বর্ষার আগমনের সঙ্গে সঙ্গে সিরাজগঞ্জের তাড়াশ উপজেলার চলনবিল অঞ্চলে নৌকা তৈরির কর্মযজ্ঞে ব্যস্ত সময় পার করছেন কারিগররা। বর্ষাকালে বিস্তীর্ণ বিলাঞ্চলের মানুষের চলাচলের প্রধান ও অনেক ক্ষেত্রে একমাত্র ভরসা নৌকা। তাই বর্ষাকে সামনে রেখে নতুন নৌকা তৈরির পাশাপাশি পুরোনো নৌকা মেরামতের কাজও পুরোদমে চলছে।
স্থানীয়দের মুখে প্রচলিত রয়েছে একটি প্রবাদ ‘বছরে ১২ মাসের ৪ মাস নায়ে, আর ৮ মাস পায়ে।’ অর্থাৎ বছরের আট মাস মানুষ হেঁটে চলাচল করলেও বর্ষার চার মাস তাদের ভরসা নৌকা।
জানা গেছে, তাড়াশ উপজেলার অধিকাংশ গ্রামের মানুষ বর্ষা মৌসুমে প্রায় চার মাস পানিবন্দি অবস্থায় থাকেন। এ সময় যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম হয়ে ওঠে নৌকা। ফলে বর্ষা শুরু হওয়ার আগেই নৌকার চাহিদা বেড়ে যায় এবং কারিগরদের কর্মব্যস্ততাও বৃদ্ধি পায়।
উপজেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, কাঠ কাটা, নৌকার কাঠামো তৈরি, রং করা ও পুরোনো নৌকা সংস্কারের কাজে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন তারা।
নৌকা তৈরির কারিগর কৃষ্ণ জানান, এলাকায় মূলত তিন ধরনের নৌকা তৈরি হয়—শ্যালো ইঞ্জিনচালিত নৌকা, ডিঙ্গি নৌকা এবং বাইচের নৌকা। একটি শ্যালো ইঞ্জিনচালিত বড় নৌকা তৈরি করতে ১ থেকে ২ লাখ টাকা, কখনো এরও বেশি খরচ হয়। অন্যদিকে ৯ হাতের একটি ডিঙ্গি নৌকার দাম প্রায় ৪ হাজার এবং ১০ হাতের নৌকার দাম প্রায় ৫ হাজার টাকা। মাছ ধরা ও ব্যক্তিগত চলাচলের জন্য এসব ডিঙ্গি নৌকার চাহিদা সবচেয়ে বেশি। এ ছাড়া মালবাহী ও যাত্রীবাহী শ্যালো ইঞ্জিনচালিত নৌকারও ব্যাপক চাহিদা রয়েছে।
নওগাঁ হাটে নৌকা কিনতে আসা পিন্টু আলী বলেন, আমাদের গ্রাম চলনবিলের মাঝখানে। সামান্য বর্ষাতেই রাস্তাঘাট পানিতে তলিয়ে যায়। তখন নৌকাই একমাত্র ভরসা। তাই বর্ষা শুরুর আগেই নৌকা কিনতে এসেছি। তবে এ বছর নৌকার দাম আগের তুলনায় কিছুটা বেশি।
লালুয়ামাঝিরা গ্রামের মাঝি মো. ফিলিপ বলেন, একটি বড় শ্যালো ইঞ্জিনচালিত নৌকা তৈরি করতে অনেক টাকা প্রয়োজন। তাই অনেকের ইচ্ছা থাকলেও অর্থের অভাবে নৌকা বানাতে পারেন না। ফলে তারা অন্যের নৌকা চুক্তিভিত্তিক চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করেন।
নৌকা নির্মাতা দুলাল হোসেন বলেন, সারা বছর তেমন কাজ থাকে না। বর্ষার তিন-চার মাসই আমাদের মূল কর্মমৌসুম। কিন্তু এখন নৌকা তৈরির প্রধান উপকরণ কাঠ আগের মতো সহজে পাওয়া যায় না। যা পাওয়া যায়, তার দামও অনেক বেড়েছে। ফলে লাভের পরিমাণ কমে গেছে। অন্য পেশায় যেতে পারি না, তাই এই পেশাই আঁকড়ে ধরে আছি। মাঝিরা যদি আগে থেকেই নৌকার অর্ডার দিতেন, তাহলে আমাদের কাজের পরিকল্পনা করা আরও সহজ হতো।
চলনবিল অঞ্চলের মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে নৌকার সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য। তাই বর্ষার আগমনের সঙ্গে সঙ্গে নৌকা তৈরির এই ব্যস্ততা শুধু একটি মৌসুমি পেশার চিত্রই নয়, বরং বিলাঞ্চলের মানুষের জীবন-জীবিকারও এক গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ।
এ জাতীয় আরো খবর..