিক্ষোভ চলছে।
এদিকে নির্বাচন নিয়েও কারচুপি, সহিংসতা এবং বর্জনের অভিযোগ উঠেছে। পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান এখনও কারাগারে রয়েছেন এবং তার দল পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ (পিটিআই) নির্বাচন বর্জন করেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান সংকট শুধু একটি নির্বাচনকে ঘিরে নয়।
মূল প্রশ্ন হলো- পাকিস্তানের নাগরিকরা কি রাষ্ট্রের শত্রু হিসেবে চিহ্নিত না হয়ে শান্তিপূর্ণভাবে প্রতিবাদ করার অধিকার রাখেন?
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নও সামনে এসেছে- বেলুচিস্তানের পর পাকিস্তান কি আরেকটি অঞ্চলে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা মোকাবিলার ঝুঁকি নিতে পারবে?
পাকিস্তানের তরুণদের মধ্যে আরেকটি প্রশ্ন জোরালোভাবে উঠছে। তাদের অভিযোগ, ভারতে তরুণদের বিভিন্ন আন্দোলনের দৃশ্য পাকিস্তানের টেলিভিশন চ্যানেলগুলো গুরুত্ব দিয়ে প্রচার করলেও, মিরপুর ও রাওয়ালকোটে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ এবং বিক্ষোভের খবর দেশটির মূলধারার গণমাধ্যমে প্রায় সম্পূর্ণভাবে আড়াল করা হয়েছে।
এই বৈপরীত্য দেশটির তরুণ সমাজের নজর এড়ায়নি বলে বিশ্লেষকদের মন্তব্য।
পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করেছে পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফের একটি মন্তব্য।
বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে সরকারের পদক্ষেপের পক্ষে সাফাই গেয়ে তিনি বলেন, পাকিস্তান-নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের আন্দোলনকারীদের তিনি ‘ভারতের মতোই শত্রু’ হিসেবে দেখেন।
তার এই মন্তব্য নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
সমালোচকদের মতে, রাষ্ট্র যখন নিজের নাগরিকদেরই বহিরাগত শত্রুর দৃষ্টিতে দেখতে শুরু করে, তখন গণতন্ত্রের মৌলিক ভিত্তিই প্রশ্নের মুখে পড়ে।
১২টি সংরক্ষিত আসন নিয়ে বিরোধ
বর্তমান সংকট রাতারাতি তৈরি হয়নি। পাকিস্তান সরকার আজাদ জম্মু ও কাশ্মির আইনসভায় ১২টি আসন সংরক্ষণ করে, যেগুলো কয়েক দশক আগে জম্মু ও কাশ্মির থেকে পাকিস্তানে চলে যাওয়া শরণার্থীদের জন্য বরাদ্দ করা হয়।
এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে জয়েন্ট আওয়ামি অ্যাকশন কমিটি। তারা নির্বাচন বর্জনের ডাক দেয় এবং ধারাবাহিক বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করে।
জেএএসি বলছে, তাদের উদ্দেশ্য নির্বাচনে অংশ নেওয়া নয়; বরং ওই অঞ্চলের বর্তমান বাসিন্দাদের সম্মতি ও স্বার্থের ভিত্তিতে রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা।
সংলাপের বদলে দমননীতি?
সমালোচকদের অভিযোগ, ইসলামাবাদ সংলাপের পথ না বেছে আন্দোলনকে অপরাধ হিসেবে দেখেছে।
সরকার জেএএসিকে নিষিদ্ধ করার পাশাপাশি সংগঠনের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে ব্যাপক অভিযান শুরু করে।
রাওয়ালকোট থেকে পাওয়া বিভিন্ন প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, বিক্ষোভ ছত্রভঙ্গ করতে নিরাপত্তা বাহিনী সরাসরি গুলি চালায়।
বিভিন্ন সূত্রের তথ্যানুযায়ী, নির্বাচনকে ঘিরে সহিংসতায় অন্তত ৪০ জন নিহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে ৩৪ জন বিক্ষোভকারী এবং ছয়জন পুলিশ ও আধাসামরিক বাহিনীর সদস্য।
তবে সব বিক্ষোভ শান্তিপূর্ণ ছিল কি না অথবা নিরাপত্তা বাহিনীর প্রতিটি পদক্ষেপ যৌক্তিক ছিল কি না-তা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমেই নিশ্চিত হওয়া সম্ভব বলে পর্যবেক্ষকদের মত।
জাতিসংঘের তদন্ত দাবি
জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার ভলকার টুর্ক এই সহিংসতার ঘটনায় দ্রুত, নিরপেক্ষ ও পূর্ণাঙ্গ তদন্তের আহ্বান জানিয়েছেন।
তিনি শুধু হতাহতের ঘটনাই নয়, সন্ত্রাসবিরোধী আইনে একটি নাগরিক সংগঠনকে নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
তার মতে, কোনও নাগরিক সংগঠনকে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করা এবং শান্তিপূর্ণ সমাবেশের অধিকার সীমিত করা মৌলিক স্বাধীনতার জন্য গুরুতর উদ্বেগের বিষয়।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হলো দীর্ঘদিন ধরে মোবাইল ফোন ও ইন্টারনেট সেবা বন্ধ থাকা।
খবরে বলা হয়েছে, কয়েক সপ্তাহ ধরে পুরো এলাকায় যোগাযোগ ব্যবস্থা কার্যত বিচ্ছিন্ন রয়েছে।
এমনকি পাকিস্তান পিপলস পার্টির (পিপিপি) চেয়ারম্যান বিলাওয়াল ভুট্টো জারদারিও এত দীর্ঘ সময় যোগাযোগ ব্যবস্থা বন্ধ রাখার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।
তার মতে, পুরো একটি জনগোষ্ঠীকে যোগাযোগ থেকে বিচ্ছিন্ন করে রাখা লক্ষ্যভিত্তিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা নয়; বরং এটি সমষ্টিগত শাস্তির ধারণা সৃষ্টি করে।
বিশ্লেষকদের মতে, রাওয়ালকোট এখন শুধু একটি শহরের নাম নয়; এটি পাকিস্তান-নিয়ন্ত্রিত কাশ্মিরে ভিন্নমত সহ্য করার ক্ষেত্রে ইসলামাবাদের অবস্থানের এক গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা।
একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রকে বিচার করা হয় সরকার-সমর্থকদের সঙ্গে কেমন আচরণ করে তা দিয়ে নয়; বরং যারা শান্তিপূর্ণভাবে সরকারের সমালোচনা করে, তাদের প্রতি রাষ্ট্র কী ধরনের আচরণ করে- তা দিয়েই প্রকৃত গণতান্ত্রিক মানদণ্ড নির্ধারিত হয়। সূত্র: এনডিটিভি