ভারতের মেডিক্যাল প্রবেশিকা পরীক্ষা (নিট) প্রশ্নপত্র ফাঁসের প্রতিবাদে ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)-র ডাকে সংসদ অভিযানকে কেন্দ্র করে সোমবার অশান্ত হয়ে উঠেছিল দিল্লি। ছাত্র-যুবদের মিছিলে লাঠিচার্জ ও কাঁদানে গ্যাস ব্যবহারের প্রতিবাদে মঙ্গলবার প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর বাসভবনের অদূরে ধরনায় বসেন বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী এবং কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে।
তাদের সঙ্গে ছিলেন রাহুল গান্ধীর বোন ও কংগ্রেস সাংসদ প্রিয়াঙ্কা গান্ধী, দলের সাধারণ সম্পাদক কেসি বেণুগোপালসহ একাধিক কংগ্রেস সাংসদ। কংগ্রেস সাংসদদের পাশাপাশি দুই কংগ্রেস-শাসিত রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী, কর্নাটকের ডিকে শিবকুমার এবং কেরলের বিরোধী দলনেতা ভিডি সতীশনও মঙ্গলবার রাহুলদের ধরনা-বিক্ষোভে যোগ দেন। উপস্থিত ছিলেন সমাজবাদী পার্টির প্রধান অখিলেশ যাদবও। পশ্চিমবঙ্গ থেকে সমর্থন জানান মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।
ধরনা শুরুর কিছুক্ষণ পর কেন্দ্রীয় মন্ত্রী জিতেন্দ্র সিং সেখানে উপস্থিত হয়ে রাহুলদের সঙ্গে দেখা করেন। প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের উচ্চ নিরাপত্তাবেষ্টিত এলাকায় অবস্থান করার কারণে তিনি ধরনা প্রত্যাহারের অনুরোধ জানান। তবে বিরোধীরা সেই অনুরোধে সাড়া দেননি।
বিরোধীদের দাবি, কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পাশাপাশি কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ এবং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকেও পদত্যাগ করতে হবে। এরপরই সন্ধ্যায় দিল্লি পুলিশ বিরোধী নেতাদের আটক করে।
এক মাস আগে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের ইস্তফার দাবিতে ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি) যন্তর-মন্তরে যে আন্দোলন শুরু করেছিল, প্রথমদিকে সেটিকে গুরুত্ব দেননি নরেন্দ্র মোদী ও অমিত শাহ। কিন্তু ধর্নাস্থলে সোনম ওয়াংচুকের যোগদান, তার টানা অনশন, জনসমর্থন এবং সরকারের বিরুদ্ধে জমে থাকা একাধিক ক্ষোভের জেরে আন্দোলন আরও বিস্তৃত হয়। এরপর বিষয়টির সমাধানের দায়িত্ব দেওয়া হয় কেন্দ্রীয় মন্ত্রী জেপি নড্ডাকে। বিক্ষোভে ইতি টানতে তিনি ধাপে ধাপে সিজেপি নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেন এবং তাদের দাবিগুলো খতিয়ে দেখার আশ্বাস দেন।
এদিকে মঙ্গলবার নিট নিয়ে মুখ খুলেছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। তিনি বলেছেন, ‘প্রশ্ন ফাঁস মহাপাপ। তা রোখা গোটা দেশের দায়িত্ব।’ কেন্দ্রীয় মন্ত্রী কিরেন রিজিজু প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য উদ্ধৃত করে জানান, নিট প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় দোষীদের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ‘শিশুদের উস্কানি দেবেন না, ওদের সঠিক পথ দেখান।’
মঙ্গলবার এনডিএ সংসদীয় দলের বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী মোদী বলেন, ‘ভুল পথে চলে যাওয়া খুব সহজ। কিন্তু সঠিক পথে ফিরে আসা অনেক বেশি কঠিন। তাই তাদের সঠিক পথে ফিরিয়ে আনার দায়িত্ব আমাদের। সেটাই আমাদের কর্তব্য।’
অন্যদিকে, সিজেপির আন্দোলনের পাশাপাশি রাহুল গান্ধীরাও পৃথক ধরনায় বসেন। সেই ধরনা প্রত্যাহারের অনুরোধ জানান কেন্দ্রীয় মন্ত্রী জিতেন্দ্র সিং। তবে জানা যায়, সেই অনুরোধ উপেক্ষা করে রাহুল গান্ধীরা চার দফা দাবিতে রাতভর অবস্থান কর্মসূচির প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন।
