আগামী সংসদ নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে হবে: আইনমন্ত্রী

  • নিউজ ডেস্ক

    প্রকাশ :- ২০২৬-০৭-০৯, | ১৩:৫৯:৩৯ |

দীর্ঘ আইনি লড়াই ও রাজনৈতিক টানাপোড়েনের অবসান ঘটিয়ে দেশের সর্বোচ্চ আদালত তথা আপিল বিভাগ সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী নিয়ে হাইকোর্টের দেওয়া ঐতিহাসিক রায়টি বহাল রেখেছেন। এর ফলে সংবিধানে আনুষ্ঠানিকভাবে পুনর্বহাল হতে যাচ্ছে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা ও গণভোটের বিধান। 

দেশের সর্বোচ্চ আদালতের এই আদেশের পর সচিবালয়ে এক ব্রিফিংয়ে আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, দেশের আগামী (চতুর্দশ) জাতীয় সংসদ নির্বাচন অবশ্যই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনেই অনুষ্ঠিত হবে। আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান এই রায়কে স্বাগত জানিয়ে সাংবাদিকদের বলেন, এটি কেবল আইনি বিজয়ই নয়, এটি বর্তমান সরকারের একটি সুদৃঢ় রাজনৈতিক অঙ্গীকার। তিনি আরও উল্লেখ করেন, এই তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা মূলত বিএনপির দীর্ঘদিনের আন্দোলনেরই একটি ফসল। সর্বোচ্চ আদালতের এই রায়ের মাধ্যমে জনগণের ভোটাধিকার এবং একটি অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের পথ পুরোপুরি সুগম হলো বলে তিনি মনে করেন।  

এদিকে রায় ঘোষণার পরপরই অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল সাংবাদিকদের কাছে রায়ের আইনি ব্যাখ্যা তুলে ধরেন। তিনি জানান, পঞ্চদশ সংশোধনী চ্যালেঞ্জ করে দায়ের করা রিটের পর হাইকোর্ট যে পর্যবেক্ষণগুলো দিয়েছিলেন, আপিল বিভাগ আপিলগুলো খারিজ করে দেওয়ায় সেই পর্যবেক্ষণসহ পুরো রায়টি এখন বহাল থাকল। হাইকোর্টের রায়ের মূল ভিত্তিই ছিল সংবিধানে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ফিরিয়ে আনা, গণভোটের বিধান পুনরুজ্জীবিত করা এবং অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল রোধে যুক্ত করা সংবিধানের ৭ক ও ৭খ অনুচ্ছেদ বাতিল করা। সুপ্রিম কোর্টের এই সিদ্ধান্তের ফলে শেষ পর্যন্ত হাইকোর্টের ঐতিহাসিক রায়টিই চূড়ান্ত আইনি বৈধতা পেল।  

এর আগে, ২০১১ সালের ৩০ জুন তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার সংসদের মাধ্যমে সংবিধানের এই পঞ্চদশ সংশোধনী পাস করেছিল, যার অধীনে এক ধাক্কায় সংবিধানের ৫৪টি ক্ষেত্রে বড় ধরনের পরিবর্তন আনা হয়। এই সংশোধনীর মাধ্যমেই দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত ও জনপ্রিয় নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থাটি চিরতরে বিলুপ্ত করা হয়েছিল, যা পরবর্তীতে দেশে বড় ধরনের রাজনৈতিক সংকট তৈরি করে। এ ছাড়া এই সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানে বঙ্গবন্ধুর স্বীকৃতি ও জাতীয় চার মূলনীতি ফিরিয়ে আনার পাশাপাশি অবৈধভাবে ক্ষমতা দখলকারীদের জন্য সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান যুক্ত করা হয়েছিল। 

তবে গত জুলাই মাসের ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের নাটকীয় পতনের পর ২০২৪ সালে এই পঞ্চদশ সংশোধনীর সম্পূর্ণ আইন এবং এর কিছু সুনির্দিষ্ট ধারার বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে পৃথক দুটি রিট দায়ের করা হয়। দীর্ঘ চূড়ান্ত শুনানি শেষে ২০২৪ সালের ১৭ ডিসেম্বর হাইকোর্ট এক যুগান্তকারী রায় প্রদান করেন। রায়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ও গণভোট বাতিলের জন্য দায়ী তৎকালীন সংবিধান আইনের ২০ ও ২১ নম্বর ধারা সম্পূর্ণ অবৈধ ও বাতিল ঘোষণা করা হয়। একইসঙ্গে পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানে যুক্ত হওয়া ৭(ক), ৭(খ) এবং ৪৪(২) অনুচ্ছেদকে সংবিধানের মূল চেতনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক উল্লেখ করে তা বাতিল করে দেওয়া হয়।  

পরবর্তীতে গত বছরের ৮ জুলাই হাইকোর্টের এই পূর্ণাঙ্গ রায়টি প্রকাশিত হলে সুজন সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদারসহ চার বিশিষ্ট ব্যক্তি এবং অন্যান্য পক্ষ এর বিরুদ্ধে আপিল করার অনুমতি চেয়ে (লিভ টু আপিল) আবেদন জানান। সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ গত বছরের ১৩ নভেম্বর সেই আবেদন মঞ্জুর করলে হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে তিনটি পৃথক আপিল দায়ের করা হয়। সেই আপিলগুলোই দেশের সর্বোচ্চ আদালতে আজ চূড়ান্তভাবে খারিজ হয়ে গেল, যা বাংলাদেশের নির্বাচনী ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করল। 

শেয়ার করুন



এ জাতীয় আরো খবর..