✕
নিউজ ডেস্ক
প্রকাশ :- ২০২৬-০৭-২৩, | ১৮:৫২:১৭ |মরুভূমির সবচেয়ে সহনশীল প্রাণী হিসেবে পরিচিত উটও এখন আর তীব্র তাপপ্রবাহের সঙ্গে তাল মিলিয়ে টিকে থাকতে পারছে না। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে আফ্রিকার বিভিন্ন অঞ্চলে তাপমাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ায় বাড়ছে উটের মৃত্যু, কমছে দুধ উৎপাদন এবং দেখা দিচ্ছে নানা স্বাস্থ্যজটিলতা। এতে সংকটে পড়েছেন উটের ওপর নির্ভরশীল যাযাবর জনগোষ্ঠী ও পশুপালকেরা।
বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উত্তর-পূর্ব ইথিওপিয়ার আফার অঞ্চল বিশ্বের অন্যতম উষ্ণ ও শুষ্ক এলাকা। এখানকার যাযাবররা মরুভূমি পেরিয়ে লবণ পরিবহনে উটের কাফেলা ব্যবহার করেন। আফারের সেমেরা এলাকার উটপালক আলি উমেরের রয়েছে প্রায় ৫০০টি উট। তিনি জানান, গত এক মাসেই অতিরিক্ত গরমে তাঁর আটটি উটশাবকের মৃত্যু হয়েছে।
উমেরের ভাষ্য, প্রচণ্ড গরমে উটের পায়ে ফোসকা পড়ছে, চোখ দিয়ে পানি ঝরছে, উত্তপ্ত বালুতে চামড়া পুড়ে যাচ্ছে। আগে যে বাতাস কিছুটা স্বস্তি দিত, এখন সেই বাতাসও যেন আগুনের উত্তাপ বহন করছে।
বিজ্ঞানী ও প্রাণীকল্যাণবিষয়ক গবেষকদের মতে, অতিরিক্ত তাপে উটের শরীরে তাপজনিত চাপ, অবসাদ ও পানিশূন্যতা তৈরি হচ্ছে। একই সঙ্গে বিভিন্ন রোগের ঝুঁকিও বাড়ছে। পানির উৎস শুকিয়ে যাওয়া, ঘাস ও উদ্ভিদের সংকট এবং ছায়ার অভাব পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
বিশ্বের এক কুঁজো উটের প্রায় ৮০ শতাংশ উত্তর আফ্রিকা ও আফ্রিকার হর্ন অঞ্চলে রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে খরা ও গরম সহ্য করতে পারায় এসব অঞ্চলের মানুষ উট পালনের ওপর নির্ভরশীল। তবে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এখন উটের স্বাস্থ্য, উৎপাদনশীলতা ও প্রজননক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
প্রতিবেশী সোমালিয়ায় গত জুনে প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, খরার কারণে দেশটির প্রায় ৪৬ শতাংশ উটপালক পরিবার উট মৃত্যুর সংকটে পড়েছে। উত্তরাঞ্চলের সোল এলাকায় উটের মৃত্যুহার প্রায় ৭৩ শতাংশে পৌঁছেছে।
কেনিয়ার মারসাবিত কাউন্টির পশুচিকিৎসা কর্মকর্তা হাসান নুয়া গাইয়ো বলেন, অতিরিক্ত তাপজনিত অসুস্থতায় আক্রান্ত উটের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এর ফলে বিভিন্ন সংক্রমণও বাড়ছে। গত দুই বছরে ওই এলাকায় অতিরিক্ত গরমের কারণে উটের মৃত্যু ১৫ শতাংশের বেশি বেড়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, তাপজনিত চাপের কারণে উট কম খাবার খায়, দুর্বল হয়ে পড়ে এবং দুধ উৎপাদন কমে যায়। পাশাপাশি প্রজননজনিত সমস্যা, ওজন হ্রাস, প্রদাহ, পেশি ও হাড়ের জটিলতা, কিডনির কার্যকারিতা ব্যাহত হওয়া এবং পরজীবীজনিত সংক্রমণের ঝুঁকিও বাড়ে।
সাধারণভাবে উট শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে প্রায় ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত তাপমাত্রা সহ্য করতে পারে। তাদের পুরু চামড়া এবং শরীরে পানির অপচয় কমানোর বিশেষ ক্ষমতা দীর্ঘদিন ধরে মরুভূমিতে টিকে থাকতে সহায়তা করেছে। তবে সাহারা অঞ্চলের অনেক স্থানে এখন গ্রীষ্মকালে তাপমাত্রা প্রায়ই ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে যাচ্ছে, যা উটের স্বাভাবিক সহনক্ষমতারও বাইরে।
আলজেরিয়ার ঘারদাইয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আবদেলমজিদ চেমহা বলেন, দীর্ঘ সময় ধরে ৪১ থেকে ৪৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি তাপমাত্রায় থাকলে উটের কোষ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এতে রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হয়ে সংক্রমণের ঝুঁকি বেড়ে যায়।
বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, উত্তর আফ্রিকায় তাপপ্রবাহ ক্রমেই নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হচ্ছে। ১৯৮১ সালের পর থেকে অঞ্চলটিতে তাপপ্রবাহের প্রবণতা স্পষ্টভাবে বেড়েছে। ২০২৪ সালে উত্তর আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশে তাপমাত্রা ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে যায়। ১৯৯১ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে আফ্রিকার ছয়টি উপঅঞ্চলের মধ্যে উত্তর আফ্রিকাতেই উষ্ণায়নের হার সবচেয়ে বেশি ছিল। প্রতি দশকে সেখানে গড়ে ০ দশমিক ৪৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস হারে তাপমাত্রা বেড়েছে।
পরিবর্তিত পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাওয়াতে ইথিওপিয়ার অনেক উটপালক উত্তরাঞ্চল ছেড়ে দক্ষিণাঞ্চলে চলে যাচ্ছেন, যেখানে এখনো তুলনামূলকভাবে পানি ও উদ্ভিদ পাওয়া যায়। গবেষকদের মতে, এটি আর কেবল মৌসুমি স্থানান্তর নয়, অনেক পরিবার স্থায়ীভাবে বসতি বদলে ফেলছে।
সোর্স: বিবিসি