✕
নিউজ ডেস্ক
প্রকাশ :- ২০২৬-০৭-০২, | ১৯:০০:২০ |তীব্র তাপপ্রবাহের কবলে পড়েছে ইউরোপ। ফ্রান্সেও চলছে ভয়াবহ তাপপ্রবাহ। এরই ধারাবাহিকতায় নতুন করে তীব্র তাপপ্রবাহের পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। আসন্ন এই তীব্র তাপপ্রবাহকে ঘিরে এয়ার কন্ডিশনার (এসি) ও বৈদ্যুতিক ফ্যান কেনার হিড়িক পড়ে গেছে দেশটিতে। পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে যে, বিভিন্ন শহরে সুপারমার্কেটের দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকে পড়েন ক্রেতারা। কোথাও কোথাও এসি ও ফ্যান দখলকে কেন্দ্র করে হাতাহাতি, ধাক্কাধাক্কি এমনকি মারামারির ঘটনাও ঘটেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে একাধিক স্থানে পুলিশকে হস্তক্ষেপ করতে হয়েছে।
ফরাসি সংবাদমাধ্যমগুলোর তথ্যানুযায়ী, জনপ্রিয় সুপারমার্কেট চেইন লিডল বৃহস্পতিবার দেশজুড়ে প্রায় দুই লাখ ফ্যান ও এয়ার কন্ডিশনার বিক্রির ঘোষণা দেয়। এই ঘোষণার পর ভোর হওয়ার আগেই বিভিন্ন শাখার সামনে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়ান শত শত মানুষ।
দোকান খোলার সঙ্গে সঙ্গেই হুড়োহুড়ি শুরু হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, ক্রেতারা দৌড়ে দোকানে ঢুকে এসি ও ফ্যানের বাক্স হাতিয়ে নিচ্ছেন। অনেক নারী চিৎকার করছেন, কেউ কাঁদছেন, আবার কেউ পণ্য দখল করতে গিয়ে একে অপরের সঙ্গে হাতাহাতিতে জড়িয়ে পড়ছেন।
পুলিশি হস্তক্ষেপ
প্যারিসের উপকণ্ঠ নঁতের একটি লিডল শাখায় শতাধিক মানুষ একযোগে ঢুকে পড়লে প্রবেশদ্বার ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পরিস্থিতি এতটাই উত্তপ্ত হয়ে ওঠে যে, পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
ফরাসি টেলিভিশন চ্যানেল ‘বিএফএমটিভি’র তথ্যানুযায়ী, ব্যাপক বিশৃঙ্খলার কারণে শেষ পর্যন্ত মাত্র ১০ জন ক্রেতা এসি বা ফ্যান নিয়ে দোকান থেকে বের হতে সক্ষম হন।
ইভলিন অঞ্চলের সাঁ-জার্মাঁ-আঁ-লায়ে শহরে দোকান খোলার কয়েক মিনিটের মধ্যেই ফ্যানের তাক খালি হয়ে যায়। সেখানে কোনও এসি ছিল না; মাত্র ৫০টি ফ্যান বিক্রির জন্য রাখা হয়েছিল।
সকাল সাড়ে ৭টার মধ্যেই দোকানের সামনে দীর্ঘ সারি তৈরি হয়। পরে শেষ কয়েকটি ফ্যানের বাক্স নিয়ে ক্রেতাদের মধ্যে সংঘর্ষ বাধলে পুলিশকে হস্তক্ষেপ করতে হয়।
ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষার পরও খালি হাতে ফেরা
অনেক ক্রেতা অভিযোগ করেছেন, কয়েক ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়েও তারা কোনও পণ্য পাননি।
ক্যারিয়ের-সু-পোয়াসি এলাকার বাসিন্দা হাইসাম বলেন, “এটা সত্যিই হাস্যকর। মানুষ যেন পুরোপুরি পাগল হয়ে গেছে।”
ভ্যাল-দ’ওয়াজ অঞ্চলের ট্যাক্সিচালক ওয়াকার বলেন, “লিডল আগে থেকেই জানতো এমন পরিস্থিতি তৈরি হবে, কিন্তু তারা কোনও প্রস্তুতিই নেয়নি।”
এসোন অঞ্চলের একটি শাখায় প্রায় ২০০টি গাড়ি জড়ো হওয়ায় আশপাশের সড়কে দীর্ঘ যানজট সৃষ্টি হয়। পরিস্থিতি সামাল দিতে সেখানেও পুলিশ মোতায়েন করা হয়।
প্যারিসেও একই চিত্র
রাজধানী প্যারিসেও অনেক ক্রেতা এসি ও ফ্যান না পেয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।
একজন ক্রেতা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) লিখেছেন, “প্যারিসের একটি দোকানে মাত্র একটি এসি এসেছে, আরেকটিতে একটিও আসেনি। পুরো প্যারিসে হয়তো ১০০টির বেশি এসি সরবরাহই করা হয়নি।”
আরেকজন দাবি করেন, প্যারিসের ১৪তম অ্যারোন্ডিসমেন্টে দুটি এসির জন্য ৪০০-এর বেশি মানুষ জড়ো হয়েছিলেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে টিয়ার গ্যাস ব্যবহার করা হয় এবং কয়েকজন নারী পড়ে গিয়ে আহত হন।