তাদের দাবি ছিল— কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের ইস্তফা, ছাত্রদের ওপর পুলিশি অভিযানের জন্য মোদী সরকারের ক্ষমাপ্রার্থনা, সংসদে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের বিবৃতি এবং কেন্দ্রীয় শিক্ষানীতি নিয়ে বাদল অধিবেশনে আলোচনা। তবে এখনও পর্যন্ত এই দাবিগুলো মেনে নেওয়ার কোনো ইঙ্গিত দেয়নি মোদী সরকার।
কেন্দ্রীয় মন্ত্রী জিতেন্দ্র সিংয়ের দাবি, সরকারের পক্ষ থেকে কংগ্রেসের প্রাথমিক দাবি— সংসদে নিট প্রশ্নপত্র ফাঁস নিয়ে আলোচনা— মেনে নেওয়ার কথা জানানো হয়েছিল। কিন্তু এরপরও কংগ্রেস অতিরিক্ত শর্ত দেয় এবং শিক্ষামন্ত্রীর ইস্তফার দাবিতে অনড় থাকে। তার দাবি, নতুন শর্ত আরোপের কারণেই পুলিশ তাদের অবস্থান থেকে আটক করে।
এদিকে নিজের পছন্দের হাসপাতালে ভর্তি হতে পারবেন সোনম ওয়াংচুক। মঙ্গলবার এ নির্দেশ দিয়েছে দিল্লি হাইকোর্ট। কয়েক দিন আগে তার স্ত্রী আবেদন করেছিলেন, সফদরজং হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে স্থানান্তরের অনুমতি দেওয়া হোক। প্রথমে সেই আবেদন খারিজ করে দেয় আদালত। পরে ওই সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করে ডিভিশন বেঞ্চে আবেদন করা হলে, সোনমকে মেদান্ত হাসপাতালে স্থানান্তরের অনুমতি দেওয়া হয়।
মামলার শুনানিতে দিল্লি হাইকোর্টের ডিভিশন বেঞ্চ জানায়, সোনম ওয়াংচুককে মেদান্ত হাসপাতালে স্থানান্তর করা হবে। সফদরজং হাসপাতালে তার চিকিৎসাসংক্রান্ত সব নথি, রিপোর্ট ও তথ্য মেদান্ত হাসপাতালের কাছে হস্তান্তর করতে হবে।
২০ দিনের অনশনের পর দিল্লির যন্তর-মন্তর থেকে সোনমকে সরিয়ে নিয়ে যায় দিল্লি পুলিশ। পরে তাকে সফদরজং হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। তবে হাসপাতালেও তিনি অনশন চালিয়ে যান। মেডিক্যাল বুলেটিনে দাবি করা হয়, তিনি কোনো ধরনের চিকিৎসা নিতে রাজি নন এবং ওষুধও গ্রহণ করছেন না।
এরপর সোনমের স্ত্রী অভিযোগ করেন, তাকে জোর করে আটকে রাখা হয়েছে। তাই তাকে মেদান্ত হাসপাতালে স্থানান্তরের অনুমতি দেওয়ার আবেদন জানান তিনি। যদিও সোমবার দিল্লি হাইকোর্ট জানিয়েছিল, সোনমকে আটক করে রাখা হয়নি। তিনি একজন স্বাধীন ব্যক্তি। তার শারীরিক অবস্থার কারণে তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে এবং সরকারের এই সিদ্ধান্তকে স্বেচ্ছাচারী বলা যায় না। পরে সেই রায়ের বিরুদ্ধে ডিভিশন বেঞ্চে আবেদন করা হলে মঙ্গলবার স্থানান্তরের নির্দেশ দেয় আদালত।
এদিকে মঙ্গলবার কলকাতার ‘২১ জুলাই শহিদ সমাবেশে’ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, ‘গতকাল দিল্লিতে ছাত্র-যুবদের ওপর কীভাবে অত্যাচার হয়েছে, তা আপনারা দেখেছেন। খবর পেয়েছিলাম, ছাত্রদের আন্দোলনের চাপে প্রধানমন্ত্রী গাড়ি ঘুরিয়ে চলে গেছেন। পশ্চিমবঙ্গে বাড়াবাড়ি বন্ধ না হলে আমরাও বৃহত্তর আন্দোলনে নামব। আমি এবার জেলায় জেলায় যাব। দেখি, আমাকে আটকানোর কত ক্ষমতা রয়েছে ওদের। সরকার চালাতে গেলে কিছু শৃঙ্খলা মানতে হয়, যা ওদের নেই।’
তিনি কংগ্রেস, আম আদমি পার্টিসহ ২৮টি রাজনৈতিক দলের ‘ইন্ডি’ জোটের প্রসঙ্গ টেনে বলেন, ‘বিবেক জাগ্রত করে সবাইকে এর বিরুদ্ধে একসঙ্গে পথে নামতে হবে। পশ্চিমবঙ্গে আমি ইন্ডি জোটের সমর্থক। ওই জোটের কারও প্রতি আমার কোনো রাগ বা ক্ষোভ নেই। আগামী দিনে আমরা আবার একসঙ্গে চলব।’
কর্মীদের উদ্দেশে মমতা বলেন, ‘যারা আমার সঙ্গে আন্দোলনে থাকবেন, তারা পথে নামুন। আর যারা থাকবেন না, তারা দল থেকে বেরিয়ে যান। এবার স্বাধীনতার আন্দোলন শুরু হবে, গণতন্ত্রের আন্দোলন শুরু হবে। নতুন ইতিহাস লেখার সময় এসেছে। আবার খেলা হবে, তবে এবার ব্যাট-বলের খেলা হবে। প্রস্তুত থাকুন। আমরা নবান্ন অভিযান করব, লালবাজার অভিযানও করব।’