আরেকজন ক্ষুব্ধ ক্রেতা লেখেন, “এটা যেন প্রতারণা ও জালিয়াতি ছাড়া আর কিছুই নয়।”
তবে কেউ কেউ এই বিশৃঙ্খলার মধ্যেও কাঙ্ক্ষিত পণ্য কিনতে সক্ষম হয়েছেন। একজন ক্রেতা নিজের কেনা ফ্যানের ছবি প্রকাশ করে রসিকতা করে লেখেন, “লিডলের পবিত্র যুদ্ধে আমি জয়ী হয়েছি। এটা আমার জীবনবৃত্তান্তে যোগ করার মতো একটি অর্জন।”
তাপপ্রবাহে বেড়েছে মৃত্যুর সংখ্যা
এদিকে ফ্রান্সের জাতীয় জনস্বাস্থ্য সংস্থা জানিয়েছে, গত সপ্তাহের তীব্র তাপপ্রবাহে মৃত্যুর সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে।
গত বুধবার, যেদিন ফ্রান্স ইতিহাসের সর্বোচ্চ তাপমাত্রার রেকর্ড গড়ে, সেদিন দেশটিতে ১ হাজার ২০০ জনের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়। পরদিন বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার প্রতিদিন প্রায় ১ হাজার ৪০০ জন করে মারা যান।
তুলনামূলকভাবে এপ্রিল ও মে মাসে দৈনিক মৃত্যুর সংখ্যা ছিল গড়ে ৯০০ থেকে ১ হাজার।
জনস্বাস্থ্য সংস্থার প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, মাত্র তিন দিনের তাপপ্রবাহে অতিরিক্ত অন্তত এক হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে। তবে বাড়িতে কিংবা বৃদ্ধাশ্রমে মারা যাওয়া অনেকের তথ্য এখনও নিবন্ধিত না হওয়ায় প্রকৃত সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।
ইউরোপের ইতিহাসে ভয়াবহ তাপপ্রবাহ
বিজ্ঞানীদের মতে, ২০ জুন থেকে শুরু হওয়া এবারের তাপপ্রবাহ ইউরোপের ইতিহাসে অন্যতম ভয়াবহ। অনেক এলাকায় তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে গেছে এবং রাতের সর্বোচ্চ তাপমাত্রারও নতুন রেকর্ড তৈরি হয়েছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) মহাপরিচালক টেড্রোস আধানম গেব্রেয়েসুস সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, বর্তমানে প্রায় ১৫ কোটি মানুষ চরম তাপপ্রবাহের মধ্যে বসবাস করছেন। ইতোমধ্যে শত শত মানুষের মৃত্যু হয়েছে, স্কুল বন্ধ রাখা হয়েছে, বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থা চাপে পড়েছে এবং স্বাস্থ্যসেবাও ব্যাপকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
তিনি বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে একসময় যে তাপপ্রবাহকে ‘প্রজন্মে একবার’ ঘটার মতো ঘটনা বলা হতো, এখন তা প্রায় প্রতি বছরই দেখা যাচ্ছে।
সরকারের বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাবের প্রস্তুতি
তীব্র তাপপ্রবাহ মোকাবিলায় সরকারের প্রস্তুতিকে অপর্যাপ্ত উল্লেখ করে ফ্রান্সের গ্রিন পার্টির আইনপ্রণেতারা প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়াঁ লেকর্নুর সংখ্যালঘু সরকারের বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব আনার ঘোষণা দিয়েছেন।
গ্রিন পার্টির সংসদীয় নেতা সিরিয়েল শাতেলাঁ বলেন, শুধু সাম্প্রতিক তাপপ্রবাহ নয়, সামনে আসতে থাকা নতুন তাপপ্রবাহ মোকাবিলায়ও সরকারের প্রস্তুতির ঘাটতির প্রতিবাদ জানাতেই এ উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
তবে সরকারের মুখপাত্র মড ব্রেজোঁ এই উদ্যোগকে ‘সম্পূর্ণ রাজনৈতিক কৌশল’ বলে মন্তব্য করেছেন। তার দাবি, সরকার সংকট মোকাবিলায় কাজ করছে, আর বিরোধীরা পরিস্থিতিকে রাজনৈতিকভাবে কাজে লাগানোর চেষ্টা করছে।
বিশ্লেষকদের মতে, অন্যান্য বিরোধী দলের সমর্থন না পেলে এই অনাস্থা প্রস্তাব পাস হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। তবে জলবায়ু পরিবর্তন ও চরম আবহাওয়ার ঝুঁকি মোকাবিলায় সরকারের সক্ষমতা নিয়ে নতুন করে জাতীয় বিতর্ক শুরু হয়েছে। সূত্র: ডেইলি মেইল